শিরোনাম
সুন্দর ব্যবহার ও আচরণের বিনিময়ে জান্নাত! হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী ১১ নং ব্রাহ্মণডুরা ইউনিয়নের ৭ নং ওয়ার্ডে মেম্বার প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় আদর হোসেন সামাজিক নিরাপত্তা শক্তিশালীকরণ ও পুষ্টি সমন্বয় বিষয়ক কর্মশালা অনুষ্ঠিত বিচার, সংস্কার ও দেশ পুনর্গঠনের লক্ষ্যে তাড়াইলে এনসিপির ‘জুলাই জাগরণ’ পদযাত্রা কোরআন ও হাদিসের আলোকে ইসলামী দাওয়াত এর গুরুত্ব! হাফিজ মাছুম আহমদ দুধরচকী রেমিটেন্স যোদ্ধা ও ব্যবসায়ীর ওপর আল ফালাক রিয়েল এস্টেটের প্রতারণা ও হুমকির পাহাড়সম অভিযোগ: সংবাদ সম্মেলন ও আইনি লড়াই অব্যাহত গ্রামীণফোনের সাবেক শ্রমিকদের ১৬ বছরের আইনগত পাওনা পরিশোধের দাবিতে প্রতিবাদ সমাবেশ সাধুহাটি ফজলুল হাসান ইসলামিক একাডেমিতে মেধা প্রতিযোগিতার ফাইনাল অনুষ্ঠিত বিশ্বম্ভরপুরে ভার্ড-একশনএইড বাংলাদেশের সহযোগিতায় বিনামূল্যে চক্ষু ক্যাম্প অনুষ্ঠিত শ্রীমঙ্গলে লেপ্রসি ফলোআপে নতুন শনাক্ত ৪,চিকিৎসা শুরু
মঙ্গলবার, ২৮ জুলাই ২০২৬, ১০:১২ পূর্বাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

” শ্রী কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বিরচিত চৈতন্য চরিতামৃত “

Satyajit Das / ১৩৪৩ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শুক্রবার, ২১ জানুয়ারী, ২০২২

Manual3 Ad Code

রেখা পাঠক(প্রবাসী লেখক):

অন্তিম পর্ব:-

Manual2 Ad Code

শ্রীচৈতন্য প্রবর্তিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের ওপর ভিত্তি করে কৃষদাস কবিরাজ গোস্বামী চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থখানি সমাপ্ত করেছে। কৃষ্ণদাসের চৈতন্য চরিতামৃত শ্রীচৈতন্যের জীবনী গ্রন্থ নয়,শ্রীচৈতন্যের  ভাব দর্শনের গ্রন্থ ।

