বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা,ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ঘটনাগুলো বিচার ‘দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের’ মাধ্যমে করার দাবিতে গতকাল সোমবার (১২ আগষ্ট) মৌলভীবাজার জেলার চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গল চৌমুহনী অবরোধ করে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল হয়েছে।
বাংলাদেশ হিন্দু জাগরণ মঞ্চ এবং সনাতন ছাত্র ও নাগরিক সমাজের ব্যানারে প্রথমে পবিত্র গীতা পাঠ,জাতীয় সঙ্গীত ও সনাতনী নারীদের উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে এই কর্মসূচি শুরু হয়। এ সময় তাঁরা সাম্প্রদায়িক সহিংসতায় ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেয়া সহ পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করার দাবি জানান।
শ্রীমঙ্গলের সর্ব পরিচিত ও সমাজসেবক এস.কে দাস সুমন মঙ্গলবার (১৩ আগষ্ট) জানান,'গতকাল সোমবার শ্রীমঙ্গল চৌমুহনী হয়ে কলেজ রোড,গুহ রোড বেলা ৩টায় শ্রীমঙ্গল রেলওয়ে স্টেশনের সামনে মানববন্ধনের মাধ্যমে আন্দোলনকারীরা কর্মসূচি শুরু করেন। সেখানে প্রায় দেড় ঘণ্টা অবস্থানের পর বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে বৃষ্টির মধ্যে প্রতিবাদ সমাবেশ ও বিক্ষোভ মিছিল করেন তাঁরা'।
তিনি আরও জানান,'এতে সনাতন ছাত্র ও নাগরিক সমাজের নেতাকর্মীসহ শ্রীমঙ্গলের আশেপাশের এলাকার সর্বস্তরের সনাতনী নারী-পুরুষ সহ কিশোর,তরুণ,যুবক, বয়োজ্যেষ্ঠজনেরা যোগ দেন'।
সমাবেশ স্থল থেকে তখন সকল সনাতনীরা বিভিন্ন ধরনের স্লোগান দেন। এর মধ্যে ছিল ‘আমার মন্দিরে হামলা কেন, জবাব চাই জবাব চাই’, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা কেন, জবাব চাই জবাব চাই’, ‘জাস্টিস জাস্টিস, উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ প্রভৃতি।
আন্দোলনকারীদের হাতে ‘আমার মাটি আমার মা,এই দেশ ছাড়ব না’, ‘ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার’, ‘সেভ বাংলাদেশি হিন্দুস’, ‘হিন্দুস হেভ রাইট টু লিভ’সহ নানা ধরনের প্ল্যাকার্ডও ছিল।
উল্লেখ্য যে,সাম্প্রদায়িক সহিংসতার বিচার-ক্ষতিপূরণ- পুনর্বাসনসহ মোট আট দফা দাবিতে গত শুক্রবার প্রথম শাহবাগ অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন আন্দোলনকারীরা। একই দাবিতে পরদিন শনিবারও শাহবাগে অবরোধ করেন তাঁরা। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গতকাল রোববার তাঁরা প্রদীপ প্রজ্বালন করেন। যদিও তাঁরা একেক দিন একেক ব্যানার ব্যবহার করছেন। এই ৮ দফা দাবিতে আন্দোলন রাজধানী ঢাকার বাইরেও বিভিন্ন জায়গায় হচ্ছে।
বিচার-ক্ষতিপূরণ-পুনর্বাসন ছাড়াও তাঁদের ৮ দফার মধ্যে রয়েছেঃ-
(১) সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দোষীদের দ্রততম সময়ে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান,ক্ষতিগ্রস্তদের যথোপযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
(২) অনতিবিলম্বে 'সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন' প্রণয়ন করতে হবে।
(৩) 'সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয়' গঠন করতে হবে।
(৪)হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকেও ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে।
(৫) 'দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন' প্রণয়ন এবং 'অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন' যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
(৬) প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের জন্য উপাসনালয় নির্মাণ এবং প্রতিটি হোস্টেলে প্রার্থনাকক্ষ বরাদ্দ করতে হবে।
(৭) 'সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড' আধুনিকায়ন করতে হবে।
(৮) শারদীয় দুর্গাপূজায় ৫ দিন ছুটির ঘোষণা দিতে হবে।
নতুন কর্মসূচি ঘোষণার মধ্য দিয়ে গতকাল শাহবাগের বিক্ষোভ সমাবেশ শেষ করেন এই আন্দোলনের অন্যতম সমন্বয়ক নিহার হালদার। তিনি বলেন,দাবি আদায়ে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ, ছাত্র-যুবক ও সব অভিভাবকেরা আজ মঙ্গলবার (১৩ আগষ্ট) বেলা ৩টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে লাল কাপড় বেঁধে উপস্থিত হবেন।
এসব দাবির বিষয়ে হিন্দু জাগরণ মঞ্চ,তাদের বিভিন্ন জেলার প্রতিনিধি,অভিভাবক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অভিভাবকদের সমন্বয়ে সরকার ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের সঙ্গে বসতে চান বলেও জানান নিহার হালদার।
এদিকে গতকাল স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) এম সাখাওয়াত হোসেনের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন আন্দোলনকারীদের একটি অংশ। তাতে অংশ নেন বাংলাদেশ হিন্দু মহাজোটের মহাসচিব পলাশ কান্তি দে।
এদিকে গতকাল সোমবার (১২ আগষ্ট) স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিয়েছিলেন জাতীয় হিন্দু ছাত্র মহাজোটের সভাপতি অনুপম দাস। সেখানে যা আলোচনা হয়েছে,এ প্রসঙ্গে গতকাল জাতীয় জাদুঘরের সামনে মানববন্ধনে অনুপম দাস বলেন,স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার কাছে সংখ্যালঘুদের ওপর নির্যাতনের একটা সংক্ষিপ্ত তালিকা তুলে ধরা হয়েছে।
অনুপম দাস আরও বলেন,স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা দুর্গাপূজায় তিন দিনের সরকারি ছুটি দেবেন বলে জানিয়েছেন। সংখ্যালঘু কমিশন ও মন্ত্রণালয় গঠনের ব্যাপারেও তিনি দ্রুততম সময়ে পদক্ষেপ নেবেন। আসন্ন জন্মাষ্টমী ও দুর্গাপূজা নির্ভয়ে যেন পালন করা যায়,সেই ব্যবস্থা করার প্রতিশ্রুতিও তিনি দিয়েছেন। সারা দেশে কোথায় কোথায় হামলা হয়েছে,তার তালিকা তৈরির জন্য বলা হয়েছে। সংখ্যালঘুদের সব সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও বসতে চেয়েছেন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা।
সিলেট নিউজ/এসডি.