লেখক চারণ কবি মুকলেছ উদ্দিন ইতিহাস গবেষক:
মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী (হেলিম) একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও সংগঠক। তিনি ১৯৬৬ সালের ১ জানুয়ারি নেত্রকোণার মসজিদ কোয়ার্টার (মুক্তারপাড়া) এলাকার এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী সবার কাছে হেলিম নামে পরিচিত। তাঁর পিতা মরহুম সামছুল কিবরিয়া চৌধুরী ছিলেন একজন ভাষাসৈনিক এবং মাতা মরহুমা হালিমুন্নেছা চৌধুরী।
শৈশব থেকেই হেলিমের বেড়ে ওঠা নেত্রকোণার সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশে। বর্তমানে তিনি নেত্রকোণার মসজিদ কোয়ার্টার (মুক্তারপাড়া) এলাকার ‘চৌধুরী কুটিরে’ বসবাস করছেন। তাঁর স্থায়ী ঠিকানা নেত্রকোণা সদর উপজেলার লক্ষীগঞ্জ ইউনিয়নের সানকিউরা গ্রামের ‘মিয়াবাড়ি’।
শিক্ষাজীবনে তিনি ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি পরীক্ষায় তৃতীয় বিভাগ এবং এইচএসসি পরীক্ষায় দ্বিতীয় বিভাগ অর্জন করেন। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত নেত্রকোণা সরকারি কলেজ থেকে স্নাতক (পাস) ডিগ্রি লাভ করেন এবং দ্বিতীয় শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হন। ছাত্রজীবনেই তাঁর মধ্যে শৃঙ্খলা, নেতৃত্ব ও সংগঠনের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়। বাংলাদেশ ন্যাশনাল ক্যাডেট কোরের নেত্রকোণা সরকারি কলেজ ইউনিটে তিনি ক্যাডেট সার্জেন্ট হিসেবে মৌলিক প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৭ সালের মধ্যে তিনি তিনটি জাতীয় প্যারেডে অংশগ্রহণ করেন। এই অভিজ্ঞতা তাঁর ব্যক্তিত্বে দায়িত্ববোধ ও নেতৃত্বের গুণাবলিকে আরও দৃঢ় করে।
১৯৮৬ সাল থেকে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যুক্ত হন। পেশাগত দক্ষতা বাড়ানোর লক্ষ্যে প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে সাংবাদিকতার বিভিন্ন বিষয়ে ২১টি প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করেন। পাশাপাশি, ২০০১ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের অধীনে সমাজকল্যাণের বিভিন্ন বিষয়ে আটটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন।
সাংবাদিকতা জীবনের শুরুতে তিনি দৈনিক ইনকিলাবের নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৮৬ থেকে ২০০৩ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্বে ছিলেন। একই সময়ে, ১৯৯০ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত দ্য ডেইলি স্টারের জেলা প্রতিনিধি হিসেবেও কাজ করেন। ২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ বেতারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে দৈনিক যুগান্তরে (২০১১–২০১৯) দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি দৈনিক আমার দেশ ও বাংলাভিশনের নেত্রকোণা জেলা প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তাঁর লেখা গ্রন্থ ও সমকালীন প্রবন্ধের সংখ্যা মিলিয়ে ২১১টি। তিনি বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনে তিনি নেত্রকোণার নানা সমস্যা, মানুষের অধিকার, সামাজিক বৈষম্য এবং জনজীবনের বিভিন্ন বিষয় জাতীয় পর্যায়ে তুলে ধরেছেন। সংবাদ সংগ্রহ ও পরিবেশনের পাশাপাশি সাংবাদিকদের পেশাগত স্বার্থ রক্ষা, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডেও তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে আসছেন।
সাংগঠনিক জীবনেও তাঁর রয়েছে দীর্ঘ অভিজ্ঞতা। ১৯৮৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ সাংবাদিক সমিতি, নেত্রকোণার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৯ সাল থেকে তিনি সাংবাদিক কল্যাণ সংস্থার সভাপতি হিসেবে কাজ করে যাচ্ছেন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি নেত্রকোণা জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মানবাধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য। ১৯৯৯ সালের আগস্ট মাস থেকে অদ্যাবধি তিনি বাংলাদেশ মানবাধিকার বাস্তবায়ন সংস্থার নেত্রকোণা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এ সময়ে তিনি মানুষের অধিকার, ন্যায়বিচার ও সামাজিক নিরাপত্তার বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করে আসছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গেও তাঁর দীর্ঘদিনের সম্পর্ক রয়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সিনেট রেজিস্টার্ড গ্র্যাজুয়েট অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য। সামাজিক ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গেও তিনি নিবিড়ভাবে যুক্ত। তিনি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসোসাইটি, নেত্রকোণা রোগী কল্যাণ সমিতি এবং অপরাধী সংশোধন ও পুনর্বাসন সমিতির আজীবন সদস্য। নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় জামে মসজিদের যুগ্ম মুতাওয়াল্লি হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। একই সঙ্গে নেত্রকোণা কেন্দ্রীয় ঈদগাহ কমিটির সহসভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন। ২০২৫ সাল থেকে তিনি মসজিদ ও ঈদগাহ কমিটির এসব দায়িত্ব পালন করে আসছেন।
মাহবুবুল কিবরিয়া চৌধুরী (হেলিম) শুধু একজন সাংবাদিক নন; তিনি একজন সাহিত্য সংগঠক, মানবাধিকারকর্মী ও সমাজসেবী। নেত্রকোণার সাহিত্য সাংবাদিকতা ও সামাজিক অঙ্গনে তাঁর পরিচিতি গড়ে উঠেছে দীর্ঘদিনের নিষ্ঠা, অভিজ্ঞতা এবং মানুষের পাশে থাকার মানসিকতার মাধ্যমে। জাতীয় সংবাদমাধ্যমে কাজ করার পাশাপাশি তিনি সাংবাদিকদের কল্যাণ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক উন্নয়ন ও সাহিত্য সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে নিজেকে সম্পৃক্ত রেখেছেন।২০২৪ সাল থেকে নেত্রকোণা সাহিত্য সমাজের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন।
ভাষাসৈনিক পিতার আদর্শ, সাংবাদিকতা পেশার অভিজ্ঞতা এবং সমাজকল্যাণের প্রতি দায়বদ্ধতা—এই তিনের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছে তাঁর কর্মজীবন। জুলাই যোদ্ধা হিসেবে তাঁর পরিচয়ও তাঁর সংগ্রামী মানসিকতা ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ের প্রতিফলন। নেত্রকোণার মানুষের কাছে তিনি তাই কেবল একজন জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক নন, বরং একজন দায়িত্বশীল সংগঠক ও জনসম্পৃক্ত অনন্য ব্যক্তিত্ব।