Manual7 Ad Code

কৃষ্ণদাসের চৈতন্য চরিতামৃত সম্পর্কে ডঃ দীনেশচন্দ্র সেনের মন্তব্য “শ্রীচৈতন্যের কথা প্রসঙ্গে তাঁহার ভক্তবৃন্দের বিস্তৃত পরিচয় ও বৈষ্ণব ধর্মের নানাবিধ তত্ত্বকথার বিশদ ব্যাখ্যা ইহাতে প্রদত্ত হইয়াছে।গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সমস্ত মূলতত্ত্ব ও বৃন্দাবনবাসী গোস্বামীদের রচিত যাবতীয় ভক্তিশাস্ত্রের সারাংশ  ইহাতে সুচারুরূপে সংগৃহীত হইয়াছে। এই হেতু,বাঙ্গলার বৈষ্ণবসমাজে ইহা অত্যন্ত মূল্যবান বলিয়া সমাদৃত ও বেদবেদান্তের মত সর্বজন মান্য। ইহাকে শুধুমাত্র জীবনচরিত  বা মহাকাব্য,ধর্মগ্রন্থ বা দর্শনশাস্ত্র,কাহিনী বা ইতিহাস বলা যায় না,ইহা একাধারে সবই। এই কারণে ইহাকে ‘মহাগ্রন্হ’ বলিলে. ভাল হয়। কবিত্বের সহিত দার্শনিক তত্ত্বালোচনার এমন সুন্দর ও সরস সমাবেশ আর কোন গ্রন্হে দেখিতে পাওয়া যায় না। সর্বকালজয়ী হইয়াছে।” বঙ্গভাষা ও সাহিত্য (ডঃ অসিত কুমার বন্দোপাধ্যায় সম্পাদিত),(তৃতীয় সংস্করণ,২০০২ঃ৩৭৩) শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সম্পর্কে শ্রীদেবেন্দ্রকুমার ঘোষ প্রাচীন বাঙ্গলা সাহিত্যের প্রাঞ্জল ইতিহাস (১৯৫৯ঃ২১৭) এ বলেন,”ভাবুক বৈষ্ণবদের দৃষ্টিতে ‘শ্রীচৈতন্যচিতামৃত’ ভক্তি সাধনার জীবনবেদ। চৈতন্য  জীবনরসের তথ্যাতীত সত্যস্বরূপ তাতে ভাস্বর।—লেখকের নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে তাঁর গ্রন্থ রচনার উদ্দেশ্য দুটি;-
১) শ্রীচৈতন্যের শেষ দ্বাদশ বৎসরের অন্তরঙ্গ অলৌকিক লীলারস আস্বাদনে বৃন্দাবনবাসী ভক্তজনের ভাবতৃষ্ণার চরিতার্থতা বিধান।
২) পূর্বসুরীগণের প্রদত্ত পাদপূরণ এবং সম্ভবস্থলে নতুন তথ্যলোকের  দ্বারোদঘাটন। কিন্তু
এই স্বীকারোক্তি মধ্যে ভক্তপণ্ডিতের প্রাণের বাসনাটি গুপ্ত সাধন রহ্যসের মতই অনুক্ত থেকো গেছে। অথচ ঐটুকুই চৈতনচরিত সাহিত্যের ইতিহাসে  চৈতন্যচরিতামৃতের বেদসম অতুল্য মহিমার উৎস,কেবল অধ্যাত্মরসপিপাসু ভক্তের কাছেই  নয়,তথ্যবিচারনিষ্ঠ পণ্ডিতদের কাছেও।

কৃষ্ণ দাসের রচনার সেই  শ্রেষ্ঠ মূল্য নিহিত রয়েছে  চৈতন্য  জীবন কথাকে কেন্দ্র করে বৃন্দাবনের  গোস্বামীগণের অনুমোদিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মতত্ত্বের অবিসংবাদী প্রামাণ্য প্রকটনে।-চৈতন্য জীবনাচরণে যে ধর্মবোধ সম্পূর্ণরূপে হৃদয়াবেগের মিষ্টিক অভিব্যক্তি ছাড়া আর কিছুই ছিল না,তাকেই  ইউরোপীয় Scholastic Philosopher- দের মত যুক্তি পরম্পরা ও মনস্তত্বের পদ্ধতির সাহায্যে  দার্শনিক তত্ত্বের উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিললেন কৃষ্ণ দাস। মুখ্যতঃ এই কারণেই ‘চৈতন্যচরিতামৃত’ গৌড়ীয় বৈষ্ণব দর্শনের বেদতুল্য প্রামাণ্য গ্রন্হরূপে।-কৃষ্ণ দাসের পাণ্ডিত্য যেমন গৌড়ীয় বৈষ্ণব শাস্ত্রের শিক্ষনের(Schooling) দ্বারা সঞ্জীবিত,তেমনি তাঁর প্রাণ ছিল বৈষ্ণব ভাব-বিশ্বাসে ভরপুর। যেখানে যুক্তি তথ্য,বিচার-পাণ্ডিত্যকে ছাপিয়ে সেই বিশ্বাসের ঐকান্তিকতা বারে বারে অনন্যতুলা দৃঢ় পদক্ষেপে  আত্মপ্রকাশ করেছে,সেখানেই তা বৈষ্ণব ভক্ত জনের  পক্ষে ও হয়েছে প্রাণস্পর্শী।
তাছাড়া বাংলা সাহিত্যে অ বৈষ্ণব পাঠকের কাছেও শ্রীচৈতন্যচরিতামৃতের মহিমা অতুলনীয়।এই মহাগ্রন্থ বাংলা সাহিত্যের সুমহৎ সম্পদ।-দর্শন,বিজ্ঞান, যুক্তিতর্ক প্রধান গাঢ় বদ্ধ রচনাও সাহিত্যের  শিল্পসমুন্নতির জন্য অপরিহার্য।

