করোনার সাথে সহবাসঃ অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক মিয়া

0
89
our bd it

করোনার সাথে সহবাস

—————————————অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক মিয়া

অলকঃ-করোনা ভাইরাস এতই সৌভাগ্যবান যা সারা বিশ্বে ইতিমধ্যে এক ডাকে পরিচিত। এটি মূলত অতিক্ষুদ্র বিষাক্ত প্রোটিন বস্তু যা মানব দেহের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত করে রোগ সৃষ্টি করে। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র এই করোনার ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপিক গঠনে সাধারণত স্পাইক, এনভেলপ, মেমব্রেন ও নিউক্লিওক্যাপসিড নামক ৪ ধরনের প্রোটিন এবং ক্যাপসিড আবরণে চর্বিস্তর থাকে। পরিবেশে করোনা ভাইরাস নামক বিষাক্ত প্রোটিন নিজেই ধবংশ হয় এবং এর স্থায়িত্ব নির্ভর করে এর অবস্থানের প্রকৃতি, তাপমাত্রা, আদ্রতা ইত্যাদির উপর এমনকি চলনশীল টাকাও অন্যতম মাধ্যম। ভাইরাসটি আক্রান্ত মানুষের হাঁচিকাশির মাধ্যমে পরিবেশে এসে মানুষে সংক্রমণ বহাল রাখে এবং শ্বাসনালী হয়ে ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং মারাত্মক হলেই মৃত্যু। সংক্রমণে বিভন্ন ধরনের লক্ষণ সম্পর্কে আমরা ইতিমধ্যে জানি তবে সবচেয়ে বিপজ্জনক হল দেরিতে লক্ষণ প্রকাশ। যেহেতু ভাইরাসটি অদৃশ্য এবং রোগটি ছোঁয়াচে তাই প্রথম এবং প্রধান কাজ হল সকলের সামাজিক ও ব্যাক্তি দূরত্ব বজায় রেখে চলা। তাছাড়া এই রোগ থেকে বাঁচার বিভিন্ন প্রতিরোধমুলক নির্দেশনা ইতিমধ্যে প্রচারিত হয়েছে যা মেনে চলা উচিৎ।

