
জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার রানিগঞ্জ ইউনিয়নের রানীগঞ্জ কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আলাউর রহমান ঠাকুরের বিরুদ্ধে নিয়োগ জালিয়াতি ও ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে দীর্ঘদিন পদ দখলের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। প্রশাসনিক দুটি পৃথক তদন্তে তিনি তার নিয়োগের স্বপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
অফিস ও এলাকাবাসী সূত্রে জানা যায়, ২০০৮ সালে স্থানীয় ভূমিদাতা ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান মজলুল হক কলেজটি প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটি এমপিওভুক্ত হয়। গত ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কলেজের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও ভূমিদাতা আলহাজ্ব মজলুল হক উপজেলা নির্বাহী অফিসার এবং সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে মো. আলাউর রহমান ঠাকুরের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। একই ধারাবাহিকতায় রানীগঞ্জ এলাকাবাসীর পক্ষে কলেজের আজীবন দাতা সদস্য হাজী মো. চাঁন মিয়া ২৪ জুন ২০২৬ তারিখে উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও জেলা প্রশাসক বরাবর অপর একটি লিখিত অভিযোগ দেন।
অভিযোগের ভিত্তিতে প্রশাসন তদন্ত শুরু করে। প্রথমে জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নির্দেশে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার অরূপ রায়, উপজেলা কৃষি অফিসার কাউছার আহমেদ এবং উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার মাহবুবুল আলমকে নিয়ে ৩ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। পরবর্তীতে জেলা প্রশাসক (শিক্ষা)-এর নির্দেশে জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জুলফিকার হোসেনকেও তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তদন্তকালে অভিযুক্ত আলাউর রহমান ঠাকুরকে নিয়োগপত্রসহ যাবতীয় বৈধ কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হতে বলা হলেও তিনি নোটিশের কোনো জবাব দেননি এবং কর্মকর্তাদের সামনে উপস্থিত হয়ে কোনো কাগজপত্র দেখাতে পারেননি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা সুপারভাইজার অরূপ কুমার রায় ও জেলা শিক্ষা অফিসার মো. জুলফিকার হোসেন উভয়ই তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেন যে, অভিযুক্তের কাছে নিয়োগের স্বপক্ষে কোনো বৈধ কাগজপত্র পাওয়া যায়নি। পরে জেলা প্রশাসন তদন্ত প্রতিবেদনটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাঠায়। প্রতিবেদন পর্যালোচনার পর সিলেট শিক্ষা বোর্ডের নির্দেশে গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে আলাউর রহমান ঠাকুরকে অপসারিত করা হয় এবং কলেজের সিনিয়র প্রভাষক মো. আবু খালেদকে ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব প্রদান করা হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, দীর্ঘ দিন ধরে ভুয়া কাগজপত্রের ওপর ভর করে আলাউর রহমান ঠাকুর কলেজের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। এমনকি নিয়োগ কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর জাল করে তিনি নিয়োগপত্র তৈরি করেছিলেন বলেও তদন্তে বেরিয়ে এসেছে।
নিয়োগ কমিটির সাবেক সাধারণ সম্পাদক লুৎফুর রহমান বলেন, "আমি কোনো স্বাক্ষর দিইনি। যে স্বাক্ষর দেখানো হয়েছে তা সম্পূর্ণ ভুয়া ও জাল।"
কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ আলিম উদ্দিন জানান, "আমি থাকাকালে আলাউর রহমান ঠাকুরকে কেবল খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তীতে তিনি কীভাবে কী করেছেন তা আমার জানা নেই।"
নিয়োগ বোর্ডের সদস্য ছাব্বির আহমেদ ও সাখাওয়াত হোসেন উভয়েই জানান, তারা ইসলাম শিক্ষা বিষয়ের নিয়োগ পরীক্ষায় উপস্থিত ছিলেন না এবং কোনো স্বাক্ষরও করেননি। তারা লিখিতভাবে বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
এদিকে অভিযুক্ত আলাউর রহমান ঠাকুর গত প্রায় দুই মাস ধরে কলেজে অনুপস্থিত রয়েছেন। যাওয়ার আগে তিনি তার অফিস কক্ষ এবং গুরুত্বপূর্ণ দুটি আলমারি তালাবদ্ধ করে চাবি সঙ্গে নিয়ে গেছেন। ফলে কলেজের চেক বইসহ জরুরি দাপ্তরিক কাগজপত্র উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।
এর ফলে প্রশাসনিক স্থবিরতাসহ চরম বিপাকে পড়েছেন শিক্ষক, কর্মচারী ও শিক্ষার্থীরা। কলেজের শিক্ষার্থী মাহি, অনিকা রানী ও আসছি বেগম আক্ষেপ প্রকাশ করে জানান, গত দুই মাস ধরে প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তাদের ভবিষ্যৎ অন্ধকারাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে। প্রভাষক সাইফুর রহমান বলেন, "অধ্যক্ষ তালা মেরে চাবি নিয়ে চলে যাওয়ায় আমরা দাপ্তরিক কার্যক্রম চালাতে পারছি না, এমনকি বেতন-ভাতাও পাচ্ছি না।"
এ বিষয়ে অভিযুক্ত মো. আলাউর রহমান ঠাকুরের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, "আমার বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ মিথ্যা, বিষয়টি আদালত দেখবে।" নিয়োগ জালিয়াতি ও চাবি আটকে রাখার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, "আপনাকে সব জবাব দিতে বাধ্য নই" বলে ফোন কেটে দেন।
কামরুল ইসলাম (অফিস সহকারী) ও বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. আবু খালেদ জানান, বোর্ডের নির্দেশে দায়িত্ব গ্রহণ করলেও অফিস কক্ষ ও আলমারির চাবি আলাউর রহমানের কাছে থাকায় এবং কোনো নথিপত্র বুঝিয়ে না দেওয়ায় প্রশাসনিক কাজ চালানো সম্ভব হচ্ছে না।
জগন্নাথপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. ইসলাম উদ্দিন ও অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) শাকিলা রহমান জানান, তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় এবং অভিযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগের কোনো বৈধ কাগজপত্র দেখাতে না পারায় তদন্ত প্রতিবেদন সিলেট শিক্ষা বোর্ডে পাঠানো হয়েছিল। বোর্ডের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বর্তমান ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিলেট মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের পরিচালক প্রফেসর দিদার চৌধুরী জানান, "ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে। তিনি অফিস কক্ষ ও আলমারি তালাবদ্ধ রেখে দুই মাস ধরে অনুপস্থিত। আমি তদন্ত প্রতিবেদন বোর্ডে জমা দিয়েছি, সেই অনুযায়ী পরবর্তী আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।"