আজ ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সময় : সকাল ৬:০৭

বার : মঙ্গলবার

ঋতু : হেমন্তকাল

৩০২টি কলেজে মুজিববর্ষেই এডহক নিয়োগ জরুরী

রাজা মিয়া বিশেষ প্রতিনিধি

মো. শরীফ উদ্দিন: তিন সন্তানের জনক জনাব সাজিবুর রহমান একজন দিনমজুর ব্যক্তি। তাঁর মেজো ছেলে ২০১৯ সালের প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ ৫ নিয়ে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হয়। ওইসময় বড় ছেলে বাড়ির পাশের একটি হাইস্কুলে দশম শ্রেণিতে পড়ালেখা করলেও কিছু মানুষের পরামর্শে ভালো পড়াশোনা এবং সরকারি সুযোগ সুবিধা লাভের আশায় মেজো ছেলেকে পরের বছরের জানুয়ারিতে উপজেলার একমাত্র সরকারি হাইস্কুলে ভর্তি করেন। ধারদেনা করে স্কুলে ভর্তি করলেও পরবর্তীতে তিনি জানতে পারেন স্কুলের বেতন ও ফি দিতে হবে বেসরকারি নিয়মেই। কারণ জানতে চাইলে স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেন, সরকারি নিয়মে বেতন ও ফি নির্ধারণে এখনো তাঁর কাছে কোনো নির্দেশনা আসেনি। নির্দেশনা আসলেই কেবল তা কার্যকর হবে। প্রধান শিক্ষকের কথা শুনে সাজিবুর রহমানের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ে। বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে ২০২০ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে জিপিএ ৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হলে উপজেলার একমাত্র সরকারি কলেজে ছেলেকে ভর্তি করতে গিয়ে তিনি আগের মতোই সমস্যার সম্মুখীন হন। সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয় তাঁকে জানান, এ কলেজটি সদ্য সরকারি কলেজ। এখানে বেতন ও ফি দিতে হবে আগের মতো বেসরকারি নিয়মেই।

এ চিত্র বাংলাদেশের প্রায় সকল উপজেলার সদ্য সরকারিকৃত স্কুল ও কলেজগুলোর। সরকারি সাইনবোর্ড টানানো থাকলেও বেসরকারি নিয়মেই চলছে সব। শিক্ষক-কর্মচারীগণের এডহক নিয়োগ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে তাঁরা এখনো সরকারি বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। অনেকটা এরকম যে, স্কুল ও কলেজ সরকারি কিন্তু শিক্ষক-কর্মচারীগণ বেসরকারি! এদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়ায় শিক্ষার্থীদের সরকারি বেতন ও ফি নির্ধারণ করাও সম্ভব হচ্ছেনা। ফলে শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ব্যাপকভাবে। সরকারি সাইনবোর্ড দিয়ে রাখায় অভিভাবকগণ অনেকটা প্রতারিতই হচ্ছেন। বিশেষ করে গরীব ও নিম্ন আয়ের অভিভাবকগণ বিপাকে পড়েছেন সবচেয়ে বেশি। অপরদিকে প্রায় পাঁচ বছর ধরে প্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষক নিয়োগের উপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় অনেক বিষয়ের শিক্ষক নেই। অনেক প্রতিষ্ঠানে পাঠদান চলছে খণ্ডকালীন শিক্ষক দিয়ে। আত্তীকরণ সম্পন্ন না হওয়ার কারণে শিক্ষক নিয়োগও দেওয়া হচ্ছে না।

সরকারি কলেজ স্বাধীনতা শিক্ষক সমিতির পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, “সরকারিকরণের কাজগুলো একটু জটিল ও সময়সাপেক্ষ। বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীদের আত্তীকরণের কাজ চলছে। কিছু কলেজের ফাইল জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বাকিগুলো শেষ করে দ্রুতই পাঠানো হবে। তারপর এডহক নিয়োগের কাজ সম্পন্ন করা হবে। এ কাজটি শেষ করে শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা নিয়মিত হয়ে গেলেই শিক্ষার্থীদের সরকারিভাবে বেতন ও ফি নির্ধারণ হয়ে যাবে। নতুনভাবে তখন শিক্ষক নিয়োগ দিতে আর কোনো বাধা থাকবেনা বিধায় শিক্ষক সংকটও কমে আসবে। অভিভাবকরাও পাবেন সরকারিভাবে বেতন ও ফি দেওয়ার সুযোগ।”

