বিশেষ প্রতিনিধি:
দেশের সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন,প্রশাসনিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং জনসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করতে ৬৯ কর্মকর্তাকে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব দিয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা নিয়মিত হাসপাতাল পরিদর্শনের পাশাপাশি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ডিজিটাল হাজিরা,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা,জনবল,চিকিৎসা সরঞ্জাম, অবকাঠামো,নিরাপত্তা ও সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করবেন।
গত ১৬ আগস্ট স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের প্রশাসন-১ শাখা থেকে এ সংক্রান্ত অফিস আদেশ জারি করা হয়। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব খন্দকার রবিউল ইসলাম স্বাক্ষরিত ওই আদেশের স্মারক নম্বর: ৪৫.০০.০০০০.১৪০.০৬.০০১৫.২৬-৩৬৭৯।
মন্ত্রণালয়ের আদেশে বলা হয়েছে,সরকারি স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত পরিদর্শন ও মনিটরিংয়ের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, প্রশাসনিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং জনসেবার গুণগত মান নিশ্চিত করাই এ উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য। অতিরিক্ত সচিব,যুগ্মসচিব,উপসচিব ও সিনিয়র সহকারী সচিব পর্যায়ের কর্মকর্তাদের বিভিন্ন জেলা, হাসপাতাল ও বিশেষায়িত চিকিৎসাকেন্দ্রের তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগে সিলেট বিভাগকেও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আদেশ অনুযায়ী যুগ্মসচিব মো. হেলাল উদ্দিনকে সিলেট বিভাগের সার্বিক তদারকি ও বিভাগীয় হাসপাতালগুলোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া সুনামগঞ্জ জেলার হাসপাতালগুলোর তদারকির দায়িত্ব পেয়েছেন উপসচিব স্বপন কুমার মণ্ডল। সিলেট জেলার হাসপাতালগুলোর জন্য দায়িত্ব পেয়েছেন সিনিয়র সহকারী সচিব মো. বিপুল ওয়ারেছ আনসারী। অন্যদিকে সিনিয়র সহকারী সচিব মিজ তামান্না তাসনীমকে সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাসপাতালগুলোর তদারকির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
ফলে মৌলভীবাজার জেলার সরকারি হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যক্রমও এখন মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এ তদারকি ব্যবস্থার আওতায় এসেছে।
অফিস আদেশে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তাঁর আওতাধীন জেলা,উপজেলা ও হাসপাতালের জনবল পরিস্থিতি,পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা,চিকিৎসা সরঞ্জাম,অবকাঠামো, নিরাপত্তা ও সার্বিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা করবেন। হাসপাতাল প্রধানের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও তারা ভূমিকা রাখবেন।
হাসপাতালে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে ডিজিটাল হাজিরা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রতিবেদনও জমা দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্য কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও তদারককারী কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন,উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে টিকাদান কর্মসূচি,অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধ ও জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে হবে।
একই সঙ্গে মাতৃ ও শিশুমৃত্যু কমানো,প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা,পুষ্টি কার্যক্রম এবং অন্যান্য জনস্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমেও প্রয়োজনীয় সহায়তা ও সমন্বয় করতে হবে।
স্বাস্থ্যসেবার মান বাড়াতে কার্যকর ও উদ্ভাবনী উদ্যোগ গ্রহণে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে উৎসাহিত করার দায়িত্বও দেওয়া হয়েছে পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাদের।
অফিস আদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা হলো,প্রত্যেক পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তত একটি পরিদর্শন সম্পন্ন করতে হবে। পরিদর্শনে পাওয়া সমস্যা,পর্যবেক্ষণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য সুপারিশ উল্লেখ করে পরবর্তী মাসের ৭ তারিখের মধ্যে সংশ্লিষ্ট শাখায় প্রতিবেদন জমা দিতে হবে।
অর্থাৎ শুধু কাগজে-কলমে দায়িত্ব পালন নয়, মাঠপর্যায়ে নিয়মিত উপস্থিত থেকে স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের বাস্তব চিত্র পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মৌলভীবাজার ও সুনামগঞ্জ জেলার দায়িত্ব পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে সিনিয়র সহকারী সচিব মিজ তামান্না তাসনীমের মাঠ প্রশাসনে কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তিনি ৩৫তম বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। সচিবালয়ে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের সরকারি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা-২ শাখায় যোগদানের আগে তিনি মাঠ প্রশাসনে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
সর্বশেষ তিনি গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে মাঠ প্রশাসনের দায়িত্ব শেষ করে স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে যোগ দেন তিনি। সরকারি প্রশাসনে মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতার কারণে হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা ও জনসেবা কার্যক্রমের বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে তাঁর দায়িত্বকে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে সিলেট বিভাগের সার্বিক তদারকির দায়িত্ব পাওয়া যুগ্মসচিব মো. হেলাল উদ্দিনও প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। স্বাস্থ্য সেবা বিভাগে যোগদানের আগে তিনি ভূমি সংস্কার বোর্ডের উপ ভূমি সংস্কার কমিশনার এবং অর্থ বিভাগে উপসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০২৫ সালের মার্চে তিনি যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পান। কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ২০২২-২৩ অর্থবছরে শুদ্ধাচার পুরস্কারও পেয়েছেন।
মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্তের ফলে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক-স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি,সেবার পরিবেশ,প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম, পরিচ্ছন্নতা,অবকাঠামো ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের ওপর নিয়মিত নজরদারি বাড়বে।
বিশেষ করে সিলেট বিভাগের সিলেট,সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার জেলার হাসপাতালগুলোর ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শন এবং মাসিক প্রতিবেদন ব্যবস্থার মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যা মন্ত্রণালয়ের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। এর ফলে হাসপাতালগুলোর দীর্ঘদিনের জনবল সংকট,চিকিৎসা সরঞ্জামের ঘাটতি, অবকাঠামোগত সমস্যা কিংবা সেবার মানসংক্রান্ত কোনো দুর্বলতা দ্রুত চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের এ উদ্যোগের আওতায় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক,বিভাগীয় পরিচালক, জেলা সিভিল সার্জন,উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অফিস আদেশের অনুলিপি পাঠানো হয়েছে।
সিলেট নিউজ২৪/এসডি.