হাতধোয়া,, ঘরোয়া চিকিৎসায় ব্যবহৃত উপকরণ এবং মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহারের একটু বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রোগটি শ্বাসকষ্ট জনিত তাই শ্বসনতন্ত্রকে রক্ষা করাই মুখ্য উদ্দেশ্য। শ্বসনতন্ত্রের মুল অঙ্গ ফুসফুস আর ফুসফুসে বায়ু প্রবাহের শ্বাসনালি সরাসরি মুখ এবং নাসাছিদ্রের সাথে সংযুক্ত। চোখের আভ্যন্তরীণ নালীও গলবিলে উন্মুক্ত। শ্বাসনালীতে সবসময় নাসাছিদ্রের মাধ্যমে বাতাস সরাসরি ফুসফুসে যাতায়াত করে। কেবল কোন কিছু গলাধকরণের সময় আলাজিহবা গ্রীবাদেশে শ্বাসনালীকে ঢেকে রাখে এবং খাদ্য অন্ননালী হয়ে পাকস্থলীতে পৌঁছায়। পাকস্থলীতে এসিড ও প্রোটিন পরিপাককারী এনজাইম থাকায় করোনা ভাইরাস নামক প্রোটিন পাকস্থলীতে ধবংস হয়। তাই মাস্ক ব্যবহার করা অত্যাবশ্যক যাতে ভাইরাস প্রশ্বাসের সাথে ফুসফুসে পৌঁছাতে না পারে। করোনা ভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে ঘনঘন হাত ধোয়ার পরামর্শ দেয়া হয়েছে এবং এটাই অন্যতম প্রতিরোধক। কারণ সাবান, হ্যন্ডওয়াশ, ৬৫% এলকোহল, লেবুর রস, ছাই বা মাটি দিয়ে হাত ধোয়ে নিলে ভাইরাসের স্পাইক প্রোটিন বা চর্বিযুক্ত বাহ্যিক আবরণ নষ্ট হয়ে ভাইরাসটি অকার্যকর হয়। মুখে করোনা ভাইরাসকে নিয়ন্ত্রনে রাখতে মুখের ভিতর ও গলা ভেঝা রাখা ভালো। লক্ষণীয় মুখের লালায় প্রোটিন বা চর্বি পরিপাককারী কোন এনজাইম না থাকায় মুখে এই ভাইরাস অক্ষত থেকে যায়। পানি পান করলে মুখ ও গলার ভিতর শুকিয়ে যায় না এবং ভাইরাসটি শ্বাসনালী হয়ে ফুসফুসে প্রবেশে ব্যর্থ হয়। হালকা গরম পানি পান করলে গরমের প্রভাবে ভাইরাসের আবরণী চর্বি ও প্রোটিনের প্রকৃতিকে প্রভাবিত করে ভাইরাসকে নিস্ক্রিয় করে ফেলতে পারে। তাছাড়া পানি, হালকা গরম পানি বা তরল খাবার বা খাবারের মাধ্যমে মুখ ও গলায় থাকা ভাইরাস পাকস্থলীতে পৌঁছালে তা পাকস্থলী নিঃসৃত এসিড ও এনজাইমের প্রভাবে ধবংস হয়। আসল উদ্দেশ্য হল মুখ ও গ্রীবাদেশেই করোনাকে অকার্যকর করে ফেলা যাতে সে ফুসফুসে পৌঁছাতে না পারে। সঠিক ভাবে ওয়ান টাইম গ্লাভস ব্যবহার করলে ভাইরাস সংক্রমণের সম্ভাবনা কমে যায়। মুখ খোলা রেখে কখনো হাঁচি কাশি দিলে তা পরিবেশে মুক্ত হয়ে অন্যকে সংক্রমিত করে, তাই নাক মুখ ঢেকে হাঁচি কাশি দেয়া অন্যতম ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংক্রমণ প্রতিরোধক।

