অথই নূরুল আমিন:
সভ্যতার উচ্চ শিখরে আরোহিত, মানুষ আজ কেন
মানুষের কাছে অবহেলিত উপেক্ষিত হচ্ছে? যুগ যুগ ধরে মানুষ ভেদাভেদহীন ও সমতাভিত্তিক সমাজের স্বপ্ন দেখে আসছে। কিছু মানুষের সেই স্বপ্ন কি সার্থক হয়েছে? মানুষকে অসুস্থ, অস্বাভাবিক ও স্বস্তিহীন করে তোলাই যেন এই সভ্যতার প্রধান লক্ষ্য। আজকের পৃথিবীর কোথাও যেন মানুষের জীবনে শান্তি ও স্বস্তি নেই। পৃথিবীতে আজ মানুষ সবচেয়ে বেশি যার অভাব অনুভব করছে তার নাম শান্তি ও নিরাপত্তা।
এই সত্যযুগে মানুষের কাছে মানুষই হচ্ছে সবচেয়ে তুচ্ছ ও মূল্যহীন, বস্তুতঃ আজ এক কানাকড়ি মূল নেই মানুষের কাছে মানুষের। কথায় কথায় মানুষ মানুষের বুকে গুলি ছুঁড়ছে, ছোরা বসাচ্ছে, পৃথিবীর সভ্য ও উন্নত দেশগুলোতেও বিনা কারণে বা খুবই তুচ্ছ কারণে এমন কি হাসি-তামাশা করতে করতে পর্যন্ত মানুষ মানুষকে হত্যা করছে।
সভ্যতার জন্য এর চেয়ে লজ্জা ও গ্লানির আর কি থাকতে পারে? আমরা অহরহ সভা-সেমিনার কিংবা আন্তর্জাতিক ফোরামে মানব সম্পদ উন্নয়নের কথা বলছি। অথচ আমরা যে মানুষ, সেই মানুষের মত অবহেলিত ও উপেক্ষিত প্রাণীটির মত পৃথিবীতে বুঝি আর দ্বিতীয়টি নেই। মানুষ যতই ছুটছে অর্থ, বিত্ত, প্রতিষ্ঠানের পেছনে, ততই বাড়ছে মানুষে মানুষে ব্যবধান বাড়ছে ভেদাভেদ । বন্ধু আর বন্ধু থাকছেনা। আত্মীয় আর আত্মীয় থাকছে না। কাছের মানুষও হয়ে যাচ্ছে পর। ক্ষুদ্র স্বার্থ আর সামান্য লাভ ক্ষতির হিসেবটাই বড় হয়ে উঠছে মানুষের কাছে।
স্বার্থের দেয়ালে উঠে মানুষকে করছে বিভক্ত বিযুক্ত ও একেবারে বিচ্ছিন্ন। মানুষ ক্রমশঃ এই ভয়াবহ পরিণতির দিকেই এগিয়ে যাচ্ছে। কখনও বুঝে আবার কখনো বা না বুঝে । অন্যদিকে এই ভয়াবহ পরিণতির হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য এ যুগের কবি, দার্শনিক, ভাবুক ও চিন্তাবিদেরা অনেক পথ খুঁজেছেন। পৃথিবীর এই অসহায় বিপন্ন মানুষের অবস্থার কথা তাঁরা তুলে ধরেছেন।
তবুও মানুষ আরো ক্রমাগত শূন্যতার এক ভয়াবহ গহবরে নিক্ষিপ্ত হচ্ছে। মানুষের বিবেক, বিশ্বাস ও আদর্শ পৃথিবী থেকে বিতাড়িত হবার কারণেই বুঝি মানুষ মানুষের কাছে মূলাহীন হয়ে পড়েছে। অথচ এই মানুষ একদিন ক্রীতদাস প্রথার বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। সামাজিক অন্যায়-অবিচারের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু আজ কেন মানুষ মানুষের জন্য ভাবতে পারে না।
মানুষ কেন মানুষকে পণ্য করে? কেন তার অধিকার কেড়ে নেয়, ভিটে মাটি পযর্ন্ত ছাড়া করছে । অবহেলিত নির্যাতিত মানুষের জন্য মমত্ববোধ, মনুষ্যত্ব বিবর্জিত অনুশাসনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ, মানুষে মানুষে পারস্পরিক সৌভ্রাতৃত্বের বন্ধন কি সৃষ্টি করা যায় না?
