অথই নূরুল আমিন:
কোন এক গ্রামে ধনু মাঝি নামে একজন মাঝি ছিলেন, তার পরিবারে স্ত্রী আর এক কন্যা সন্তান ছিলেন । কন্যা সন্তানটিকে বিয়ে দিয়েছিলেন। অনেক দূরের অন্য এক গ্রামে। কোন এক বর্ষায় ধনু মাঝির কন্যা ও তার বর বেড়াতে আসেন, ধনু মাঝির বাড়িতে। কথা থাকে যে, ধনু মাঝি প্রায়সময় রাতের বেলায় মাছ শিকারে যেতেন, তো আজকে ও যখন মাছ শিকারে যাবার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তখন তার মেয়ের জামাই, অর্থাৎ ধীরেন মাঝি বলছেন । বাবা, আমি ও আপনার সাথে আজকে মাছ শিকারে যাব। তখন দুজনই একসঙ্গে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে ঘর থেকে বেড়িয়ে, নৌকা নিয়ে তারা কোন এক বড়ো হাওরে চলে আসেন।
ঐ দিন গভীর রাতে হঠাৎ কঠিন ঝড় শুরু হয়। ঝড়ের গতি খুব বেশি খারাপ দেখে, ধনু মাঝির স্ত্রী, তড়িঘড়ি ঠাকুর ঘরে এসে, বিভিন্ন মন্ত্র পাঠ করছেন, আর বারবার বলছেন। ভগবান তুমি আমার স্বামীকে রক্ষা করো। আমার স্বামীকে রক্ষা করো। ঠিক তখনই ধনু মাঝির কন্যাও ঠাকুর ঘরে এসে, ভগবানের কাছে প্রার্থনা করছেন, আর বারবার বারবার বলছেন, হে ভগবান তুমি আমার স্বামীকে রক্ষা করো। ভগবান তুমি আমার স্বামীকে রক্ষা করো। কথা থাকে যে, মায়ে বলছেন না, মেয়ের জামাইয়ের কথা, কন্যা বলছেন না, তার বাবার কথা, এখানে কিন্তু কেউই একসঙ্গে দুজনকে বাঁচাতে বলছেন না বা ভগবানের কাছে প্রার্থনা ও করছেন না। যার যার স্বামীকে রক্ষা করতে বলছেন।
আমাদের সমাজের হাল অবস্থা কিন্তু ঠিক উপরে উল্লেখিত গল্পের মতোই প্রায় । এখানে যারা যে সমাজ বা সোসাইটির সমর্থক, রাজনীতি দলের সমর্থক । তারা কখনও কেউ নিজের অবস্থান নিয়ে কোনো মন্তব্য বা সমালোচনা করতে কিন্তু তেমন শোনা যায় না । সবাই বলতেছেন তারাই খারাপ। মানে বিপক্ষ বা বিটিম যাই বলি না কেন। তারাই খারাপ। সেটা হোক ধর্ম, হোক তরিকা, হোক রাজনীতি এমনকি উত্তর পাড়া, দক্ষিণ পাড়ার লোকেরাও পর্যন্ত। এক পাড়ার লোকেরা আরেক পাড়ার লোকজন নিয়ে বিদ্রূপ মন্তব্য করতেও শোনা যায় আমাদের সমাজে । এককথায় ভিন্ন মত বা ভিন্ন পথের যে কাউকে দ্বিধাহীন ভাবে কটাক্ষ করা, মন্দ বলা তার নামে গুজব রটনা করা এমনকি গালাগালি পর্যন্ত করতে ও শোনা যায়। সভ্যবতা মানবতা এ যেন আর নেই বললেই চলে বিশেষ করে আমাদের সমাজে । এছাড়া খুন - খারাপি মারামারি কাটাকাটি পর্যন্ত চলছে প্রতিনিয়ত।