করোনা ভাইরাস যাতে সংক্রমণ না করতে পারে সেটাই লক্ষ্য হওয়া উচিৎ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে করোনা সংক্রমণ হলে বিড়াম্বনার শেষ নেই। এমনকি পরিবারের স্বজনকেও পাশে পাওয়া যায়না। সমাজে কিছু অঘটন দেখা যায়, যেমন- পিতা মাতা করোনা সংক্রমিত হলে সন্তান পিতা মাতা কে রাস্তায়/জঙ্গলে ফেলে চলে যায়, অতচ সন্তান করোনা সংক্রমিত হলে বাবা মা কিন্তু সন্তানকে রাস্তায় ফেলে যায়না, বুক দিয়ে ঠিকই আগলে রাখে। তাই অতঙ্ক, ঘৃণা, ভয় আর অবহেলা নয়। আমরা বড়ই নিরমম ও স্বার্থপর। যেহেতু রোগটি ছোঁয়াচে তাই সতর্কতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরী। আমরা সবাই জানি, অত্যধিক জনসংখ্যার এই বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যবস্থার সুযোগ সুবিধা উন্নত বিশ্বের মত পাওয়াটা অনেকাংশে সম্ভবপর নয়। তাই ঘরোয়া চিকিৎসাই সবচেয়ে উত্তম, অন্তত পক্ষে এই করোনা চিকিৎসায়। এক্ষেত্রে পরিবারের স্বজনদের ভরসা, ভালবাসা, দায়িত্ব ও সেবাই পারে করোনা সংক্রমিত ব্যাক্তিকে সুস্থ করে তুলতে। মনে রাখবেন করোনা হলেই মৃত্যু নয়, বরং সুস্থতার হার অনেক বেশী, অন্তত বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশে এর প্রিতিক্রিয়া এরকমই দেখা যাচ্ছে। করোনা ভাইরাসের প্রাথমিক লক্ষন অনুভব করলে অবশ্যই আলাদা ঘরে থাকা (কোয়ারেন্টাইন) উচিৎ এবং ফোনে ডাক্তারের সাথে যোগাযোগ করে প্রাথমিক চিকিৎসা নেয়া উচিৎ অর্থাৎ টেলিমেডিসিন এবং নির্দিষ্ট হাসপাতালে ও আইইডিসিআর এ ফোন করে কর্তৃপক্ষকে আক্রান্ত ব্যাক্তির অবস্থান নিশ্চিত করা উচিৎ। যেসকল ঘরোয়া পদ্দতিতে ইতিমধ্যে উপকার পাওয়া গেছে বলে পরামর্শ দেয়া হয়েছে যেমন নিয়মিত গরম তরল খাবার গ্রহণ; আদা, লেবু দিয়ে রং চা পান করা; গরম লবন জলে কুলকুচি/গারগল করা; নাক-মুখ দিয়ে ম্যন্থল মিশ্রিত গরম পানির বাস্প নেয়া; অথবা আদা, লেবু, নিমপাতা, তেজপাতা, এলাচ, লবঙ্গ, দারোচিনি মিশ্রিত গরম পানির বাস্প নাক-মুখ দিয়ে নেয়া এবং গোছল করা অথবা পরিস্কার টাওয়েল দিয়ে শরীর মুছে ফেলা, এবং ঐ মিশ্রিত পানি পান করা; মধু, কালিজিরা, দুধ, ভিটামিন সি জাতিয় ফল, কাচা রসুন, ভিতামিন ডি, ভিটামিন বি, জিংক খাওয়া ইত্যাদি। লম্বা শ্বাসের ব্যয়াম ফুসফুস ভাল রাখে। মূলত এদের প্রভাবে ভাইরাস আবরণের প্রোটিন ও চর্বি অপ্রকৃতস্থ হয়ে ভাইরাসকে নিষ্ক্রিয় করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে এবং দেহের রোধপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়িয়ে করোনাকে ধ্বংস করে। তবে ভয়কে সরিয়ে সবার আগে মনকে শক্ত রেখে আত্মবিশ্বাসী হতে হবে। একে সাধারণ সর্দি জ্বর কাশির মতই চিন্তা করে স্বাভাবিক চিকিৎসা নিলে করোনা পরাজিত হবে ইনশাল্লাহ। করোনা ভাইরাস পজিটিভ হলেই মৃত্যু নয় বরং সুস্থ পরিচর্যায় সুস্থতার হারই বেশী। বাসা-বাড়িতে করোনা আক্রান্ত ব্যাক্তির সেবা দানকারী ব্যাক্তিকে অবশ্যই মাস্ক ও গ্লাভস পড়ে দূরত্ব বজায় রেখে পরিচর্যা করা উচিৎ যাতে নিজে ও পরিবারের অন্য সদস্য কেউ সংক্রমিত না হয়। যেহেতু করোনা ভাইরাস একটা ছোঁয়াচে তাই সামাজিক ও ব্যক্তি দূরত্ব বজায় রেখে চলাই করোনা ভাইরাস থেকে বাঁচার একমাত্র উপায়।

