বিশেষ প্রতিনিধি:
ভোলার লালমোহন উপজেলায় প্রবাসী মায়ের ২২ ভরি স্বর্ণালংকার ও নগদ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ৯ জনের বিরুদ্ধে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে। একই সঙ্গে উপজেলার বিরোধীয় জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা ও শান্তিভঙ্গ পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে ১৪৪/১৪৫ ধারায় অপর এক পক্ষের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন আদালত।
প্রবাসীর মায়ের মালামাল আত্মসাতের ঘটনায় লালমোহন থানার সাব-ইন্সপেক্টর (নিঃ) মোফিজুল হক আদালতে এই তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ৯ জন আসামির বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৪০৬, ৪২০ ও ৫০৬ ধারায় অপরাধের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে নিশ্চিত করা হয়েছে।
অভিযুক্ত আসামিরা মোঃ কামাল, পিতা- মোঃ কাঞ্চন শাহাঁ আলী, মোসাঃ ময়না বিবি স্বামী- মোঃ কাঞ্চন শাহাঁ আলী (বাদীর নানী), মোঃ জুয়েল, পিতা- কাঞ্চন শাহাঁ আলী, মোঃ রুবেল, পিতা- মোঃ কাঞ্চন শাহাঁ আলী, মোঃ রাজিব , পিতা- কাঞ্চন শাহাঁ আলী (সর্বসাং- কালমা ৩নং ওয়ার্ড, কালমা ইউপি, থানা- লালমোহন, জেলা- ভোলা), মোঃ শাহাদাত হোসেন (৪৮), পিতা- মৃত মোবারক উল্যাহ, সাং- চাটখিল, নোয়াখালী (এ/পি সাং- কালমা, লালমোহন, ভোলা), মোঃ নবী ওরফে নুরনবী , পিতা- মোঃ করিম ব্যাপারী, মোঃ আব্দুল আলী মন্তরী , পিতা- মমতাজ মাল (উভয় সাং- পশ্চিম চর উড়া, লালমোহন, ভোলা), মোসাঃ তাছলিমা বেগম , স্বামী- মোঃ বাদল, সাং- কালমা, লালমোহন, ভোলা।
মামলার বিবরণে জানা যায়, বাদী মোঃ দিদারুল ইসলাম নয়নের মাতা সালমা বেগম কর্মসংস্থানের তাগিদে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবে প্রবাস জীবন কাটাচ্ছিলেন। প্রবাসে যাওয়ার পর থেকে তিনি তার মায়ের বাড়ি লালমোহনের কালমা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের অভিযুক্ত নানী ও মামাদের বসতঘরের স্টিলের আলমারিতে বিভিন্ন সময়ে মোট ২২ ভরি স্বর্ণালংকার, নতুন মোবাইল, কম্বল, শাড়িসহ দামি মালামাল রেখে আসতেন। গত ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে বাদীর মা সালমা বেগম সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে আসেন। পরবর্তীতে গত ৫ ডিসেম্বর ২০২৪ তারিখে অভিযুক্ত রুবেল ও জুয়েল নগদ ১০ লাখ টাকা ধার নেন এবং ৩ মাসের মধ্যে তা পরিশোধের প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে বাদীর মাতা সালমা বেগম অসুস্থ হয়ে পড়ায় চিকিৎসার প্রয়োজনে টাকা ও স্বর্ণালংকার ফেরত চাওয়া হয়। গত ২১ ফেব্রুয়ারি ২০২৫ তারিখে বাদী ও তার মাতা আসামিদের নিকট আলমারির চাবি চাইলে তারা আলমারি খুলে দেখতে পান সেখানে কোনো স্বর্ণালংকার বা মালামাল নেই। এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আসামিরা তালবাহানা শুরু করেন এবং ১০ লাখ টাকা ও ৫৪ লাখ ১৫ হাজার টাকার সমপরিমাণ স্বর্ণালংকারসহ মালামাল ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। পাশাপাশি এ বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নিলে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। পুলিশের দীর্ঘ তদন্ত, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও পারিপার্শ্বিক বিষয় পর্যালোচনায় দেখা যায়, আসামিরা পরস্পর যোগসাজসে বাদীর মাতার নগদ টাকা ও স্বর্ণালংকারসহ সর্বমোট ৫৪ লাখ ১৫ হাজার টাকার মালামাল প্রতারণামূলকভাবে বিশ্বাসভঙ্গ করে আত্মসাৎ করেছেন। এই ঘটনায় আনিত অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের