সত্যজিৎ দাস:
কালভৈরব হলেন হিন্দু দেবতা শিবের একটি শক্তিশালী এবং ভয়ংকর রূপ,যিনি সময় (কাল) এবং মৃত্যুর উপর কর্তৃত্ব করেন। তাকে সাধারণত ভৈরব বা কাল ভৈরব নামে ডাকা হয় এবং তিনি অত্যন্ত ভয়ানক হলেও ভক্তদের কাছে তিনি রক্ষা ও মুক্তির প্রতীক।
কালভৈরব জয়ন্তী ২০২৫:
তারিখ: বুধবার,১২ নভেম্বর ২০২৫ ইং
তিথি: মার্গশীর্ষ মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি (ভৈরব অষ্টমী বা কালাষ্টমী)
কালভৈরব জয়ন্তীর গুরুত্ব:
কালভৈরব জয়ন্তী ভগবান কালভৈরবের জন্মতিথি হিসেবে পালিত হয়। তিনি ভগবান শিবের উগ্র ও রৌদ্ররূপ, যিনি “কাশীর কোতোয়াল” বা কাশীর রক্ষাকর্তা নামে পরিচিত। বিশ্বাস করা হয়,ভগবান ভৈরবের আরাধনা ছাড়া ভগবান বিশ্বনাথের পূজা অসম্পূর্ণ থাকে।
যে ব্যক্তি ভগবান ভৈরবের ভক্তদের কষ্ট দেয়,সে তিন জগতে কোথাও আশ্রয় পায় না। ভগবান ভৈরবের কৃপা প্রাপ্ত হলে জীবনে সুখ,সমৃদ্ধি ও শত্রুর বিনাশ ঘটে,এবং সমস্ত নেতিবাচক শক্তি দূর হয়।
শাস্ত্রীয় পটভূমি:
শিবপুরাণ অনুসারে,একবার ব্রহ্মা-বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে বিবাদ হয়। ব্রহ্মা যখন শিবের অবমাননা করেন,তখন শিব রৌদ্ররূপ ধারণ করে কালভৈরব রূপে প্রকাশিত হন এবং ব্রহ্মার পঞ্চম মাথা ছিন্ন করেন। এতে ব্রহ্মহত্যার পাপ হয়। পরে তিনি তিন লোক ভ্রমণ করে কাশীতে এসে সেই পাপ থেকে মুক্তি লাভ করেন।
এই কারণেই কাশীকে কালভৈরবের বিশেষ তীর্থস্থান হিসেবে গণ্য করা হয়।
কালাষ্টমী ও এর তাৎপর্য:
প্রতি মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথি কালাষ্টমী নামে পরিচিত, যা ভগবান কালভৈরবকে উৎসর্গ করা হয়। তবে মার্গশীর্ষ মাসের কালাষ্টমী বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ,কারণ এই দিনেই ভগবান কালভৈরবের আবির্ভাব হয়েছিল।
বিশ্বাস করা হয়,এই তিথিতে উপবাস ও পূজা করলে জীবনের সকল দুঃখ-কষ্ট দূর হয়,শত্রুরা পরাস্ত হয় এবং পাপের প্রায়শ্চিত্ত হয়।
কালভৈরব পূজার বিধি:
১) পবিত্রতা ও সংকল্প: সকালে স্নান সেরে পরিষ্কার পোশাক পরুন। হাতে জল,ফুল ও অক্ষত নিয়ে উপবাস ও পূজার সংকল্প করুন।
২) স্থাপন: পূজাস্থানে ভগবান শিব-পার্বতী ও কালভৈরবের ছবি বা মূর্তি স্থাপন করুন।
৩) প্রদীপ ও ধূপ: সরিষার তেলের চারমুখী প্রদীপ জ্বালিয়ে গুগ্গুলু ধূপ দিন।
৪) নৈবেদ্য: বেলপাতা, ধুতুরা ফুল, কালো তিল, কালো উড়াদ ডাল, ফল, পঞ্চামৃত এবং ইমারতি বা জালেবি নিবেদন করুন।
৫) মন্ত্রজপ: রুদ্রাক্ষ মালা দিয়ে নিম্নোক্ত মন্ত্র অন্তত ১০৮ বার জপ করুন-
“ ওম কালভৈরবায় নমঃ ”
অথবা “ হ্রীম উম্মত্ত ভৈরবায় নমঃ ”
৬) আরতি ও পাঠ: পূজা শেষে কালভৈরবের কাহিনি পাঠ ও আরতি করুন।
৭) পূর্বপুরুষ স্মরণ: এই দিনে শ্রাদ্ধ ও পিতৃতর্পণ করাও শুভ বলে মনে করা হয়।
বিশেষ প্রতিকার ও দান:
কুকুরকে খাদ্য দান: কালভৈরবের বাহন কালো কুকুর। তাই এই দিনে কুকুরকে মিষ্টি রুটি,গুড়ের মালপোয়া বা পুডিং খাওয়ানো অত্যন্ত শুভ।
দারিদ্র্য দূরীকরণে: অর্থনৈতিক কষ্টে ভুগলে এই দিনে কুকুরকে গুড় ও রুটি খাওয়ালে ভাগ্য উন্নতি হয়।
রোগমুক্তির জন্য: গম,কম্বল বা গরম কাপড় গরিবদের দান করুন।
শত্রুনাশ ও উন্নতির জন্য: পাঁচ বা সাতটি লেবুর মালা তৈরি করে কালভৈরবকে অর্পণ করুন এবং মন্ত্র জপ করুন।
রাহু-কেতু দোষ নিবারণের জন্য: ভৈরবনাথ মন্দিরে গিয়ে কালভৈরবাষ্টক পাঠ করুন।
কালভৈরব উপাসনার ফল:
১) জীবনে শান্তি ও সমৃদ্ধি আসে।
২) শত্রু ও বাধা দূর হয়।
৩) ভূত-প্রেত ও অশুভ শক্তির প্রভাব থেকে সুরক্ষা মেলে।
৪) পাপ মোচন ও আধ্যাত্মিক উন্নতি ঘটে।
বিশেষ মন্ত্র:
“ওঁ নমঃ শিবায়”-এই মন্ত্র বেলপাতায় লাল বা সাদা চন্দন দিয়ে লিখে শিবলিঙ্গে নিবেদন করলে মহাদেব প্রসন্ন হন।
কালভৈরব জয়ন্তী তাই শুধু একটি তিথি নয়,এটি শক্তি,রক্ষা ও মুক্তির প্রতীক। এই দিনে ভগবান শিব ও তাঁর রুদ্ররূপ কালভৈরবের উপাসনা করলে জীবনে সর্বপ্রকার অশুভ শক্তি দূর হয় এবং শুভ শক্তির আশীর্বাদ লাভ হয়।
সিলেট নিউজ/এসডি.