সত্যজিৎ দাস:
গায়ক,সুরকার,শিল্পী ও অভিনেতা রাহুল আনন্দ দীর্ঘ দুই বছর ধরে বয়ে বেড়ানো ব্যক্তিগত বেদনা, সহিংসতার স্মৃতি,শিল্প-ঐতিহ্যের অপূরণীয় ক্ষতি এবং দেশের প্রতি অটুট ভালোবাসার কথা তুলে ধরে একটি দীর্ঘ আবেগঘন ফেসবুক পোস্ট প্রকাশ করেছেন। বুধবার (৫ আগস্ট) দেওয়া ওই পোস্টে তিনি অতীতের স্মৃতি,বর্তমানের বাস্তবতা এবং ভবিষ্যতের শান্তির আকাঙ্ক্ষার কথা অকপটে প্রকাশ করেন।
পোস্টের শুরুতেই রাহুল আনন্দ বলেন, ছোটবেলা থেকে তিনি শুনে এসেছেন,"পেছনে না তাকিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে হয়।" কিন্তু জীবনের কঠিন বাস্তবতা তাকে শিখিয়েছে,সামনে এগোতে হলে বারবার পেছনে ফিরে তাকাতে হয়। কারণ অতীতই মানুষকে মনে করিয়ে দেয় সে কোথা থেকে এসেছে, কারা তাকে পথ দেখিয়েছে এবং কত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বর্তমান অবস্থানে পৌঁছেছে।
তবে তিনি জানান,গত দুই বছর ধরে অতীতে ফিরে তাকাতে ভয় পান। কারণ সেই স্মৃতিতে ভেসে ওঠে সহিংসতা,ধ্বংস,আতঙ্ক এবং এমন সব দৃশ্য,যা তিনি আগে কখনো কল্পনাও করেননি। তার ভাষায়, তিনি কখনো কোনো রাজনৈতিক বলয়ের মানুষ ছিলেন না। শিল্পচর্চা,গান এবং মানুষের প্রতি ভালোবাসাই ছিল তার একমাত্র পরিচয়। কোনো ক্ষমতাকেন্দ্রিক সুবিধা গ্রহণ করেননি বলেও দাবি করেন তিনি।
পোস্টে রাহুল আনন্দ উল্লেখ করেন,সেই সময় তার সন্তানও সহিংসতার শিকার হয়েছিল। আহত সন্তানকে খালি পায়ে,খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে নিজের কাঁধে ভর দিয়ে হাঁটতে দেখে তিনি নিজেকে যেন জীবন্ত মৃত মানুষ বলে অনুভব করেছিলেন। তার মতে, মৃত্যু শুধু শরীরের নয়, আত্মারও হয়। সেই ঘটনার পর থেকে অসংখ্য অপবাদ,তকমা এবং ভিত্তিহীন অভিযোগের মুখোমুখি হতে হয়েছে তাকে। অথচ এসব অভিযোগের পক্ষে কারও কাছে কোনো প্রমাণ নেই বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও জানান,সে সময় শ্বাসনালীর প্রদাহের কারণে তার কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে গিয়েছিল। এখন তিনি মনে করেন,সেটিই হয়তো তার জন্য ভালো হয়েছিল। কারণ সে সময় কথা বললে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠতে পারত। এরপর আরেকটি সংকটের মধ্যেও পড়তে হয়েছে তাকে। তবুও তিনি দেশি বা বিদেশি কারও কাছে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেননি। তার বিশ্বাস,নিজের অনুভূতি প্রকাশের সবচেয়ে শক্তিশালী মাধ্যম শিল্প। তাই ফেসবুককে বিচার বা আত্মপক্ষ সমর্থনের জায়গা হিসেবে নয়, কেবল যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবেই দেখেন তিনি।
