অথই নূরুল আমিন:
সরকারের পক্ষ থেকে মজুরি বোর্ড গঠন করে দিয়ে সরকার মনে করতেছে মহা কাজ করে ফেলেছে। আহা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার আহা। আমার ধারণা থেকে বলছি। এরকম অকার্যকর ও হাস্যকর একটি মজুরি বোর্ড একদিন সরকারের গলার কাটা হতে পারে। সরকার যদি গোপনে মজুরি বোর্ড এ শ্রমিকদের জন্য ভর্তুকি দেয় সেটাও হবে সরকারের জন্য এক ধরনের বোকামি। আমাদের দেশের অর্থহীন এবং টানাটানির সরকার গুলো ক্ষমতায় এসে দীর্ঘমেয়াদী কোন পদক্ষেপ নিতে পারে না। তার আগেই সরকারের পাশে থাকা দুষ্টু কিছু কৌশলী বা পরামর্শকেরা আরো কিছু ভুল ধারণা সরকার প্রধানের মাথায় ঢুকিয়ে দেয়। যা থেকে সর্বনাশা পথ তৈরী করে যাচ্ছে সবসময়ই ।
বিশেষ করে বাংলাদেশে যারা গার্মেন্টস বা বড় বড় ফ্যাক্টরীতে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন বা করেন। তাদের এখানে সবচেয়ে বেতন কম থাকে, হেলপারদের মানে বিভিন্ন সেক্টরে যারা মুল কাজের সহকারি হিসেবে কাজ করেন। যাকে বলে শিক্ষার সময় বা শিক্ষানবীশ ।
আরেকটি কথা হলো, গার্মেন্টস সেক্টরে নারী শ্রমিক ৬০% এর উপরে আর পুরুষ শ্রমিক ৪০% এর নীচে। বাংলাদেশে যদি কৃষি সেক্টর, গরু, মহিষ,ছাগল, হাস- মোরগ ও মৎস্য খামার সেক্টর গুলো লোকসানী না থাকতো। তাহলে এককথায় গার্মেন্টস সেক্টরের মালিকেরা পুরুষ শ্রমিক খোঁজে ও পেতো না কখনও বিশেষ করে বাংলাদেশে। কারণ বাংলাদেশ একটি সম্ভাবনাময় দেশ। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল সরকার গুলোর জন্য বারবার দেশে ভালো কিছু হচ্ছে না।
একটি শিক্ষিত বেকার ছেলে যখন কোনভাবেই তার স্বপ্ন পূরণ করতে গিয়ে কোনো পথই খোঁজে পায় না। না পারে কোনো ভালো ব্যবসা করতে না পায় অন্যকোন কোম্পানিতে চাকরি। অন্যদিকে আমাদের দেশের সরকার গুলোতো আজীবনের দেউলিয়া। ঠিক সেই সময় ঐ ছেলেটা কোন গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর সামনে গিয়ে সকাল আটটার আগেই লাইনে দাড়ায়। একটা পচা চাকরির আশায়, শুধুমাত্র চারটা ডাল ভাত খেয়ে জীবন বাঁচানোর তাগিদে। এর চেয়ে দুঃখজনক আর কি হতে পারে। অনেকেই বলছেন। তিরিশ হাজার টাকা বেতন করা হোক। একটা ছোট খাটো ফ্যামেলি বাসা ভাড়া যেখানে সর্বনিম্ন আট হাজার টাকা, কোথাও কোথাও দশ থেকে বারো এমনকি পনেরো হাজার টাকা পর্যন্ত আছে। চারজন লোকের পরিবারের জন্য একজন উপার্জনশীল হলে আমি মনে করি তিরিশ হাজার টাকাও খুবই কম হয়ে যায়।
স্বাধীনতার চুয়ান্ন বছর ধরে সমগ্র জাতি নিয়ে মশকরা করেছে, বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন সরকার প্রধানেরা। একটা যুবক সে চাকরি করবে। তার ভবিষ্যত করবে, তার সন্তানের ভবিষ্যৎ, বাবা মা বোনদের স্বপ্ন পূরণ করাসহ কত দায়িত্বই না রয়েছে। তার সাথে রয়েছে আত্মীয়ানা, মেহমান খানাসহ একটা বাঙালি ছেলের উপরে নানারকম দায়িত্ব বর্ধিত থাকে সবসময় । বারো হাজার টাকায় হেলপারী শুরু। তখন ও মাসে তিন হাজার টাকা ঋণ করে চলতে হয়। পনেরো হাজার টাকা বেতন হওয়ার পর বিয়ে। তখনও তিন হাজার টাকা ঋণ মাসে করতে হয়। পাঁচ বছর পর তিরিশ হাজার টাকা বেতন হয়। তখন দুটি সন্তানের ভরণপোষণের খরচ বেড়ে যায়। তখন ও মাসে তিন হাজার ঋণ।