Manual4 Ad Code

এদিক থেকে ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত ‘ সর্বকালের  বাংলা সাহিত্যের এক অতুল্য সম্পদ।-মূল গত স্বভাবে’চৈতন্যচরিতামৃত’ কেবল একটি দার্শনিক  মহাগ্রন্হই নয়,বৈষ্ণব ধর্মশাস্ত্র ও আভ্যন্তরীণ বৈষ্ণব ভক্তি বিশ্বাস এর প্রাণ। আর বিশ্বাসের সৃজন লোকে  কবিরাজ গোস্বামী কৃষ্ণ দাস কেবল দার্শনিক বা ঐতিহাসিক পণ্ডিত ই নন,মূলতঃ এবং মুখ্যতঃ তিনি ভক্ত। তাই বৈদান্তিক সূত্রের অনুসারে দ্বৈতাদ্বৈতবাদ ও শ্রীচৈতন্যের নর লীলা মহিম( মহিমা) দেবত্বের প্রতিপাদনে যে প্রজ্ঞাভাস্বর প্রতিভা অতন্দ্র নিরলস, ভক্তির আবেগে সেই কবিরই বৈষ্ণব বিশ্বাস যত্রতত্র অবিশ্বাস্য অলৌকিক কাহিনীর অবতারণায় ব্রতী হয়েছে অকুণ্ঠ স্পষ্টতা সহকারে।চৈতন্যের প্রকটলীলার বর্ণনার আদর্শ ঐতিহাসিকের মত প্রতিপদে উৎসনির্দেশ (—————-+++) করেছেন কৃষ্ণদাস। নৈয়ায়িকের মত তর্ক করেছেনঃ-বৈদান্তিকের মত করেছেন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা।-মৌলিক বৈষ্ণব স্বভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত থেকেও বাংলা সাহিত্যের  ইতিহাসে এই মহাগ্রন্থ বাঙালির ঐতিহাসিক দার্শনিক  চেতনার এক অতীব সার্থক প্রকাশ। শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ সম্পর্কে  ভূদেব চৌধুরী বলেন, “গুরুত্বের দিক দিয়ে দেখতে গেলে চৈতন্য জীবনীর মধ্যে অদ্বিতীয় গ্রন্থ হলো কৃষ্ণ দাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’। একথা বললে অন্যায় হয় না যে,মূলতঃ কাব্য রসে তার পরিচয় নয়।সমস্ত মধ্যযুগের বাংলাসাহিত্যে যদি কোনো বিশেষ গ্রন্থকে মহৎ বলতে হয়,তাহলে তা হবে কৃষ্ণদাস কবিরাজের ‘চৈতন্যচরিতামৃত’কে। বাংলার অন্য কোনো কাব্য  বিষয়মাহাত্ম্যে অকৃত্রিমতায়,তথ্যনিষ্ঠায়,সরস প্রাঞ্জল বাক্যগুণে-দর্শনে ইতিহাস ও কাব্যের অপরূপ সমন্বয়ে এমন গৌরব অর্জন করতে পারেনি।
‘চৈতন্যচরিতামৃত’বৈষ্ণবের চক্ষে মহামূল্য গ্রন্থ হলে ও চৈতন্যের জীবনচরিত তাঁর মুখ্য প্রতিপাদ্য নয়। তাঁর মুখ্যপ্রতিপাদ্য সেই চরিতামৃত,প্রেম ও ভক্তিরসের যে বিগ্রহরূপে চৈতন্য দেব আরাধ্য সেই প্রেম ও ভক্তিস্বাদের ব্যাখ্যান।চৈতন্য জীবনী অপেক্ষা যুক্তি তর্ক দিয়ে বৈষ্ণব দর্শনের প্রতিষ্ঠাই ছিল কৃষ্ণদাস কবিরাজের লক্ষ্য।এই দুরূহ তত্ত্ব তিনি ব্যাখ্যা করেছেন দার্শনিকের মতো বা বৈজ্ঞানিকের মতো সূত্রাকারে। এই দার্শনিক বিশ্লেষণ বাংলাভাষায়  আশ্চর্যশক্তির ও পরিচায়ক। আজিকাল চিন্তাশীল  বাঙালীরাও এ গ্রন্থ থেকে ভরসা পেতে পারেন-বাংলা ভাষার শক্তি সম্পর্কে। বৈষ্ণবতত্ত্ব চৈতন্যের জীবন বর্ণনায় অদ্ভুত রকমের সত্য নিষ্ঠ।-সুগভীর রহস্যময় সেই অন্তলীলা বর্ণনা করা ও ব্যাখ্যা করা অভাবনীয় ভক্তি ও শক্তিসাপেক্ষ। এই লীলার সাক্ষী  রঘুনাথ দাস,স্বরূপ দামোদর প্রভৃতি;কৃষ্ণদাস কবিরাজ গুরুমুখে অভাবনীয় স্বার্থকতা লাভ করেছেন।”বাংলা সাহিত্যের ইতিকথা ১ম,৪র্থ সংস্করণ (১৯৬৫ঃ৩৩৬–৩৪৩)ড. ভূদেব চৌধুরী ।

