জৈন্তাপুর (সিলেট) থেকে নিজস্ব প্রতিবেদক:
সিলেটের অন্যতম প্রধান ও জনগুরুত্বপূর্ণ তামাবিল স্থলবন্দর এখন অনিয়ম, দুর্নীতি আর রাজস্ব ফাঁকির অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। সীমান্তের এই বন্দরে কাস্টমস ও পোর্ট কর্মকর্তাদের একটি অসাধু অংশ, স্থানীয় প্রভাবশালী রাজনৈতিক চক্র এবং কতিপয় সিএন্ডএফ এজেন্টের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এক ‘অভেদ্য সিন্ডিকেট’। এই চক্রের কারসাজিতে প্রতিদিন সরকারের লাখ লাখ টাকা রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হচ্ছে, যা বছরে দাঁড়িয়েছে শত কোটি টাকায়।
অনুসন্ধানে উঠে আসা ‘রাজস্ব ফাঁকির ফর্মুলা’
সরেজমিনে দীর্ঘ অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৪ থেকে ৫টি সুনির্দিষ্ট সিএন্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটটি তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের দুর্নীতির মূল হাতিয়ার হলো ‘কারপাস (কার্গো পাস) জালিয়াতি’।
১. ওজনের ভয়াবহ কারচুপি:
নিরাপত্তা বেষ্টনী আর ডিজিটাল স্কেলের চোখ ফাঁকি দিয়ে ৫ টনের ছোট ট্রাকে বহন করা হচ্ছে ১৪ থেকে ১৫ টন পণ্য। একইভাবে ১২ টনের ট্রাকে অনায়াসে পার করা হচ্ছে ২০ থেকে ২২ টন। অর্থাৎ, প্রতি ট্রাকে প্রায় ৮ থেকে ১০ টন অতিরিক্ত পণ্য কোনো ঘোষণা ছাড়াই বন্দর ত্যাগ করছে।
২. নির্দিষ্ট রেটে ‘পারমিশন’:
অভিযোগ রয়েছে, এই অতিরিক্ত পণ্য কোনো বাধা ছাড়াই পার করে দিতে একটি ‘ট্যারিফ কার্ড’ বা ঘুষের তালিকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
* পোর্ট কর্তৃপক্ষ: প্রতি অতিরিক্ত চালানে গ্রহণ করছে ৩৬০ টাকা।
* কাস্টমস কর্তৃপক্ষ: প্রতি অতিরিক্ত চালানে নিচ্ছে ৮৫০ টাকা।
মাত্র ১,২১০ টাকার বিনিময়ে সরকারের হাজার হাজার টাকার রাজস্ব কর্মকর্তাদের পকেটে যাচ্ছে। এই লেনদেনের কোনো রশিদ দেওয়া হয় না, ফলে এটি সরাসরি কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত তহবিলে জমা হয়।
ব্যবসায়ীদের আর্তনাদ: ‘সিন্ডিকেটই এখানে আইন’
তামাবিল স্থলবন্দরের একাধিক প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, এই বন্দরে নিয়মের চেয়ে ‘অনিয়ম’ বেশি কার্যকর। তারা বলেন, “এখানে সৎভাবে ব্যবসা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। সিন্ডিকেটের সদস্যদের খুশি না করলে পণ্য ছাড় করাতে পদে পদে হয়রানির শিকার হতে হয়। অথচ যারা সিন্ডিকেটের অংশ, তারা ঘোষণাকৃত পণ্যের প্রায় দ্বিগুণ পণ্য নিয়ে অনায়াসে বন্দর পার হয়ে যাচ্ছে।”
ব্যবসায়ীরা আরও অভিযোগ করেন, এই সিন্ডিকেটের পেছনে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতার হাত রয়েছে, যারা পর্দার আড়াল থেকে কাস্টমস ও পোর্ট কর্মকর্তাদের অভয় দিয়ে থাকেন। বিনিময়ে রাজস্ব ফাঁকির সেই লভ্যাংশের একটি বড় অংশ তাদের পকেটে যায়।
মুখ খুলছেন না দায়িত্বশীলরা
দুর্নীতির এমন প্রকাশ্য মহোৎসবের বিষয়ে জানতে চাইলে তামাবিল পোর্ট কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান অত্যন্ত শীতল কণ্ঠে বলেন, “এ ধরনের কোনো বিষয় আমার জানা নেই।” দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য ও তথ্যপ্রমাণ নিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কৌশলে বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে ব্যস্ততা দেখান।
অন্যদিকে, তামাবিল কাস্টমস সুপার শ্রাবানা কিছুটা রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে বলেন, “আমাদের কাছে এখন পর্যন্ত এমন কোনো লিখিত অভিযোগ আসেনি। তবে যেহেতু বিষয়টি আপনারা তুলেছেন, আমরা অভ্যন্তরীণভাবে এটি যাচাই করে দেখব।”
উচ্চপর্যায়ের তদন্ত জরুরি
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজ এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের দাবি, তামাবিল স্থলবন্দরের এই রাজস্ব লুটপাট বন্ধ করতে হলে সরকারের দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং এনবিআর (NBR)-এর উচ্চপর্যায়ের একটি বিশেষ তদন্ত দল পাঠানো প্রয়োজন। সরেজমিনে ট্রাকে মালামাল ওজন করলেই এই জালিয়াতির আসল রূপ বেরিয়ে আসবে।
দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে কেবল রাজস্ব ফাঁকিই নয়, এই সিন্ডিকেটের দাপটে সাধারণ ও সৎ ব্যবসায়ীরা বন্দর ত্যাগ করতে বাধ্য হবেন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় অর্থনীতিতে।