নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
‘আমি কি সত্যিই থেমে যাব?’—নিজেকেই এমন প্রশ্ন করে সাংবাদিকতার পথচলায় নিজের অভিজ্ঞতা, ক্লান্তি, অভিমান ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথা তুলে ধরেছেন সাংবাদিক নাদিরুজ্জামান আজমল।
শনিবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে তিনি এসব কথা জানান। পোস্টটিতে তিনি সাংবাদিকতা কেন শুরু করেছিলেন, মানুষের বিভিন্ন সমস্যা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে কী ধরনের অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছেন এবং সাম্প্রতিক সময়ে কেন থেমে যাওয়ার কথা মনে হচ্ছে—তারই একটি আত্মকথন তুলে ধরেন।
ফেসবুক পোস্টে নাদিরুজ্জামান আজমল লেখেন, কয়েকদিন ধরে তিনি বারবার নিজেকেই প্রশ্ন করছেন—তিনি সত্যিই থেমে যাবেন কি না। তার ভাষ্য, একটা সময় কোনো ঘটনা ঘটলেই তার ভেতর থেকে তাগিদ আসত, বিষয়টি নিয়ে লিখতে হবে; মানুষের সমস্যা তুলে ধরতে হবে। যে মানুষটি নিজের কথা বলতে পারছেন না, তার হয়ে অন্তত কয়েকটি শব্দ লেখার চেষ্টা করতে হবে।
অষ্টগ্রামের বিভিন্ন সমস্যা ও সংকট নিয়ে লেখার অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সড়কের দুরবস্থা, মানুষের দুর্ভোগ, কৃষকের সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার মতো বিষয় নিয়ে তিনি লিখেছেন। কেউ অন্যায়ের শিকার হলে তার কথাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন।
তবে সবসময় এসব লেখার পর কাঙ্ক্ষিত প্রতিক্রিয়া পাননি বলেও আক্ষেপ করেন তিনি। কখনো লিখেও কোনো উত্তর পাননি, কখনো প্রশ্ন করেও পেয়েছেন নীরবতা। এমনকি মানুষের জন্য দাঁড়ানোর পর সেই মানুষদের অনেককেই পরবর্তী সময়ে পাশে না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নাদিরুজ্জামান আজমল বলেন, তার কাছে সাংবাদিকতা শুধু একটি পেশা নয়; এটি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার একটি চেষ্টা।
সাংবাদিকতার কারণে ভুল বোঝাবুঝি ও নানা ধরনের অভিযোগের মুখোমুখি হওয়ার কথাও পোস্টে তুলে ধরেন তিনি। তার ভাষ্য, অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে ব্যক্তিগত আক্রোশ, প্রশ্ন করলে কারও ইন্ধনে কাজ করা কিংবা অনিয়ম তুলে ধরলে শত্রুতা করার অভিযোগ উঠলে একজন সাংবাদিক একসময় নিজেকেই প্রশ্ন করেন—‘আমি আসলে কার জন্য লিখছি?’
নিজের অবস্থান পরিষ্কার করে তিনি বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত যুদ্ধ করা, কাউকে ছোট করা কিংবা অপমান করে নিজেকে বড় করা তার উদ্দেশ্য নয়। তিনি শুধু চেয়েছেন অষ্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কথাগুলো আরও দূরে পৌঁছাক এবং হাওরের মানুষের সমস্যাগুলো মানুষের সামনে উঠে আসুক।
বর্ষায় হাওরের মানুষের জীবনযাপন, পানি কমে গেলে যোগাযোগের দুর্ভোগ, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ভোগান্তি এবং কৃষকদের অনিশ্চয়তার বিষয়গুলোও পোস্টে তুলে ধরেন তিনি।
নাদিরুজ্জামান আজমলের মতে, একটি সংবাদ দিয়ে পৃথিবী বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি সংবাদ কখনো একজন মানুষের জন্য একটি দরজা খুলে দিতে পারে, একটি প্রতিবেদন কোনো কর্তৃপক্ষকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে এবং একটি প্রশ্ন এমন কোনো বিষয় সামনে আনতে পারে, যা সবাই দেখেও এতদিন উপেক্ষা করেছে।
তবে দীর্ঘদিনের এই পথচলায় বর্তমানে ক্লান্তি এসেছে জানিয়ে তিনি লেখেন, কখনো কখনো তার মনে হয় সব ছেড়ে দেবেন। কলমটা পাশে রেখে দেবেন, ক্যামেরা বন্ধ করে দেবেন, আর কোনো অভিযোগ শুনবেন না এবং রাত জেগে সংবাদও লিখবেন না।
এরপরও অষ্টগ্রামের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কারণে পুরোপুরি দূরে সরে যেতে পারছেন না বলে জানান তিনি।
ফেসবুক পোস্টে আজমল বলেন, অষ্টগ্রাম শুধু একটি উপজেলা নয়; এটি তার জন্মস্থান, কর্মক্ষেত্র এবং নিজের মানুষের জায়গা। তাই চাইলেও পুরোপুরি দূরে সরে যেতে পারবেন না।
তিনি জানান, হয়তো কিছুদিন চুপ থাকবেন, নিজেকে সময় দেবেন এবং নিজের ভেতরের ক্লান্ত মানুষটিকে বিশ্রাম দেবেন। তবে তার প্রশ্ন—তিনি চুপ থাকলেও মানুষের সমস্যাগুলো কি থেমে থাকবে? অন্যায় কি থেমে যাবে? নিজের পোস্টেই এর উত্তর দিয়ে তিনি বলেন, ‘না।’
সাংবাদিকতা কোনো পদ-পদবি, পুরস্কার কিংবা কাউকে খুশি করার জন্য করেননি বলেও উল্লেখ করেন তিনি। নিজের ভেতরের তাগিদ থেকেই লিখেছেন বলে জানান।
পোস্টের একপর্যায়ে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘একজন সাংবাদিক যদি মানুষের কথা বলতে গিয়ে একদিন একা হয়ে যায়, তাহলে তাকে কে সাহস দেবে?’
এই প্রশ্নের উত্তর তার জানা নেই জানিয়ে তিনি এমন একজনের অপেক্ষার কথা বলেন, যিনি একদিন এসে বলবেন—‘ভাই, আপনি থামবেন না। আপনি লিখুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’
পোস্টের শেষাংশে নিজের অবস্থান তুলে ধরে নাদিরুজ্জামান আজমল লেখেন, তিনি আহত, ক্লান্ত কিংবা অভিমানী হতে পারেন; কিন্তু অষ্টগ্রামের মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে এত সহজে শেষ করে দিতে পারবেন না।
তিনি বলেন, ‘আমি জানি না আমি থামব কি না। তবে এটুকু জানি, আমাকে থামিয়ে দিলেও মানুষের প্রশ্নগুলো থামবে না।’
ফেসবুকে দেওয়া ওই পোস্টে সাংবাদিকতার দীর্ঘ পথচলায় নিজের অভিজ্ঞতা, ক্লান্তি ও মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার কথাই তুলে ধরেছেন সাংবাদিক নাদিরুজ্জামান আজমল।