সিলেট নিউজ ডেস্ক :
গণভবন লুট করা আর কায়সার হামিদের মতো কোন তারকা স্পোর্টস ম্যান গিয়ে গণভবন লুট করা একই বিষয় না।
কায়সার হামিদ কোন এলে বেলে মানুষ না। তিনি এই দেশের পতাকাবাহক ছিলেন। তার মা রানি হামিদ ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম নারী আন্তর্জাতিক মাস্টার (WIM) এবং পরবর্তীতে তিনি ফিদে (FIDE) থেকে উইমেন গ্র্যান্ডমাস্টার (WGM) খেতাব অর্জন করেন। যারা রানি হামিদকে চিনেন না তারা জাস্ট ধরে নিতে পারেন, তিনি হলেন দাবার জগতের লতা মঙ্গেশকর। যার নাম শুনলেই শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায়। তার ছেলে হিসেবে কায়সার হামিদ সস্ত্রীক গণভবন লুট করে উল্লাস করছে এই দৃশ্য অত্যন্ত লজ্জার এবং অপমানের। অনেকই হয়তো ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ বলে জাস্টিফাই করতে পারেন।
শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা এবং আন্দোলন শেষে বাসভবন লুট করা দুটো ভিন্ন বিষয়। প্রথমটি গণতান্ত্রিক অধিকার, পরেরটি ফৌজদারি অপরাধ।
কায়সার হামিদই শুধু না, এরকম বহু তারকা এই লুটপাটের অংশ হয়েছেন যার মধ্য দিয়ে এই লুটপাটের লেজিটেমেসি তৈরি হয়েছে এবং চব্বিশ কেন্দ্রিক এইসব লুটপাট একটি স্বাভাবিক ঘটনায় রূপান্তরিত হয়েছে। যার ফলে পরবর্তীতে আওয়ামিলীগারদের ঘরবাড়ি লুটপাট, অফিস লুটপাট, বিভিন্ন দোকান, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ইন্ডাস্ট্রি লুটপাট, সরকারি অফিস আদালত, থানা লুটপাট, বিদেশি হাইকমিশনের অফিস লুটপাট, হিন্দুদের বাড়িঘর লুটপাট, এগুলো মোটামুটি মামুলি ঘটনায় রুপান্তরিত হয়েছে।
যাই হোক, কারিনা কায়সারের আত্মার মাগফেরাত কামনা করছি। কিন্তু তার অকাল মৃত্যুও যেন আমাদের বুঝিয়ে দেয়, এক রাজনৈতিক বিদ্বেষের আগুন যখন জ্বলে, তখন তার উত্তাপে পুড়ে যায় দেশেরই সাধারণ মানুষ। মুক্তির পথ কেবল আইন, শান্তি ও ভারসাম্যপূর্ণ আন্তর্জাতিক সম্পর্কের মধ্য দিয়েই সম্ভব
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কারিনা কায়সারের মৃত্যু নিয়ে নানা ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। কেউ সমবেদনা জানিয়েছেন, আবার কেউ উল্লাস প্রকাশ করেছেন। তবে প্রশ্ন হচ্ছে—একজন মানুষের মৃত্যু কি কখনো আনন্দের বিষয় হতে পারে?
কারিনা কায়সার ছিলেন এমন একজন নারী, যিনি জীবনের শেষ সময় পর্যন্ত পরিবার ও কাছের মানুষদের অকৃত্রিম ভালোবাসা পেয়েছেন। জানা গেছে, তাকে বাঁচানোর জন্য তার ভাই নিজের লিভারের অংশ দান করতেও প্রস্তুত ছিলেন। একজন বোনের জন্য ভাইয়ের এমন আত্মত্যাগের মানসিকতা সত্যিই বিরল ও হৃদয়স্পর্শী।
শুধু তাই নয়, কারিনার বাবা-মাও মেয়ের চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা করেননি। কন্যাসন্তান বলে তাকে অবজ্ঞা না করে, বরং সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন তাকে সুস্থ করে তুলতে। এমনকি চিকিৎসার ব্যয় বহনের জন্য পরিবারের মূল্যবান জমিজমাও বিক্রি করতে হয়েছে বলে জানা যায়।
বন্ধুদের কাছ থেকেও তিনি পেয়েছেন নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও সহযোগিতা। কঠিন অসুস্থতার সময় তার বন্ধুরা পাশে দাঁড়িয়েছেন, চিকিৎসার জন্য সাহায্য করেছেন এবং মানসিকভাবে সাহস যুগিয়েছেন।
এ ঘটনায় সমাজের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে এসেছে—আমরা কি সত্যিই মানবিকতা হারিয়ে ফেলছি? একজন মানুষের মৃত্যুতে উল্লাস প্রকাশ করা কতটা সভ্যতার পরিচয় বহন করে?
মৃত্যু অবধারিত সত্য। আজ কারিনা, কাল হয়তো অন্য কেউ। জীবন কারও জন্য থেমে থাকে না। কিন্তু অসুস্থতা বা বিপদের সময় একজন মানুষ কতটা সৌভাগ্যবান, তা বোঝা যায় তার পাশে কারা দাঁড়ায়, কে তাকে বাঁচানোর জন্য নিজের সবকিছু ত্যাগ করতে প্রস্তুত থাকে।
অনেকেই হয়তো কারিনাকে নিয়ে সমালোচনা করেছেন, কিন্তু তার জীবনের একটি বড় সত্য হলো—তিনি এমন একটি পরিবার পেয়েছিলেন, যারা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাকে ভালোবেসে আগলে রেখেছে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহমর্মিতা ও মানবিকতার চর্চা কমে যাচ্ছে। কারও ব্যক্তিগত জীবন, ভুল বা বিতর্ককে কেন্দ্র করে মৃত্যুর পরও বিদ্বেষ ছড়ানো একটি অমানবিক প্রবণতা।
তাই সকলের প্রতি আহ্বান—কাউকে অপছন্দ করা যেতে পারে, মতের অমিল থাকতে পারে, কিন্তু একজন মৃত মানুষকে নিয়ে বিদ্বেষ নয়, বরং মানবিকতা ও সহমর্মিতার পরিচয় দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের দায়িত্ব।