আজ ১৬ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ১লা ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সময় : রাত ২:৫৭

বার : বুধবার

ঋতু : হেমন্তকাল

উজিরপুরে রিমান্ডে নারী নির্যাতন ঘটনার নতুন মোর

মেডিকেল রিপোর্টে মেলেনি যৌন নির্যাতনের আলামত, শরীরের আঘাতের চিহ্ন পুরানো।

জাকির হোসেন, বরিশাল।। উজিরপুরে রিমান্ডে নারী নির্যাতন ঘটনায় দেখা দিয়েছে নতুন মোর।মেডিকেল রিপোর্টে আসা মাত্রই সকল নাটকীয়তা বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে। হ্যা বর্তমান সময়ের আলোচিত ঘটনা বরিশালের উজিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলার নারী আসামিকে রিমান্ডে নিয়ে শারীরিক এবং যৌন নির্যাতনের ঘটনা। এই ঘটনায় এরি মধ্যে থানার ওসিসহ দুই কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। পাশাপাশি একজন সার্কেল এএসপি এবং থানার ওসিসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছেন ওই নারী। তাছাড়া ঘটনায় অভিযোগ ওঠা পুলিশ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় তদন্তও চলছে।

ঠিক সেই মুহুর্তে রিমান্ডে নিয়ে যৌন নির্যাতনের ঘটনাটি ভিন্ন দিকে মোড় নিতে শুরু করেছে। কেননা নারীর করা যৌন নির্যাতনের অভিযোগের সত্যতা মেলেনি মেডিকেল রিপোর্টে। এমনকি আঘাতের যে চিহ্ন দেখা গেছে তাও অনেক পুরানো বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই রিপোর্টে। গত ৩ জুলাই শের-ই বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় হাসপাতাল থেকে আদালত এবং পুলিশের কাছে পাঠানো মেডিকেল রিপোর্ট থেকে এই তথ্য জানা গেছে। ওই হাসপাতালের গাইনী বিভাগের ইউনিট-২ এর একজন নারী ইন্ডোর মেডিকেল অফিসার মিনতি বিশ্বাস ওরফে মিতু অধিকারীর এই মেডিকেল রিপোর্ট তৈরি করেছেন।

যদিও মেডিকেল রিপোর্টে কি আছে সে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত নন বলে দাবি করেছেন বরিশাল শের-ই বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ.এম সাইফুল ইসলাম। তাছাড়া ঘটনাটি বিচার এবং তদন্তাধিন থাকায় এ নিয়ে কোন মন্তব্য করতে রাজি হননি জেলা পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

এর আগে গত ২৬ জুন বরিশালের উজিরপুর উপজেলার জামবাড়ি এলাকায় পরকীয়া প্রেমিকার বাড়ির পাশ থেকে উদ্ধার করা হয় বাসুদেব চক্রবর্তী টুলু নামের এক ব্যক্তির মৃতদেহ। ওই ঘটনায় নিহতের ভাই বরুন চক্রবর্তী বাদী হয়ে ২৭ জুন উজিরপুর মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন। মামলায় নিহতের পরকীয়া প্রেমিকা মিনতি বিশ্বাস মিতুকে একমাত্র আসামি করা হয়।

মামলার সূত্র ধরে ২৮ জুন গ্রেফতার করা হয়নি মিতু অধিকারীকে। পরবর্তী ২৯ জুন পুলিশের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বরিশালের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট উজিরপুর আমলী আদালত নারীকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। রিমান্ড শেষে গত ২ জুলাই মিনতি বিশ্বাসকে আদালতে হাজির করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা উজিরপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. মাইনুল ইসলাম।

আদালতে দাড়িয়ে বিচারকের কাছে পুলিশের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ করেন মিনতি। তিনি আদালতকে জানান, ‘৩০ জুন সকালে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা তাকে নিজের কক্ষে নিয়ে যায়। সেখানে জোর করে হত্যা মামলার স্বীকারক্তি আদায়ের চেষ্টা করেন। এজন্য নারীর শরীরের স্পর্শকাতর স্থানে হাত দিয়ে যৌন নির্যাতন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিছুক্ষণ পরে এক নারী পুলিশ সদস্যকে ডেকে এনে মারধর এবং পরবর্তীতে তদন্ত কর্মকর্তা নিজেও ১৫-২০ মিনিট উপুর্যপরি পেটান।