আমাদের সমগ্র দেশটা হচ্ছে মূলত তিন ভাগে ভাগ করে চলে এবং তৃমুখী আলোচনা সমালোচনা ও চলছে সরগরম । যেমন, ১. রাজনীতি, ২. ধর্মনীতি ও তরিকানীতি, ৩, সংখ্যালঘু বা বিধর্মী। এই তিনটি বিষয় নিয়ে আমরা যত আলোচনা সমালোচনা করি। এ যেন কাজের চেয়েও কথা বেশি বলি। অসংখ্য সময় নষ্ট করি। আসলে সত্যি। আমাদের সমাজে তিন থেকে পাঁচজন লোক যদি কোনভাবে একত্র হয়ে যাই। তখনই আমাদের মাঝে উল্লেখিত তিনটি বিষয় থেকে, যেকোনো একটি বিষয় নিয়ে তাৎক্ষণিক আলোচনা শুরু হয়ে যায়। এ যেন আমাদের মুখস্থ বিদ্যা বলা যেতে পারে। মুফতি,মুন্সী,মাওলানা, খতিব, ইমাম, ঠাকুর পুরোহিত গীর্জার প্রধানসহ কেউ বাকি নেই সবাইকে নিয়ে তর্ক বিতর্ক চলছে তো চলছেই।
অনেক আলোচনা মিডিয়া পর্যন্ত হয়ে চলে যায়। অসংখ্য আলোচনা - সমালোচনা নিয়ে, টকশো পর্যন্ত শুরু হয়ে যায়। কিন্তু দেশের হাল অবস্থা যে দিনের দিন খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যেমন ব্যবসা বাণিজ্য মন্দা চলছে,দেশের শিক্ষাব্যবস্থার খারাপ অবস্থা , স্বাস্থ্যসেবার মান খারাপ, সব সরকারের আমলেই নতুন করে, পণ্যের দাম বৃদ্ধি হয়ে যায়। প্রতিদিনের খাবারের তালিকায় আমাদের যে ধরনের পণ্য বা খাবার রয়েছে তা যেন বর্তমানে ৯০% এর মধ্যে রয়েছে, ফরমালিন যুক্ত, কীটনাশকযুক্ত , সবজি,ফল, মিষ্টি- দধি আমরা যা খাচ্ছি, অন্য দিকে ফার্মের তৈরি,গরুর মাংস,মুরগি, ডিম ও মাছ আমরা যা খাচ্ছি, কিন্তু সত্যি সত্যি অখাদ্য খাবার খাচ্ছি। তা নিয়ে কোথাও কিন্তু জোরালোভাবে আলাপ আলোচনা হচ্ছে না। প্রতিবাদ হচ্ছে না। আজকে জামায়াতে ইসলামী বিরোধী দলে থাকা অবস্থায়ও তাদেরকে কখনও এসব বলতে শোনা যায়নি। দেশ রক্ষায়, জনগণ রক্ষায়, ধর্ম রক্ষায় হালাল খাবার, পুষ্টি খাবার জনগণের জন্য যে খুবই প্রয়োজন। সরকারের তো অনেক কাজ থাকে। তাই তাদের হয়তো খেয়াল থাকে না সব বিষয়ে। তাই সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে, বিরোধী দলের নেতারা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে দাবি তুলে থাকেন । তারপর সরকার কিছু কাজ করার তাগাদা অনুভব হয়। কিন্তু খাদ্য পরিশুদ্ধ নিয়ে আসলে সরকার বিরোধী দল বা জনগণ কেউ কিছু বলছেন না। এটা খুবই দুঃখজনক।
আমাদের জীবনের বেশিরভাগ সময় নষ্ট করছি, দেখা যাচ্ছে, ধর্ম ধর্ম করে, ধর্ম নিয়ে শিক্ষার জন্য তর্কাতর্কি বেশি বেশি করে, রাজনীতি আর রাজনীতি বা দলাদলি করে, এদিকে সংখ্যালঘুরা মানুষ না বিধর্মী, এরকম আলোচনা সমালোচনা করেই ,আমাদের দিন যাচ্ছে, রাত যাচ্ছে। সময় যাচ্ছে। দেশ নিয়ে, সমাজ নিয়ে, সমাজের মঙ্গল ও উন্নয়ন নিয়ে খুব কম আলোচনাই হচ্ছে আমাদের সমাজে। দেখা যাচ্ছে ঘটে যাওয়া বিষয় গুলো নিয়েই আমরা বেশি আলোচনা করেই সবচেয়ে বেশি সময় নষ্ট করছি প্রতিদিন। সামনে কি করব? কি করলে ভালো হবে? এসব যেন আমরা ভুলতে বসেছি। যার যার দল তার তার কাছেই বড়ো। তার তার কাছেই তাদের পীর সাহেব বড়ো বা তাদের নেতাই বড়ো। এই দলাদলি পক্ষ বিপক্ষ নিয়েই আমাদের সমাজ চলছে, কোন এক অন্ধকার পথে অজানার উদ্দেশ্যে!