বাংলা সাহিত্যের অন্যতম লেখক গোপাল হালদার, ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত’ সম্পর্কে বলেন “বাংলাদেশের পরম সৌভাগ্য যে,মধ্যযুগে কৃষ্ণদাস কবিরাজের মতো একজন দার্শনিক কবির আবির্ভাব হইয়াছিল। পাণ্ডিত্য,মনীষা,দার্শনিক ভূয়োদর্শন,রসশাস্ত্রে অগাদ অধিকার প্রভৃতি বিবেচনা করিলে কবিরাজ গোস্বামীকে মধ্যযুগের ভারতীয় সাহিত্যে ও তুলনাহীন মনে হইবে। চৈতন্য দেবের বস্তুগত তথ্যবহ ও ঐতিহাসিক ঘটনাপঞ্জী সঙ্কলন তাঁহার উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি প্রচলিত কাহিনীর পুনরাবৃত্তি না করিয়া চৈতন্য-জীবনাদর্শে,ভক্তিবাদ,দ্বৈতবাদী দার্শনিক  চিন্তার গৌড়ীয় ভাস্য এবং বৈষ্ণব  মতাদর্শকে সংহত, সুদূরাভিসারী ও মনন-নিষ্ট আকার দিয়া বাঙালী মনীষার এক উজ্জ্বলতম স্মারক চরিত্র হইয়া আছেন।

কবিরাজ শুধু দর্শনে নহে,যুক্তিশাস্রে ও পরম প্রাজ্ঞ ছিলেন। বাসুদেব সার্বভৌম ও রায় রামানন্দের সঙ্গে মহাপ্রভুর আলাপাদি বর্ণনায় তিনি যুক্তিমার্গই অবলম্বন করিয়াছেন।-মধ্যযিগের এ রূপ একজন সাধক প্রকৃতির কবি দার্শনিক বাংলাদেশে  জন্মিয়াছিলেন এইজন্য বাংলা সাহিত্য ধন্য হইয়াছে।-গদ্যভাষা ছাড়া ছন্দে দার্শনিক তত্ত্বালোচনা অতিশয় দুরূহ,আধুনিক ভাষায় প্রায় অসম্ভব বলিলেই চলে। কবিরাজ অতিশয় দুরূহ কর্মে আশাতীত সাফল্য  লাভ করিয়াছেন,ইহাতে কিছু মাত্র সংশয় নাই। তিনি বৃদ্ধাবস্থায় রোগজীর্ণ শরীরে যে-ভাবে চিন্তাত্মক গদ্যময় বিষয়কে কাব্যে রূপায়িত করিয়াছেন,তাহাতে তাঁহার অসাধারণ মনীষা,সৃজনীশক্তি ও কবিত্ব শক্তির  পরাকাষ্ঠা প্রমাণিত হইয়াছে। দুরূহ তত্ত্বকথা ব্যাখ্যার সময় তিনি যথাসম্ভব পরিমিত স্বল্পাক্ষর গাঢ় বদ্ধ বাকরীতি ব্যবহার করিয়াছেন।স্থানে স্থানে তাঁহার উক্তি প্রায় ‘সূক্তি’র আকারে বাংলা সাহিত্যে
চলিয়া গিয়াছে। এইরূপ দুই একটি উদাহরণ দেওয়া যাইতেছে-দীপ হৈতে যৈছে বহু দীপের জ্বলন।
মূল এক দীপ তাঁহা করি যে গণন।।(আদি হঃ৭৫)
মানবধর্মী তত্ত্ব কথাকেএরূপ কবিত্বের সঙ্গে পয়ার ত্রিপদীর বাঁধনে বাঁধিয়া রাখার নিপুণতা অন্যকোন বৈষ্ণব চরিতকার দেখাইতে পারেন নাই। সম্প্রদায়গত প্রভাব ছাড়িয়া দিলেও মধ্যযুগীয় বাংলাসাহিত্যে এই গ্রন্থ অবিস্মরণীয় কীর্তি বলিয়াই গণ্য হইবে-বাঙালীর মনন,দর্শন,তত্ত্বজ্ঞান ও রসবোধের এরূপ নিপ্পন পরিচয় আধুনিক যুগের গ্রন্থে ও সুলভ নহে।” বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা ১ম খণ্ড,বাংলাদেশ সংস্করণ(১৯৭৪ঃ৮১-৮৪)গোপাল হালদার।