এদিকে, আদালত অভিযোগ শুনে ওই নারীকে যথাযথ চিকিৎসা প্রদান এবং তাকে নির্যাতনের বিষয়ে ২৪ ঘন্টার মধ্যে মেডিকেল প্রতিবেদন দিতে বলেন শেবাচিম হাসপাতাল পরিচালককে। নির্দেশ অনুযায়ী গত ৩ জুলাই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে পাঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

শেবাচিম থেকে পাঠানো ওই তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে দুই কনুই, গোড়ালিসহ ৬টি স্থানে ৬ থেকে ৮টি আঘাত রয়েছে। তবে সবগুলোই অনেক পুরানো আঘাত। সবমিলিয়ে আঘাতের গুরুত্ব সিম্পল (নরমাল) বলে মেডিকেল রিপোর্টে রোগীর ইতিহাসে উল্লেখ করেছেন চিকিৎসক। অবশ্য আঘাতগুলো কতটা পুরানো সে বিষয়ে উল্লেখ নেই তদন্ত প্রতিবেদনে।

মেডিকেল রিপোর্টের বিষয়ে আলাপকালে শেবাচিম হাসপাতালের পরিচালক ডা. এইচ.এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘আদালত নির্দেশে দিয়েছে একজন নারী চিকিৎসক দিয়ে ওই ভিকটিমের পরীক্ষা করে ২৪ ঘন্টার মধ্যে রিপোর্ট দিতে। নির্দেশনা অনুযায়ী নারী চিকিৎসক দিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। ওই চিকিৎসক মেডিকেল রিপোর্ট খামে ভরে আমাকে দিয়ে গেছেন। তিনি যেভাবে দিয়েছেন সেভাবেই আদালতে পাঠিয়েছি। সুতরাং রিপোর্টে কি আছে সেটা আমার দেখার সুযোগ হয়নি।

এদিকে, স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিতে গিয়ে অভিযোগকারী নারীর বিষয়ে বিভিন্ন তথ্য উপাথ্য বেরিয়ে আসে। নাম গোপন রেখে ওই নারীর কয়েকজন প্রতিবেশী জানিয়েছেন, ‘ইতোপূর্বে মিতুর আরও দুজন স্বামী ছিল। কিন্তু তাদের সাথে মিতুর কোন যোগাযোগ নেই। মিতু বাবা-মায়ের পরিবার ছেড়ে জামবাড়ি গ্রামে ৫০০ টাকায় ঘর ভাড়া নিয়ে একা বসবাস করেন।

বাসুদেব নামে যাকে হত্যার অভিযোগ উঠেছে তার সাথে দীর্ঘ দিন ধরেই পরকীয়ার সম্পর্ক চলে আসছিল মিনতির। বাসুদেব একসময় ট্রাক চালক ছিলেন। পরকীয়ার সূত্র ধরে বাসুদেব এর কাছ থেকে অনেক অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন তিনি। সম্প্রতি বাসুদেব ট্রাক চালোনার কাজ ছেড়ে দেন। এর পর থেকেই দুজনের মধ্যে সম্পর্কের ফাঁড়াক সৃষ্টি হয়।

এ প্রসঙ্গে বরিশাল জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহজাহান হোসেন বলেন, ‘একজনের নামে অভিযোগ আসতেই পারে। কিন্তু সব অভিযোগ কি সত্য হয়? অবশ্যই অভিযোগের প্রমাণ থাকতে হয়। তার পরেও আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী উজিরপুরের দুই ওসিকে ক্লজড করা হয়েছে। একজন এএসপি এবং দুজন ওসিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। ডিআইজি কার্যালয় থেকে তদন্ত করা হচ্ছে। পাশাপাশি এই ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয়েছে। আশা করছি সুষ্ঠু তদন্তে সবকিছু পরিস্কার হবে। আমাদের কোন অফিসারের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা মিললে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category