কয়েক দিন ধরে দেশের বেশকিছু জায়গায় শ্রমিকদের আন্দোলন চলছে বেতন বৃদ্ধির জন্য। এরকম একটি ন্যায্য দাবিকে সরকারে থাকা কিছু চামচারা বলছেন এগুলো ষড়যন্ত্র। অমুক দল তমুক দলের কাজ। ওরে চামচা ভাইয়েরা আপনারা কি কোনো চাঁদের দেশে থাকেন ?.বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরিবহন সেক্টর থেকে শুরু করে এমন কোনো নিত্য পণ্য নেই যে তার দাম বাড়েনি। একজন মাসিক বেতনের বিশেষ করে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর শ্রমিকেরা, বিভিন্ন ফ্যাক্টরীর শ্রমিকেরা সেই বাড়তি খরচের টাকাটা পাবে কোথায় থেকে? যাদের ডিউটি শুরু হয় সকাল আটটায় আর ছুটি হয় দশটায়। একটা দেশের সরকারের কাছে যেখানে নাগরিকেরা উপেক্ষিত। সেখানে একটা কারখানার মালিকের কাছে তো অবহেলিত হবেই। এটা তো জানা কথা।
পণ্যের মূল্য কমিয়ে রাখার মতো কোন কাজই তো এখন পর্যন্ত সরকার শুরু করতে পারেনি। আমার প্রশ্ন হলো? মৎস্য আহরণ বন্ধ হলে সরকারের পক্ষ থেকে মৎস্যজীবীদের জন্য বরাদ্দ হয়, নগদ টাকা নতুবা চাল। এছাড়া সরকারের রয়েছে বিভিন্ন ভাতা। বতর্মান সরকারের দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রধান কর্মসূচি রয়েছে ফ্যামেলী কার্ড। গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীর তৃতীয় – চতুর্থ শ্রেণির শ্রমিকদের জন্য সেই ফ্যামেলী কার্ড ইস্যু করলেও তো তাদের অনেকটা সাশ্রয় হয়।
তবে দাবী আদায়ের আন্দোলনের নামে যদি গাড়ী ভাংচুর, রাস্তা অবরোধ, ফ্যাক্টরী বা কারখানায় স্বজ্ঞানে অগ্নিসংযোগ এরকম কাজ থেকে যারা বিরত থাকতে চায় না। এখানে উপস্থিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আদেশ নিষেধ যারা মানতে চায় না। আমার দৃষ্টিতে তারা সত্যি সত্যি অপরাধী। কারণ জ্বালাপোড়াও কর্মসূচি কখনও কোনো দাবি আদায় কর্মসূচি হতে পারে না। তা গ্রহণযোগ্য নয়।
অন্যদিকে সরকারের নির্দেশে একটি রফতানি মুখী কারখানার মালিক ইচ্ছে করলেই বেতন ভাতা বাড়াতে পারে না। একটি কারখানার প্রথম শর্ত হলো শ্রমিক। এই শ্রমিক যদি না থাকে তাহলে সেই কারখানাটা সম্পৃর্ণ অচল। এখানে মালিক পক্ষ তার প্রয়োজনেই বেতন বাড়াবে যদি তার শ্রমিক সংকট দেখা দেয়। দেশের প্রায় তিন কোটি জনগণ যেখানে বেকার রয়েছে। সেখানে শ্রমিকের বেতন তো কোম্পানির মালিকেরা বাড়াতে চাইবে না কখনও। কারণ তারাও জানে একজন চলে গেলে আরেকজন পেটের ক্ষুধায় আসবেই।
এগুলো সরকারের পক্ষ থেকে করতে হয়। কর্মসংস্থানের জন্য আমদানি রফতানি মূলক কিছু প্রতিষ্ঠান সরকার ইচ্ছে করলেই করতে পারে। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ ( একনেক ) আজ পর্যন্ত দেশের আত্ম কর্মসংস্থানের জন্য একটি প্রকল্প ও বড় আকারে আজ পর্যন্ত করা হয়নি। মাত্র ৩৬৫ দিনের জন্য জাতীয় বাজেট প্রায় দশ লাখ কোটি টাকার সমান। অথচ এখানে কর্মসংস্থানের বাজেট নেই। পূনর্বাসনের বাজেট নেই। এককথায় কেটে খাওয়া মানুষের জন্য কোনো বাজেট নেই। বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি কর্মকর্তাদের বেতন বৃদ্ধি হলো। তাহলে এখানে তখনই কেন শ্রমিকদের বেতন বাড়ানোর জন্য সরকার গার্মেন্টস মালিকেদেরকে তাগাদা দিলো না? সরকারি কর্মকর্তারা আর শ্রমিকেরা সবাই তো একই বাজারের কেনা পণ্য কিনে খেতে হয়। তাই না? ( পর্ব এক )
অথই নূরুল আমিন
রাজনৈতিক বিশ্লেষক কলাম লেখক ও রাষ্ট্রচিন্তক
প্রধান মুখপাত্র জাতীয় মানবসম্পদ উইং
প্রধানমন্ত্রীর মানবসম্পদ উন্নয়ন উপদেষ্টা গ্রন্থলেখক
মোহাম্মদপুর, ঢাকা – ১২০৭