কিছুদিন আগে নাটোরের নলডাঙা উপজেলার শহিদ নজমুল হক সরকারি কলেজের একজন সম্মানিত শিক্ষক সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে আক্ষেপ করে লিখেছেন, “আমি আশা ছেড়ে দিয়েছি। যখন চাকরিকাল ৮ বছর হলো তখন সরকারিভাবে সিনিয়র স্কেল বন্ধ হয়ে গেল। আবার যখন সহকারী অধ্যাপক হবো তখন কলেজ সরকারিকরণের কারণে তাও হলোনা। আজীবন প্রভাষক থেকে গেলাম। সামনে অবসরে যাব। জীবনে কোনো কিছুই হলো না। এমনকি স্ত্রীকে জীবনে একটি ভালো শাড়ীও কিনে দিতে পারিনি। ছেলেমেয়ের কোনো আশা পূরণ করতে পারিনি। খুব কষ্টে পারিবারিক বিষয় লিখলাম। ক্ষমা করবেন। আমার ভালো কিছু হয়না! জীবনের উপলব্ধি। বি:দ্র: ধনী ছাড়া কেউ এ পেশায় আসা উচিৎ না।”

এ আক্ষেপ শুধু তাঁর একার নয়, এ আক্ষেপ আমাদের সকল শিক্ষক-কর্মচারীগণের। প্রায় পাঁচ বছর ধরে বিভিন্ন অযুহাতে ঝুলে আছে সরকারিকরণের কাজ। একই ফাইল বিভিন্ন যায়গায় বারবার দেখার কারণে সময়ক্ষেপণ হচ্ছে অনেক বেশি। আবার প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ভুলের কারণে অনেক শিক্ষক-কর্মচারীগণের পদ সৃজনের কাজ হচ্ছে না। অনেকের চাকরিকাল শেষ হওয়ার কারণে সরকারি কোনো সু্যোগ-সুবিধা ছাড়াই অবসরে গেছেন। অনেকের চাকরি শেষ হওয়ার পথে। বিধিমালার মারপ্যাঁচে পড়ে অনেক শিক্ষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কলেজের ক্ষেত্রে ‘সরকারিকৃত কলেজ শিক্ষক ও কর্মচারী আত্তীকরণ বিধিমালা ২০১৮’ এ কার্যকর চাকরিকাল মোট চাকরিকালের অর্ধেক এবং তা শুধু পেনসন ও ছুটির জন্য গণনাযোগ্য হবে বলে উল্লেখ রয়েছে। বিধিমালায় দীর্ঘ দিনের ইতিহাস ভেঙে প্রথমবারের মতো কলেজের শিক্ষকদের ‘ক্যাডার পদ’ বাদ দিয়ে ‘নন ক্যাডার’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আবার অনেক শিক্ষক অন্য প্রতিষ্ঠান থেকে দীর্ঘদিন চাকরি করে ইনডেক্স নিয়ে আসলেও পূর্বের অভিজ্ঞতা যোগ করা হচ্ছেনা। এরকম অনেক অভিযোগ রয়েছে আমাদের কলেজ শিক্ষকদের।

শিক্ষাব্যবস্থাকে আরো যুগোপযোগী ও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা বিস্তারের লক্ষ্যে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রতিটি উপজেলায় একটি করে মাধ্যমিক স্কুল ও একটি করে কলেজ সরকারিকরণের ঘোষণা দেন। ঘোষণা অনুযায়ী ২০১৬ সাল থেকে এ কাজ শুরু হলেও ২০২০ সালের শেষ দিকে এসেও শেষ হয়নি সরকারিকরণের কাজ। এরই মধ্যে আঞ্চলিক কর্মকর্তারা সরেজমিনে একবার কাগজপত্র যাচাই বাছাই করেন। একই কাগজপত্র দ্বিতীয়বারের মতো মাউশিতেও যাচাই বাছাই করা হয়। মাউশি থেকে কাগজপত্র যাচাই বাছাই শেষ করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে সেখানে আবার শুরু হয় একই কাগজপত্র তৃতীয়বারের মতো যাচাই বাছাইয়ের কাজ। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা মাত্র কয়েকটি কলেজের কাজ শেষ করলেও করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে তা বেশকিছু সময় বন্ধ ছিল। বর্তমানে এ কাজ চলমান থাকলেও কাজের গতি খুবই কম। সদ্য পাঁচ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি গঠন করা হলেও সে পরিমাণে কাজ করতে পারছেন না তাঁরা। ১৮ আগস্ট থেকে নতুন করে শিক্ষা মন্ত্রণালয় কলেজগুলোর যাচাই বাছাইয়ের কাজ শুরু করে এ মাসে মোট ১৪ দিনে প্রায় ১৫ টি কলেজের কাজ শেষ করেন। সেপ্টেম্বর মাসে ৩০ দিনে নতুন করে যাচাই বাছাই করা হয় আরো প্রায় ১৫ টি কলেজ। শিক্ষা দর্পণ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category