সত্যজিৎ দাস:
সাংঘাতিকতার জনপ্রিয়তা পৃথিবীতে কখনো কমে না। কিন্তু সাংবাদিকতার সংকট,তা রাজধানী ঢাকা হোক বা মফস্বল- প্রতিনিয়ত স্পষ্ট হয়ে উঠছে। সত্য-মিথ্যা,সৎ-অসৎ,ভালো-মন্দের লড়াই যতদিন পৃথিবীতে মানুষ থাকবে,ততদিন থাকবে।
প্রশ্ন হচ্ছে: যারা এই লড়াইয়ে দাঁড়িয়ে সত্য বলার দায়িত্ব নেন, সেই সাংবাদিকদের জীবন কেমন কাটছে? বিশেষ করে ঢাকার বাইরের মফস্বলে কর্মরত সাংবাদিকরা কোন বাস্তবতায় দিন কাটাচ্ছেন,তা কি কেউ খুঁজে দেখছে?
রাজধানী ঢাকার বাইরের অঞ্চলগুলোকে সাধারণত অনেকেই গেঁয়ো বা গ্রাম্য বলে অবহেলা করেন। অথচ সেখানেই সাংবাদিকরা সীমাহীন সংকটে কাজ করেন। তাদের সংসারে খাবার আছে কি না,সন্তানদের পড়াশোনা চলছে কি না,ন্যূনতম চিকিৎসা পাচ্ছেন কি না,এসব খোঁজ নেওয়ার মানুষ খুব কম।
অধিকাংশ মফস্বল সাংবাদিক সামান্য সম্মানীর ওপর নির্ভর করেন,যা দিয়ে পরিবার চালানো প্রায় অসম্ভব। মান-সম্মানের কারণে তাঁরা মুখ ফুটে বলতে পারেন না,আবার পেছনে সরে যাওয়ারও সুযোগ নেই। ফলে এক ধরনের অদৃশ্য দারিদ্র্য আর অনিশ্চয়তা তাঁদের গ্রাস করে রাখে।
১) আর্থিক সংকট: অনেক সাংবাদিক ন্যূনতম বেতনও পান না। এর ফলে তাঁরা নানা প্রভাবের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন, যা সাংবাদিকতার নৈতিক মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করে।
২) নিরাপত্তাহীনতা: হামলা,হুমকি ও হয়রানির শিকার হওয়া মফস্বল সাংবাদিকদের নিত্যসঙ্গী। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকরা প্রভাবশালী গোষ্ঠীর লক্ষ্যবস্তু হন।
৩) আইনি জটিলতা: উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মামলা তাঁদের কাজকে কঠিন করে তোলে। অনেক সময় আইনকেই হাতিয়ার বানিয়ে সাংবাদিকদের দমন করা হয়।
৪) রাজনৈতিক চাপ: প্রভাবশালী গোষ্ঠী বা রাজনৈতিক মহলের চাপের কারণে স্বাধীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ কঠিন হয়ে পড়ে।
৫) প্রশিক্ষণ ও পেশাগত উন্নয়ন: পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা অর্জনের সুযোগ না থাকায় অনেক সাংবাদিকের কাজের মান ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
৬) গণমাধ্যম মালিকদের ভূমিকা: বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মালিকপক্ষ সাংবাদিকদের অধিকার ও নিরাপত্তা রক্ষায় ব্যর্থ হয়।
জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের (UDHR) ১৯ অনুচ্ছেদে মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে মৌলিক মানবাধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। একইভাবে,আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার চুক্তির (ICCPR) ১৯ অনুচ্ছেদও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিশ্চিত করে।
তবে বাস্তবে নানা দেশে নতুন নতুন আইন প্রণীত হলেও তা সাংবাদিকদের সুরক্ষা নয়,বরং নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। এর ফলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সীমিত হচ্ছে এবং সাংবাদিকদের পরিবারসহ তাঁদের জীবন হয়ে উঠছে ঝুঁকিপূর্ণ।
সাংবাদিকতা একটি সুস্থ গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু যখন সাংবাদিকরা আর্থিক সংকট,নিরাপত্তাহীনতা, রাজনৈতিক চাপ এবং আইনি হয়রানির শিকার হন,তখন গণমাধ্যম দুর্বল হয়,তথ্যপ্রবাহ সীমিত হয়,আর জনগণ বঞ্চিত হয় প্রকৃত সত্য জানার অধিকার থেকে।
মফস্বল সাংবাদিকদের এই দৈন্যদশা কেবল ব্যক্তিগত নয়,বরং গোটা গণতান্ত্রিক কাঠামোর জন্য হুমকি।
সাংঘাতিকতা হয়তো সবসময় আলোচিত,কিন্তু সাংবাদিকতা আজ গভীর সংকটে। মফস্বল হোক বা রাজধানী,সাংবাদিকদের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা কাগজে-কলমেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর গণতন্ত্র তার শক্তি হারাবে জনগণের কণ্ঠরোধের ভেতর দিয়ে।
সিলেট নিউজ/এসডি.