বিশেষ প্রতিনিধি:
নিরাপদ মাতৃত্ব ও মা-শিশুর স্বাস্থ্যসেবা বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলের জাগছড়া চা বাগানে অনুষ্ঠিত হয়েছে ব্যতিক্রমী ‘মা সমাবেশ’। প্রান্তিক চা বাগান এলাকার গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে আয়োজিত এ সমাবেশে ১৬৭ জন মা অংশ নেন।
‘সুস্থ মা,সুস্থ শিশু,সুন্দর ভবিষ্যৎ’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গলবার (০১ সেপ্টেম্বর) সকালে উপজেলার ৮ নম্বর কালিঘাট ইউনিয়নের জাগছড়া চা বাগানের মিশন টিলায় এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উদ্যোগে এবং কম্প্যাশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত সমাবেশটি মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য সচেতনতা কার্যক্রমে একটি উল্লেখযোগ্য আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
সকাল ১০টায় শুরু হওয়া সমাবেশে অংশ নেওয়া মায়েদের মধ্যে ৬৩ জন গর্ভবতী এবং ১০৪ জন প্রসূতি মা ছিলেন। তাঁদের গর্ভকালীন নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা,সুষম পুষ্টি,প্রসবকালীন ঝুঁকি মোকাবিলা,নিরাপদ ও স্বাভাবিক প্রসব, নবজাতকের পরিচর্যা এবং সরকারি স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের বিষয়ে বিস্তারিত পরামর্শ দেওয়া হয়।
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সিনথিয়া তাসমিনের দিকনির্দেশনায় এবং স্বাস্থ্য সহকারী বাঁধন আচার্য্যের তত্ত্বাবধানে অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডা. সিনথিয়া তাসমিন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি বলেন,মা ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও চা বাগান এলাকার মায়েদের কুসংস্কার ও ভুল ধারণায় বিভ্রান্ত না হয়ে স্বাস্থ্যকর্মী এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুসরণ করতে হবে।
তিনি বলেন,নিরাপদ প্রসব নিশ্চিত করতে প্রাতিষ্ঠানিক প্রসবের কোনো বিকল্প নেই। চিকিৎসাসেবা নিতে দালালের মাধ্যমে বিভ্রান্ত না হয়ে সরাসরি সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
সমাবেশে শিশুদের নিয়মিত টিকাদান,হাম প্রতিরোধ,জরায়ুমুখের ক্যান্সার প্রতিরোধে এইচপিভি টিকা,নারীদের ভিআইএ পরীক্ষা, পরিবার পরিকল্পনা,পুষ্টি এবং প্রসূতি ও নবজাতকের স্বাস্থ্যসেবা বিষয়েও আলোচনা করা হয়।
জাগছড়া চা বাগানের গর্ভবতী মা পূজা কালিন্দী বলেন,চা বাগান এলাকায় অনেক সময় গর্ভাবস্থায় কীভাবে নিজের যত্ন নিতে হবে,সে বিষয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। মা সমাবেশে এসে গর্ভকালীন পরীক্ষা,খাবার ও নিরাপদ প্রসব সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পেরেছেন তিনি। এ ধরনের আয়োজন আরও বেশি হলে চা বাগানের মায়েরা উপকৃত হবেন বলে জানান তিনি।
আরেক অংশগ্রহণকারী মা ইয়াছমিন আক্তার বলেন,মা ও শিশুর স্বাস্থ্য নিয়ে অনেকের মধ্যেই সচেতনতার অভাব রয়েছে। স্বাস্থ্যকর্মীদের কাছ থেকে সরাসরি পরামর্শ পাওয়ায় গর্ভাবস্থা ও প্রসব-পরবর্তী সময়ে কী কী বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে,তা সহজভাবে জানতে পেরেছেন তিনি। এ বিষয়ে পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন হওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, গর্ভাবস্থার শুরু থেকেই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখলে সম্ভাব্য জটিলতা আগেভাগেই শনাক্ত করা সম্ভব। এতে মা ও শিশু উভয়ের ঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা যায়।
সিনিয়র স্টাফ নার্স হাছিনা আক্তার বলেন, গর্ভকাল থেকে প্রসব-পরবর্তী সময় পর্যন্ত মায়ের যথাযথ পরিচর্যা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি জন্মের পর নবজাতককে সময়মতো বুকের দুধ খাওয়ানো,প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করা এবং নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণে পরিবারের সদস্যদেরও সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে।
কম্প্যাশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রকল্প প্রতিনিধি (প্রকল্প) রিবিকা মহাপাত্র বলেন,চা বাগান ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মা ও শিশুদের স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধিতে এ ধরনের উদ্যোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে ভবিষ্যতেও এ ধরনের কার্যক্রমে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
স্বাস্থ্য সহকারী বাঁধন আচার্য্য বলেন,চা জনগোষ্ঠীর মধ্যে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা আরও বাড়ানো প্রয়োজন। এ লক্ষ্যেই বিভিন্ন চা বাগানের গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের নিয়ে এ ধরনের আয়োজন করা হচ্ছে।
সিলেট বিভাগের স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুল আলম বলেন,নিরাপদ মাতৃত্ব ও শিশুর সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চা বাগানসহ দুর্গম ও পিছিয়ে থাকা এলাকার মানুষ যাতে সহজে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পান,সে লক্ষ্যে মাঠপর্যায়ে স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম আরও জোরদার করা হচ্ছে। মা ও শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় সচেতনতার পাশাপাশি সময়মতো স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়ে প্রয়োজনীয় সেবা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
সমাবেশে অংশ নেওয়া মায়েরা তাঁদের বিভিন্ন স্বাস্থ্য সমস্যা ও উদ্বেগের কথা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সামনে তুলে ধরেন। পরে তাঁদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও দিকনির্দেশনা দেওয়া হয়।
অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্য পরিদর্শক মো. মাহবুবুর রহমান, স্যানিটারি ইন্সপেক্টর বিনয় সিং রাউতিয়া, সিনিয়র স্টাফ নার্স হাছিনা আক্তার,সিএইচসিপি রাজিব সিং,স্বাস্থ্য সহকারী দুলন চন্দ্র দেব, পরিবার কল্যাণ সহকারী শিমুল কর্মকার, কম্প্যাশন ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের প্রতিনিধি (প্রকল্প) রিবিকা মহাপাত্র,সাংবাদিক সত্যজিৎ দাস,সংবাদকর্মী ছায়েদ আলী প্রচারকসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
আয়োজকরা জানান,চা বাগানসহ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া এবং নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ নিয়মিতভাবে এ ধরনের সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
সিলেট নিউজ২৪/এসডি.