সত্যি কথা বলতে কি, আমাদের আজকের এই সমাজ বৈষম্যে পরিপূণ্য। শুধু মানুষে মানুষে বৈষম্য নয়, বৈষম্য বিরাজ করছে অর্থনীতিতে, শিক্ষা-দীক্ষায়, সংস্কৃতিতে, কাজ ও চাকুরির অবস্থান এবং সামাজিক প্রভাবের হের ফেরে। বস্তুতঃ আমাদের সমাজে দারিদ্র্য যে কি কুৎসিত, কি যে ভয়ঙ্কর-বীভৎস, এই সত্য আমরা তেমন ভাবে উপলব্ধি করতে পারি না। এই রাজধানী শহর ঢাকার বড় বড় হোটেল গুলোর পাশে রক্ষিত ডাস্টবিনের দিকে একটু তাকালেই দেখা যাবে।
ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্ট খাবারগুলো কিভাবে কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছে আমাদের মতোই কত মানুষ। আবার ক্ষুধার জ্বালায় কত মানুষই বা মুখ থুবড়ে পড়ে আছে- রাস্তার ধারে। কিন্তু এই সুন্দর পৃথিবীতে মানুষতো এসেছে মানুষের জন্য। পৃথিবীর যা কিছু সৃষ্টি সবইতো মানুষের জন্য। তবু কেন মানুষকে পেটের জ্বালায় অন্যের অনুগ্রহের প্রতি তাকিয়ে থাকতে হয়?
মানুষে মানুষে কেন এত ভেদাভেদ? পরম করুণাময়আল্লাহ তো বিশ্বের সব মানুষকেই একই রক্ত-মাংসে সৃষ্টি করেছেন এবং সমানভাবে ভালবাসেন। তাঁর দয়ার কাছে বিশেষ কোনো জাতি, ধর্ম বা বর্ণ নয়। অথচ এই মানুষের দ্বারা সৃষ্ট বর্ণবাদের থাবায় নিস্পেসিত আজ আফ্রিকা- আমেকিরার কালো মানুষেরা।
এইতো কিছুদিন আগেও বসনিয়া, হার্জেগোভেনিয়া ও কসোেভায় হাজার হাজার নিরাপরাধ মানুষকে মানুষেই হত্যা করেছে। নাবালিকা থেকে বয়স্কা নারীদের এই মানুষই গণধর্ষণ করছে সে সব দেশে।
এমনকি বাংলাদেশের শিশুদের উটের পিঠে বেঁধে ছুটিয়ে নিয়ে তাদের ভীতসন্ত্রস্ত কান্নার আওয়াজ মধ্যপ্রাচ্যের শেখেরা আনন্দ-উল্লাস করছে। আবার এ মানুষই এদেশের কত নারীকে পাচার করে পতিতালয়ের বাসিন্দায় পরিণত করছে। এসব মনুষ্যত্বহীন অপকর্ম গুলো করছে মানুষই। নিঃসঙ্কোচ, নির্দ্বিধায়। আল্লাহর সৃষ্টি পৃথিবীর সব বস্তুর যেমন ধর্ম আছে তেমনি মানুষেরও ধর্ম হলো, বিবেকতাড়িত হওয়া এবং তা মানুষের জন্য। মানুষকে বাদ দিয়ে কখনই কিছুই ভাবাই যায় না। ধর্ম, কর্ম কিছুই করা যায় না। তাইতো মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম 'মানুষ' কবিতায় ভিখারী যখন পূজারীর কাছে দু'মুঠো অন্ন চেয়ে প্রত্যাখ্যাত হলো তখন বলেছিল- ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা তোমার নয়।
বিশ্ব জুড়ে আজ মানবতার জয়ধ্বনি গাওয়া হচ্ছে।
বিশ্ব মানবাধিকার সংস্থা প্রতিনিয়ত বিভিন্ন দেশের অত্যাচার-অবিচারের কাহিনী তুলে ধরছে। মানুষ মানুষের দ্বারা কিভাবে, লাঞ্ছিত ও নিগৃহীত হচ্ছে তা তুলে ধরার পেছনে রয়েছে মানবতা অসম্মান রোধ করার প্রয়াস।
