আজ ১০ই শ্রাবণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ২৫শে জুলাই, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সময় : রাত ১০:০৪

বার : রবিবার

ঋতু : বর্ষাকাল

মহিমান্বিত শবে কদর:এম. এম আতিকুর রহমান

আছাদ আল মাহদীঃ-

‘শবে কদর’ কথাটি ফারসি। শব মানে রাত বা রজনী। আর কদর মানে সম্মান, মর্যাদা, গুণাগুণ, সম্ভাবনা, ভাগ্য ইত্যাদি।
শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী।
️কদরের একাধিক অর্থ রয়েছে। যেমন : কদরের এক অর্থ সম্মান। ইরশাদ হয়েছে :
আর তারা আল্লাহকে যথার্থ সম্মান দেয়নি। সূরা আল আনআম:৯১
সে হিসেবে লায়লাতুল কদর অর্থ হবে সম্মানিত রাত; কেননা এ রাতে কুরআন নাযিল হয়েছে, এ রাতে ফেরেশতাগণ নেমে আসেন এবং এ রাতে রবকত-রহমত-মাগফিরাত নাযিল হয়।

কদরের আরেক অর্থ সংকীর্ণকরণ, যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন: আর যার রিয্ক সংকীর্ণ করা হয়েছে সে যেন আল্লাহ তাকে যা দিয়েছেন তা হতে ব্যয় করে। সূরা আত-তালাক:৭
লায়লাতুল কদরের ক্ষেত্রে সংকীর্ণকরণের অর্থ হবে লায়লাতুল কদর সংঘটিত হওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ গোপন করে রাখা।

কাদ্র কাদার থেকেও উৎকলিত হতে পারে, যার অর্থ হবে এ রাতে আল্লাহ তাআলা সে বছরের সকল আহকাম নির্ধারণ করেন। আল্লাহ তাআলা বলেন:
সে রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত অনুমোদিত হয়।
সূরা আদ-দুখান:৪
শবে কদর অর্থ হলো মর্যাদার রাত বা ভাগ্যরজনী।
ভারতীয় উপমহাদেশ, পারস্যসহ পৃথিবীর অনেক দেশের ফারসি, উর্দু, বাংলা, হিন্দি নানা ভাষাভাষী মানুষের কাছে এটি ‘শবে কদর’ নামেই সমধিক পরিচিত।

কদর নামকরণের কারণ ঃ
যেহেতু এ রজনী অত্যন্ত মহিমান্বিত ও সম্মানিত তাই এ রজনীকে লাইলাতুল কদর বলা হয়ে থাকে। আবার এ রাত্রে যেহেতু পরবর্তী এক বৎসরের অবধারিত বিধিলিপি ফেরেশতাদের কাছে হস্তান্তর করা হয় সে কারণেও এ রজনীকে কদরের রজনী বলা হয়।

পবিত্র কুরআন নাযিল হয় ?
রমজান মাস পবিত্র কোরআন নাজিলের মাস।
আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘রমজান মাস! যে মাসে কুরআন নাজিল হয়েছে মানবতার দিশারি ও হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনরূপে।’
সুরা আল বাকারা, আয়াত: ১৮৫,

শবে কদরেই কুরআন নাজিলঃ
এ রাতেই প্রথম পবিত্র মক্কা মুকাররমার হেরা পর্বতের গুহায় মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে ফেরেশতাদের সরদার হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালামের মাধ্যমে বিশ্বনবী হজরত মুহাম্মাদ (সা.)-এর প্রতি মহাগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ হয়।
আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘নিশ্চয়ই আমি কোরআন নাজিল করেছি মর্যাদাপূর্ণ কদর রজনীতে।