আমাদের সমাজে এমনভাবে সমান তালে বিভিন্ন গুষ্ঠি গুলো রয়েছে। এক দল অন্য দলকে চোর বলছে। আরেক দল ঐ দলের লোকদেরকে ডাকাত বলছে। অসভ্য ভাষা তো আছেই। তাদের সেই রোষানলে সাধারণ জনগণ পিষ্ট হচ্ছে প্রতিনিয়ত। দুর্বলের উপরে চলছে সবলের বাহাদুরি। জোর করে ছিনিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, দুর্বলের সহায় সম্ভবল। সংঘবদ্ধ ভাবে চলছে এসব ঘটনা। দেশের সাধারণ জনগণ কয়েক যুগ ধরে, কেউ বোবা সেজে, কেউ বোকা সেজে, কেউ কেউ তাদের জবান বন্ধ করে বেচে আছে এই সমাজে, যেন চোরের মতো মাথা নত করে। কিন্তু সত্যিকারের চোরেরা বুক ফুলিয়ে, ছিনা টান টান করে দিব্বি ঘুরে বেড়াচ্ছে সমাজের চোখে আঙ্গুল তুলে । দিন দিন সমাজটা এতটাই দোষনীয় হয়ে যাচ্ছে যে, চব্বিশ মামলার আসামী হয়েও সোনালী রঙ্গের ঘড়ি হাতে দিয়ে, ইস্ত্রি করা জামা কাপড় পরে দিব্বি সমাজের সবার সামনে, ঘুরে বেড়াচ্ছে বাহাদুরের মতো ।
এখানে চার যুগ ধরেই সাধারণ জনগণ আইন আদালতে বা সামাজিক পঞ্চায়েতে,. ন্যায় বিচার পাওয়া থেকে বঞ্চিত রয়েছে । এখানে সবাই শক্তের ভক্ত নরমের জম হিসাবে আবির্ভূত হচ্ছে। হাতে গোনা কিছু জনপ্রতিনিধি ছাড়া বাকি সবার কাছে সাধারণ জনগণ চরম অবহলিত উপেক্ষিত আজীবন । এখানে তাদের আর কিছু করার নেই। এই সমাজে একশ কোটি টাকার মালিক যদি কেউ চুরি করেও হয়। বাটপারি বা প্রতারণা করেও হয়। তাকে রক্ষা করার জন্য হাজারেরও বেশি লোক তার পক্ষে থাকে সবসময় । একজন বড়ো মাপের চোরকে তাকে রক্ষা করার জন্য। আর গরু চোর, ছাগল চোরেরা সবাই জেলে আছে । এসব থেকে আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। জেল যেন সব চোরদের হয়, তা বড়ো হোক আর ছোট হোক । ভূক্তভোগী জনগণ যেন ন্যায় পায়। ভাবতে হবে আমরা বর্তমানে কিভাবে ভালো থাকব আর ভবিষ্যত প্রজন্মর জন্য ও ভাবতে হবে, আগামী প্রজন্ম যেন ভালো থাকতে পারে। সেভাবেই আমাদের এগিয়ে যাওয়া উচিৎ বলে আমি মনে করি।
অথই নূরুল আমিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক, কলাম লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তক
প্রধান মুখপাত্র জাতীয় মানবসম্পদ উইং
প্রধানমন্ত্রীর মানবসম্পদ উন্নয়ন উপদেষ্টা ( গ্রন্থলেখক )
মোহাম্মদপুর, ঢাকা - ১২০৭।