বাংলাদেশে দিন দিন করোনা সংক্রমণ বেড়েই চলছে। তবে আতঙ্কিত না হয়ে সাহসের সাথে আমাদের করোনা মোকাবেলা করতে হবে। আবার আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপটে বেশী দিন ঘরে বসে থাকাটা কতটুকু যুক্তি সঙ্গত সেটাও চিন্তার বিষয়। ইতিমধ্যে লকডাউন শীতিল করে সীমিত আকারে অফিস, আদালত, শপিং মল ইত্যাদি খোলে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে এবং মানুষের স্বাভাবিক চালচলন সহজ করে দেয়া হয়েছে। এমতাবস্থায় করোনার সাথেই আমাদের বাস করতে হবে। আতঙ্কিত না হয়ে পজিটিভ্লি মানসিক ভাবে আমাদের প্রস্তত থাকতে হবে যে করোনা সংক্রমণ আমাদেরও হতে পারে। তাই করোনা ভাইরাস এর সাথে থাকার মানসিক প্রস্তুতি নিতে হবে। কলেরা, যক্ষা, ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, আমাশয় সহ অন্যান্য রোগসৃষ্টিকারী যেসকল ভাইরাস, ব্যক্টেরিয়া এক সময় আমদের মাঝে মেহমান হিসাবে এসেছিল এবং আর ফিরে যায় নাই, তেমনি করোনা ভাইরাস ও আর ফিরে যাবে বলে মনে হয় না। তার সাথে অভিযোজিত হয়েই আমাদের থাকতে হবে। এর মধেই তার প্রতিষেধক তৈরি হবে ইনশাল্লাহ এবং মানুষের কাছে করোনা পরাজিত হতে বাধ্য। বাংলাদেশসহ এই উপমহাদেশের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আর প্রকৃতিই আমাদের বাঁচাতে পারে। শুধু সাবধানে চলাফেরা করতে হবে, স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। এমতাবস্থায় কিছু বিষয় যেমন ঘর থেকে বের হলে ওয়ান টাইম মাস্ক ও গ্লাভস ব্যবহার করা, নিয়মিত  হাত ধোয়া এবং জনসমাগম এড়িয়ে চলা গুরত্বসহকারে মানতে হবে। মনে রাখবেন, মাস্ক থুতনিতে পড়ে লাভ নেই। আরেকটা বিষয়, ঘুম থেকে উঠে ঝাড়ি দিয়ে নাক পরিষ্কার করা সুন্নত এবং গোসল ও পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে অজুতে নাক পরিষ্কার করা ফরজ (মোসলমানের জন্য) যা সবাই প্র্যাকটিস করতে পারে এবং এটিও অন্যতম করোনা প্রতিরোধক। তবে যথাযথ বাথরুম বা টিস্যু ব্যবহার বাধ্যতামূলক। বাহির থেকে বাসায় ফিরে গোসল করে গরম চা পান করা ও নাক-মুখ দিয়ে গরম পানির বাস্প নিলে করোনা থেকে নরাপদে থাকা যাবে। নিরাপদ দূরত্বে থেকে ঘর-বাড়ি, কৃষি খামারের কাজে শরীরের ভাল থাকে।

মানুষ মানুষের জন্য। করোনা আক্রান্ত মৃতের শেষকার্য সম্পন্ন করা বাধ্যতামূলক ও সকলের নৈতিক দায়িত্ব এবং ব্যাপারটি প্রতিটা মানুষের সম্মানের। মৃত দেহে করোনা ভাইরাস থাকতে পারে তবে মৃত হওয়ায় হাঁচি, কাশি বা নিঃশ্বাসের মাধ্যমে করোনা ভাইরাস পরিবেশকে দুষিত করতে পারে না। তাই আতংকিত না হয়ে মাস্ক, গ্লাভস ইত্যাদি ব্যবহার করে এবং দূরত্ব বজায় রেখে সীমিত সংখ্যক মানুষ নিয়ে মৃত দেহের সকল সৎকার করতে হবে। সৎকার সম্পন্ন করে অবশ্যই শরীরে ব্যবহৃত কাপড় ব্লিচিং পাউডার মিশ্রিত পানি দিয়ে ধৌত করতে হবে এবং পরিধেয় সকল কাপড় চোপড় পুড়িয়ে ফেলতে হবে অথবা গর্ত করে মাঠিতে পুতে ফেলতে হবে। তারপর সাবান দিয়ে ভালোকরে গোসল করে পরিস্কার কাপড় পরিধান করতে হবে। মৃত সৎকার করতেই হবে, না হলে মৃতদেহের জন্য পরিবেশ মারাত্মক হুমকিতে পরবে যা সকল মানুষের বিপর্যয়ের আরেকটা কারণ হবে। মনে রাখবেন আপনিও হতে পারেন এরকম একজন। ইনশাল্লাহ সৃষ্টি কর্তা আমাদের সবাইকে রক্ষা করবেন। সবাই জনসমাগম এড়িয়ে সাবধানে থাকি, নিজে ও পরিবারের সবাইকে নিরাপদে রাখি। পৃথিবীতে সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হল বেঁচে থাকা। তাই মরিতে চাহিনা আমি সুন্দর ভুবনে।

অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফারুক মিয়া
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগ
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

our bd it

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here