️পবিত্র কুরআনের শ্রেষ্টত্ব ও বৈশিষ্ট হলো –
কুরআন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ আসমানি কিতাব। আসমানি একশ সহিফা, চারখানা কিতাবের মধ্যে কুরআনই সেরা। কারণ, এই কিতাব নাজিল হয়েছে আখেরি নবী, সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, নবীগণের ইমাম, রাসুলদের সরদার, সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব হজরত মুহাম্মাদ মুস্তফা আহমদ মুজতবা (সা.) এর প্রতি। এই কোরআনের স্পর্শ বড়ই সৌভাগ্যের।
হজরত জিবরাইল আলাইহিস সালাম এই কুরআন বহন করেই ফেরেশতাদের সরদার হওয়ার গৌরব লাভ করেছেন।
মরুর দেশ ‘জজিরাতুল আরব’ এই কুরআনের স্পর্শেই পবিত্র আরব ভূমির সম্মান লাভ করেছে।
অলক্ষুনে ও দুর্ভোগময় খ্যাত ‘ইয়াসরিব’ এই কুরআনের বরকতেই পুণ্য ভূমি ‘মদিনা মুনাওয়ারা’র সম্মানে ধন্য হয়েছে। তাগুতের আখড়া পাপের আকর শিরক ও কুফরের শীর্ষ তীর্থস্থান ‘বাক্কা’ এই কুরআনের তাজাল্লিতে পবিত্র মক্কা নগরীতে রূপান্তরিত হয়েছে।
এই কুরআনের পরশে স্বল্পমূল্যের কাপড়ের গিলাফও বুকে জড়ানোর সম্মান পাচ্ছে।
এই কুরআনের ছোঁয়ায় সাধারণ কাঠের বা প্লাস্টিকের রেহালও সম্মানের চুমু পাচ্ছে।
সর্বোপরি কুরআনের সংস্পর্শে একটি সাধারণ রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা ‘শবে কদর’ রজনীর মহিমান্বিত সম্মানে ভূষিত হয়েছে।
কুরআনের সঙ্গে যার যতটুকু সম্পর্ক ও সংস্পর্শ থাকবে, তিনি ততটুকু সম্মানিত ও মর্যাদার অধিকারী হবেন।
প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, কুরআনওয়ালাই আল্লাহওয়ালা এবং তাঁর খাস ব্যক্তি। (বুখারি শরিফ)।
প্রিয় হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যার অন্তরে কুরআনের সামান্যতম অংশও নেই, সে যেন এক বিরান বাড়ি।
(বুখারি ও মুসলিম শরিফ)

️লায়লাতুল কদরের ফজিলত ও মর্যাদা-
কদরের ফজিলত বোঝানোর জন্য মহান আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে ‘কদর’ নামে আলাদা একটি সূরাই অবতীর্ণ করেন। কেবল কুরআন নয় বরং হাদিসেও কদরের ফজিলত রয়েছে বলে প্রমাণ রয়েছে।
লায়লাতুল কদরেই পবিত্র কুরআন নাযিল করা হয়েছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
নিশ্চয় আমি এটি নাযিল করেছি লাইলাতুল কদরে।
সূরা আল কাদর, আয়াত ১

লায়লাতুল কদর হাজার মাস থেকেও উত্তম।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
লায়লাতুল কদর এক হাজার মাস থেকে উত্তম। সূরা আল-কাদর, আয়াত ২
অর্থাৎ লায়লাতুল কদরে আমল করা লায়লাতুল কদরের বাইরে এক হাজার মাস আমল করার চেয়েও উত্তম।
লায়লাতুল কদরে ফেরেশতা ও জিব্রীল এর অবতরণ।
আল্লাহ তাআলা বলেন –
সে রাতে ফেরেশতারা ও রূহ (জিব্রীল) তাদের রবের অনুমতিক্রমে সকল সিদ্ধান্ত নিয়ে অবতরণ করে। সূরা আল কাদর, আয়াত ৪

আবু হুরায়রা রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,‘লায়লাতুল কদর হলো সাতাশ তারিখ অথবা ঊনত্রিশ তারিখের রাত, আর ফেরেশতাগণ এ রাতে পৃথিবীতে কঙ্করের সংখ্যা থেকেও বেশি থাকেন।

হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে, শবে কদরে হজরত জিবরাইল (আ.) ফেরেশতাদের বিরাট এক দল নিয়ে পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং যত নারী-পুরুষ নামাজরত অথবা জিকিরে মশগুল থাকে, তাদের জন্য রহমতের দোয়া করেন। (তাফসিরে মাজহারি)
লায়লাতুল কদর হলো শান্তির রাত। আল্লাহ তাআলা বলেন :
শান্তিময় সেই রাত, ফজরের সূচনা পর্যন্ত। সূরা আল কাদর, আয়াত ৫।

লায়লাতুল কদর অত্যন্ত মুবারক রাত। এজন্য রমজানের শেষ দশক এতে কাফ এর মাধ্যমে মহিমান্বিত এ রজনীকে তালাশ করার ও পাওয়াকে বিশ্ব নবী হযরত মুহাম্মদ সাঃ সহজ করে দিয়েছেন। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা আমাদেরকে এর সমস্ত ফয়েজ এবং বারাকাত দিয়ে দুনিয়া ও আখেরাতে ভরপুর কামিয়াবি নসিব করুন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category