কিন্তু এই প্রয়াস মনে হয় তখনই সম্ভব হবে যদি মানুষের মাঝে বিবেক ও চেতনার জন্ম হয়। আগে মানুষকে বুঝতে হবে- আমরা মানুষ, এটাই আমাদের বড় পরিচয়। কারণ ধর্ম ও বর্ণের পরিচয় দিয়ে মানুষকে ভিন্ন করা যায় না। পৃথিবীর সব মানুষই এক জাতি। তারা একই পৃথিবীতে একই সূর্য ও একই চাঁদের আলোতে প্রতিফলিত হচ্ছে। শীত, গরম আর ক্ষুধা-তৃষ্ণার অনুভূতি সকল মানুষেরই সমান। সকলেই সুস্থ, সবল খাওয়া-পরা জীবনের মৌলিক অধিকারের গ্যারান্টিসহ শান্তি ও স্বস্তির মধ্যে বাঁচতে চায়। কিন্তু হায়। বিশ্ব আজ বিরাট সঙ্কটের মুখোমুখি।
আমরা যেদিকে তাকাই শুধুই দেখি মানুষে মানুষে হানাহানি, মারামারি ও রক্তপাত। আমরা যেন এখন স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টিও হারিয়েছি। অন্যায়- অবিচার আর বিশ্বাসহীনতায় পেয়ে বসেছে পৃথিবীর মানুষকে। কিন্তু এ থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার কি কোনো পথ নেই? আমার মনে হয এ থেকে পরিত্রাণের একমাত্র পথ হলো- আগে মানুষকে বিশ্বাসহীনতার মাঝেও বিশ্বাসের জন্ম দিতে হবে। মানুষের মাঝে চেতনার উন্মেষ ঘটাতে হবে।
মানুষকে ভালবাসতে হবে। তাই প্রতিটি মানুষেরই মনে রাখা দরকার- বাইরের পরিচয় মানুষের আসল পরিচয় নয়। দেশে দেশে বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ ও সম্প্রদায়ের লোকের মধ্যে যে পার্থক্য তা শুধু বাইরের পার্থক্য। এক কথায় পৃথিবীর সব মানুষ এক। মানুষ যে মানুষ এটাই আসল পরিচয়। কবি সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের 'মানুষ, জাতি' কবিতার ক'টি পংক্তি উচ্চারণ করে বলতে হয়। দোসর খুঁজি ও বাসর বাঁধি গো, জলে ডুবি, বাঁচি পাইলে ডাঙ্গা কালো আর ধলো বাহিরে কেবল ভিতরে সবারি সমান রাঙা।
সুতরাং আজ মানুষে মানুষে বিরাট বিভাজনের যে
প্রাসাদ গড়ে উঠেছে তাকে রুখতে হবে। আর যদি আমরা তা রুখতে না পারি তবে বলবো এই সভ্য - জগতের মানুষের চেয়ে অনেক ভাল ছিল। প্রাগৈতিহাসিক আমলের গুহাবাসী মানুষ। কারণ আত্মরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া তারা কখনো হিংস্র হতো না। তখনকার মানুষের কাছে মনুষ্যত্ব ছিল অজ্ঞাত আর এখনকার মানুষের নিকট মনুষ্যত্ব জ্ঞাত হলেও আজ তা সম্পূর্ণ নির্বাসিত। কিন্তু এই নির্বাসিত মনুষ্যত্বকে ফিরিয়ে আনার জন্য শোষক ও শাসকের বিরুদ্ধে মানুষকে সচেতন করতে হবে। মানুষের বিবেককে লাগিয়ে তুলতে হবে একান্ত ভাবে। সবার মাঝে। গোটা জাতি তথা বিশ্বজুড়ে।
অথই নূরুল আমিন
কবি কলামিস্ট ও রাষ্ট্র বিজ্ঞানী।