রাহুল আনন্দ বলেন,তিনি কোনো রাজনৈতিক ভবনে যাননি। বরং বাংলার কৃষকের উঠান, বাউলের আখড়া,নদী,মাঠ,গ্রাম আর প্রকৃতির মধ্যেই নিজের জীবন ও শিল্পকে খুঁজে পেয়েছেন। বাংলার সাধারণ মানুষের দেওয়া ভালোবাসা, আদর এবং আতিথেয়তাকেই তিনি জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হিসেবে দেখেন। তার স্বপ্ন ছিল বাংলায় গান গাওয়া,বাংলার ভাষায় কথা বলা এবং বাংলার মানুষকে ভালোবাসা।
পোস্টে তিনি ৫ আগস্টের ঘটনাবলীর প্রসঙ্গ টেনে বলেন,আন্দোলনের সময় বৈষম্যহীন সমাজের যে স্লোগান দেওয়া হয়েছিল,পরবর্তীতে সেই সময়ই বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক বাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং মুক্তিযুদ্ধের নানা স্মৃতিচিহ্ন ধ্বংস করা হয়। সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়া দেয় বলে উল্লেখ করেন তিনি।
একই সঙ্গে তিনি নিজের ব্যক্তিগত ক্ষতির কথাও তুলে ধরেন। তার সংগ্রহে থাকা বহু দুষ্প্রাপ্য বাদ্যযন্ত্র আগুনে পুড়ে যায়। এর মধ্যে ছিল লোকসংগীতের অমূল্য সম্পদ,শাহ আব্দুল করিম,উকিল মুন্সী ও অবিনাশ শীলের ব্যবহৃত দোতারা,শিক্ষক আইয়ুব বাচ্চুর উপহার দেওয়া Korg Karma কিবোর্ড এবং প্রয়াত শিল্পী বারী সিদ্দিকীর নিজের হাতে তৈরি বাঁশিসহ অসংখ্য ঐতিহাসিক বাদ্যযন্ত্র। এগুলোকে তিনি শুধু নিজের সংগ্রহ নয়,বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং আগামী প্রজন্মের সম্পদ হিসেবে দেখতেন।
তবে এত বড় ক্ষতির পরও তিনি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ করেননি,বিচার চাননি কিংবা ক্ষতিপূরণও দাবি করেননি। তার ভাষায়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে সামলে নিতে অনেক সময় লেগেছে। আজও সেই ক্ষতের যন্ত্রণা রয়ে গেছে। কিন্তু ব্যক্তিগত কষ্টের চেয়ে দেশের শান্তিকেই তিনি বড় করে দেখেন।
তিনি স্মরণ করেন,২০২৪ সালের ৭ আগস্ট এক গীতিকবি বড় ভাইকে পাঠানো বার্তায় লিখেছিলেন, "তবু শান্তি আসুক আমার সোনার দেশে,যেকোনো মূল্যে। সে মূল্য যদি হয় আমার সোনার সংসারের পোড়া ছাই কিংবা আমার বাদ্যযন্ত্রের বিনিময়ে, তবুও আমার দুঃখ নেই।" সেই অবস্থান আজও অপরিবর্তিত রয়েছে বলেও জানান তিনি।
রাহুল আনন্দ আরও বলেন,গত দুই বছর তিনি নতুন করে সংসার গড়েননি। ভবঘুরের মতো জীবন কাটাচ্ছেন। নিজের বিভিন্ন গানের পংক্তির মধ্যেই তিনি আজ নিজের জীবনের প্রতিচ্ছবি দেখতে পান। তার মতে,শিল্প অনেক সময় শিল্পীর ভবিষ্যৎ জীবনের কথাও যেন আগে থেকেই বলে দেয়।
পোস্টের শেষাংশে তিনি বলেন,ভয় পেলেও মানুষকে অতীতে ফিরে তাকাতে হয়। কারণ তাতে নিজের শিকড়,কৃতজ্ঞতা,আশ্রয়দাতা মানুষ এবং সংগ্রামের ইতিহাস মনে থাকে। এগুলো ভুলে গেলে মানুষ নিজের অস্তিত্বই হারিয়ে ফেলে। তাই দুঃখের মধ্যেও তিনি ভালোবাসা,কৃতজ্ঞতা এবং শান্তির স্বপ্ন আঁকড়ে রাখতে চান।
সবশেষে তিনি সবার জন্য শুভকামনা জানিয়ে লেখেন,"সব ভালো হোক। পৃথিবী সুন্দর হোক। এই পাগলের ভালোবাসাটুকু নিও।"
সিলেট নিউজ২৪/এসডি.