নিজস্ব প্রতিবেদক:
আদালতের সুস্পষ্ট নির্দেশনা উপেক্ষা করে বহিরাগত সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (ইইউবি) দখলের অভিযোগ উঠেছে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খানের বিরুদ্ধে। গত বৃহস্পতিবার (২২, ২৩ ও ২৪ জানুয়ারি) পর পর ৩ দিন অতর্কিত হামলা ধরা পড়েছে সিসিটিভি ক্যামেরায়। ২২ জানুয়ারি দুপুরে রাজধানীর মিরপুরে অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সংঘটিত এই ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় বাসিন্দা এবং সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খান ক্যাম্পাস দখলের উদ্দেশ্যে বহিরাগত একদল সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে প্রবেশের চেষ্টা করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র জানায়, মকবুল আহমেদ খানের সঙ্গে আগতদের মধ্যে অসংখ্য মামলার চিহ্নিত ও দাগি আসামিও ছিল। একই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে পূর্বে বহিষ্কৃত কয়েকজন শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে প্রবেশ করে ভাঙচুর চালায়। সিসিটিভি ফুটেজে দেখা যায়, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী মেহেদী হাসানসহ আরও দুইজন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্তমান চেয়ারম্যান আহমেদ ফরহাদ খান তানিমের কক্ষের সামনে থাকা নেমপ্লেট খুলে নিয়ে যায়।
এর আগে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর মহামান্য হাইকোর্ট বিভাগ সিভিল রিট পিটিশন নং ৪০৩৫/২৫ মামলার রায়ে ড. মকবুল আহমেদ খানকে একা ক্যাম্পাসে প্রবেশের অনুমতি দেন। বয়সজনিত কারণে প্রয়োজনে একজন সহযোগী সঙ্গে নিতে পারবেন বলেও আদালত রায়ে উল্লেখ করেন।
তবে আদালত সুস্পষ্টভাবে নির্দেশ দেন, মকবুল আহমেদ খান কোনোভাবেই দলবল বা বহিরাগত লোকজন নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে পারবেন না। একই সঙ্গে রায়ে সতর্ক করে বলা হয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট করার চেষ্টা করা হলে তার বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
অভিযোগ উঠেছে, সেই আদালতের রায়কেই কার্যত বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে মকবুল আহমেদ খান বহিরাগত সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে ক্যাম্পাস দখলের চেষ্টা করেন। সিসিটিভি ফুটেজে তাকে তার তথাকথিত ‘পেকুয়া বাহিনী’সহ বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় অবস্থান করতে দেখা যায়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পর্যালোচনায় সিসিটিভি ফুটেজে দেখা গেছে, দুপুর ১টা ২২ মিনিটে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শামীম আহমেদ একদল বহিরাগত সন্ত্রাসী নিয়ে ক্যাম্পাসের সামনে এসে উপস্থিত হন। সেখানে আগে থেকেই অবস্থান করছিলেন সার্টিফিকেট জালিয়াতির মাধ্যমে চাকরি নেওয়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত রাকিব একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, বহিষ্কৃত শিক্ষার্থী ইমরান হোসেন জয়, মেহেদী হাসান, ইমরান সামির, মেহেরাব হোসেন সৌরভসহ অন্তত শতাধিক বহিরাগত ব্যক্তি।
কিছুক্ষণ পর নিজের প্রাডো গাড়িতে করে সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খান ক্যাম্পাসের সামনে এসে পৌঁছান। তার আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আগে থেকেই অবস্থানরত তার অনুসারী ও পোষা পেটুয়া বাহিনী বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে। একপর্যায়ে সবাই একত্রিত হয়ে সংঘবদ্ধভাবে অপেক্ষা করতে দেখা যায়, যা পুরো ঘটনার পূর্বপরিকল্পিত ইঙ্গিত দেয়।
দুপুর ১টা ৩৯ মিনিটে সিসিটিভি ফুটেজে আরও দেখা যায়, হত্যা মামলাসহ একাধিক মামলার আসামি হিসেবে পরিচিত স্থানীয় সন্ত্রাসী সান্তনু হোসেন রুবেল ওরফে ‘পটেটো রুবেল’ ঘটনাস্থলে এসে মকবুল আহমেদ খানের সঙ্গে যুক্ত হন এবং মকবুল খানকে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গনে প্রবেশ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেন।
এলাকাবাসীর ভাষ্যমতে, পটেটো রুবেল দীর্ঘদিন ধরে এলাকার ত্রাস হিসেবে পরিচিত। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সন্ত্রাসের অভিযোগ অভিযোগ রয়েছে, পটেটো রুবেল নিজেকে দারুস সালাম থানার ১০ নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সদস্য সচিব পরিচয় দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদাবাজি ও দখলবাজির মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এর আগে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ারম্যান ছিল আওয়ামী লীগের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর তবে এখন ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের সদস্য সচিব সাজ্জাদুল মিরাজের আশ্রয়ে পটেটো রুবেল, সারওয়ার আলম পিয়াসসহ বেশ কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খান কে বিশ্ববিদ্যালয় দখল করতে বিভিন্ন সময় এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছে।
এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির আহ্বায়ক আব্দুস সালাম বলেন, “দলের নাম ব্যবহার করে কেউ যদি সন্ত্রাসী কার্যকলাপে লিপ্ত হয়, তাহলে তার বিরুদ্ধে অবশ্যই সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ঘটনার সময় সিসিটিভি ফুটেজে কতিপয় কিছু শিক্ষার্থীকে সাথে নিয়ে আইন বিভাগের শিক্ষার্থী আসিফ সরকার যুক্ত হয় হামলাকারীদের সাথে। পুরো ঘটনার সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ করলে স্পষ্ট ভাবে নিশ্চিত হওয়া যাই আইন বিভাগের আসিফ সরকার এবং সামিম এর সহায়তায় সবকিছুই ছিল পূর্বপরিকল্পিত।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর মেজর (অব.) আমিনুর রহমান বলেন, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান মকবুল আহমেদ খান তার সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেতরে প্রবেশ করে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি তৈরি করেন। তার পেটুয়া বাহিনী দিয়ে শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখানো হয় এবং বলা হয় তার সঙ্গে কাজ না করলে চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হবে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন চরম উদ্বিগ্ন। ইউনিভার্সিটি কর্তৃপক্ষ সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে ইউনিভার্সিটি দুই দিনের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেছে।
ঘটনার পর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে দারুস সালাম থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে।
দারুস সালাম থানার অফিসার ইনচার্জ রাকিব উল হোসেন জানান, এ বিষয়ে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।