জামরুল ইসলাম রেজা,
ছাতক (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
শিল্পনগরী ছাতক থেকে চুনাপাথর, সিমেন্ট, বালু ও পাথরসহ বিভিন্ন পণ্য পরিবহন এবং সুনামগঞ্জের মানুষের দেশজুড়ে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম ছিল সিলেট-ছাতক রেলপথ। তবে ২০২২ সালের ভয়াবহ বন্যায় রেলপথটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর টানা চার বছর ধরে বন্ধ রয়েছে ট্রেন চলাচল। দীর্ঘদিনের অচলাবস্থায় এরই মধ্যে চুরি হয়ে গেছে রেললাইনের মূল্যবান লোহার পাত ও স্লিপার।
দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর ২১৭ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে ঐতিহ্যবাহী এই রেলপথ পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও নির্ধারিত সময়সীমা শেষে কাজের অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ শতাংশ। ফলে কবে নাগাদ এই রুটে আবার ট্রেন চলাচল শুরু হবে, তা নিয়ে তীব্র অনিশ্চয়তা ও হতাশা দেখা দিয়েছে স্থানীয়দের মনে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত সিলেট থেকে ছাতক বাজার অংশের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার মিটারগেজ রেলপথ পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়। জিওবি ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে মোট ২১৭ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় অনুমোদন পায়। পরবর্তীতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মীর আখতার হোসেন লিমিটেড’-এর সঙ্গে প্রায় ১৯৯ কোটি টাকায় চুক্তি করে রেলওয়ে। প্রকল্পের নির্ধারিত মেয়াদ ছিল ২৩ আগস্ট পর্যন্ত।
সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী জানান, প্রকল্পের আওতায় পুরোনো রেলপথ অপসারণ, মাটি ভরাট, কালভার্ট ও সেতু মেরামত, নতুন স্লিপার স্থাপন এবং নতুন রেললাইন বসানোর কথা রয়েছে। ইতিমধ্যে ৩৪ কিলোমিটার পুরোনো রেললাইন অপসারণ করা হয়েছে এবং ৯৬টি পাইলিং পয়েন্টের মধ্যে ৮৫টির কাজ শেষ হয়েছে। তবে মূল ট্র্যাক স্থাপনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক কাজ এখনো বাকি রয়ে গেছে।
বাস্তবচিত্রে দেখা গেছে, ছাতক উপজেলার গোবিন্দগঞ্জ, হাসনাবাদ, কালারুকা, মাধবপুর ও সিলেটের বিশ্বনাথের খাজাঞ্চিসহ বিভিন্ন এলাকায় সংস্কারকাজ মারাত্মক ধীরগতিতে চলছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন্যার পর রেলপথের উচ্চতা নির্ধারণ ও সড়ক পুনর্নির্মাণের পর সমন্বয়হীনতার কারণে শুরুতেই কাজ পিছিয়ে যায়।
ইসলামপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট সুফি আলম সোহেল জানান, রেলপথ বন্ধ থাকায় ছাতকের পণ্য পরিবহনে সময় ও খরচ দুটোই বহুগুণ বেড়ে গেছে। সংস্কারকাজ শুরু হওয়ায় আশা জাগলেও বর্তমানে মাটি ভরাট ছাড়া দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই। জাউয়া বাজারের ব্যবসায়ী হেলাল উদ্দিনের মতে, দীর্ঘদিন কাজ স্থবির হয়ে থাকলেও এর কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা সাধারণ মানুষ পাচ্ছে না।
কাজের বিলম্ব নিয়ে প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা সিলেট রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী মাসুদ পারভেজ জানান, প্রায় ২৫ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মেয়াদ শেষ হওয়ায় এখন সময় বৃদ্ধি ও পরবর্তী বাস্তবায়ন বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।
অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আখতার হোসেন লিমিটেডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আবুল কালাম আজাদ বলেন, সুনামগঞ্জ অঞ্চলের বৈরী আবহাওয়া ও পরপর দুটি বর্ষাকালের কারণে মাটির কাজ নির্ধারিত সময়ে করা সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া অতীতে রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে প্রয়োজনীয় মালামাল আমদানি ব্যাহত হয়েছিল। সম্প্রতি ২৯ কোটি টাকা বরাদ্দ পাওয়ায় মালামাল আনার প্রক্রিয়া চলছে এবং কাজ শেষ করতে আরও এক বছর সময় বাড়ানোর আবেদন করা হয়েছে।
নির্ধারিত সময় পার হয়ে গেলেও প্রকল্পের তিন-চতুর্থাংশ কাজ বাকি থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে। এখন দেখার বিষয়, অতিরিক্ত সময় অনুমোদনের পর কত দ্রুত আবার এই ঐতিহ্যবাহী রেলে ট্রেনের সিগন্যাল পড়ে।