বিরুদ্ধে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করেন। এ বিষয়ে মামলার বাদী দিদারুল ইসলাম নয়ন অত্যন্ত মর্মাহত হয়ে তার মা সালমার মর্মান্তিক মৃত্যুর পেছনের চাঞ্চল্যকর তথ্য তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করে বলেন সম্পত্তি ও টাকার লোভে আমার নানীসহ মামারা আমার বোন ফারজানার বাড়ি থেকে মাকে গ্রামে কবিরাজি চিকিৎসা করিয়ে ভালো করবে—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়ে নিয়ে এসে জোরপূর্বক জায়গা দলিল করিয়ে নিয়েছে বলে নাটক সাজায়। অথচ আমার মা তখন সম্পূর্ণ জ্ঞানহীন অবস্থায় ছিলেন, তার পক্ষে দলিল দেওয়ার মতো কোনো মানসিক বা শারীরিক অবস্থাই ছিল না। যখন মা মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছেন, তখন মামারা হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার মাকে মৃত ঘোষণা করেন।" তিনি আরও বলেন, টাকার লোভে মামারা-নানী মিলে এভাবে আমার মাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেবে, তা আমরা ভাবতেও পারিনি। যদি বুঝতে পারতাম, তবে আমরা মাকে গ্রামে নিতে দিতাম না। তারা শুধু আমার মাকেই হারায়নি, বরং স্বর্ণ ও টাকা আত্মসাৎ করে তা গোপন রাখার জন্য আমাদেরকে বিভিন্ন মিথ্যা মামলা ও প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে থামিয়ে রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সেই ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়েছে এবং প্রকৃত ঘটনা পুলিশের তদন্তে স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এরপরও তারা আমাদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে এখনো হত্যার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।" ১৪৪/১৪৫ ধারায় নোটিশ ও আদালতের পরবর্তী নির্দেশনা এদিকে, পৃথক আরেকটি ঘটনায় ভোলার লালমোহনে বিরোধীয় জমিতে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা এবং শান্তিভঙ্গ পরিস্থিতি সৃষ্টির অভিযোগে ১৪৪/১৪৫ ধারার বিধান মোতাবেক ২য় পক্ষের বিরুদ্ধে কারণ দর্শানোর নোটিশ জারি করেছেন আদালত। গত ২১ জুলাই ২০২৫ তারিখে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আবদুল্লাহ আল মামুন এই আদেশ দেন। আদালত সূত্রে জানা যায়, মো. দিদারুল ইসলাম নয়ন বাদী হয়ে মো. রুবেলকে বিবাদী করে আদালতে একটি নালিশী আবেদন দাখিল করেন। আবেদনে অভিযোগ করা হয়, বিবাদী বিরোধীয় সম্পত্তিতে জোরপূর্বক প্রবেশের চেষ্টা চালিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ও শান্তিভঙ্গ পরিস্থিতি তৈরির পাঁয়তারা করছেন।
বাদী পক্ষের আইনজীবীর বক্তব্য ও নালিশী আবেদন পর্যালোচনা করে আদালত ফৌজদারি কার্যবিধির ১৪৪/১৪৫ ধারায় অভিযোগ আমলে নেন। একই সঙ্গে বিরোধীয় জমিতে কেন ২য় পক্ষকে প্রবেশে বারণ করা হবে না, সে মর্মে আদালতে হাজির হয়ে কারণ দর্শানোর জন্য নোটিশ জারির নির্দেশ দেওয়া হয়। এছাড়া, মামলার কারণ উদ্ভব হওয়ার সময় জমিতে প্রকৃত পক্ষে কে বা কারা দখলে ছিলেন বা আছেন, সে বিষয়ে সুস্পষ্ট প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য সহকারী কমিশনার (ভূমি), লালমোহনকে নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি, এলাকার সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক ও শান্ত রাখতে লালমোহন থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি)কে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছে আদালত। মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন আগামী ৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ নির্ধারণ করা হয়েছে।