Manual6 Ad Code

কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী বিরচিত
শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত গ্রন্থখানি গৌর-গোবিন্দ লীলা মন্দাকিনী শ্রীকৃষ্ণচৈতন্যমহাপ্রভুর সাক্ষাৎ বাগ্ময় মূর্তি। প্রবন্ধের কলেবর বৃদ্ধির আশংকায় গ্রন্থ মুকুট মণি শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত এবং লেখক কৃষ্ণ দাস কবিরাজ সম্পর্কে বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস /ইতিবৃত্তের বিদগ্ধ পণ্ডিত বৃন্দের মধ্য হতে;-
১) শ্রীতারাপদ মুখোপাধ্যায়।
২) ড. সুকুমার সেন।
৩) ড.দীনেশচন্দ্র সেন।
৪) শ্রীদেবেন্দ্র কুমার ঘোষ।
৫) ড.ভূদেব চৌধুরী।
৬) গোপাল হালদার সহ মাত্র এই ক’জন দিকপাল মনীষীর মহামূল্যবান মন্তব্য তুলেধরা হলো।
আমি অভাজনের পক্ষে শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত এবং কবিরাজ কৃষ্ণদাস গোস্বামী সম্পর্কে কোনো দু’কথা লেখার ক্ষমতা রাখি না। যে ছ’জন বিদগ্ধ পণ্ডিতের মন্তব্য তুলে ধরা হলো তাঁরা কেহই গৃহত্যাগী কিংবা  গৃহী তথাকথিত গৌড়ীয় বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত  নন। তাঁরা সম্প্রদায় মুক্ত,নিরপেক্ষ,নির্মোহ অতি উচ্চ মার্গের সাহিত্য সমালোচক।তাঁদের মননে-মানসে কৃষ্ণ দাস কবিরাজ গোস্বামী ও তাঁর কালজয়ী গ্রন্থ শ্রীশ্রীচৈতন্যচরিতামৃত সম্পর্কে যা ধরা পড়েছে,তাঁরা  তা-ই বর্ণনা করেছেন।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী প্রভু নিত্যান্দের স্বপ্নাদেশে বৃন্দাবনে গিয়ে শ্রীশ্রী মদনমোহন মন্দিরে উপস্থিত  হয়ে মদনমোহনের আদেশে শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত  লেখায় হাত দেন। তখন কৃষ্ণদাসের অনেক বয়স।
তিনি বৃদ্ধ জরাতুর। তিনি নিজেই বলেছেন-
“আমি বৃদ্ধ জরাতর।? লিখিতে কাঁপয়ে কর।।” কৃষ্ণদাস কবিরাজ  শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত গ্রন্থখানি  বৃন্দাবনে শ্রীশ্রী মদনমোহন এর আদেশ মাথায় নিয়ে
রাধা কুণ্ডের তীরে বসে গ্রন্থখানি সমাপ্ত করেন।একদিকে বৃদ্ধ জরাতুর দেহ,অন্য দিকে রাধাকুণ্ডের  একদিকে লু হাওয়া,আরেক দিকে লেখার উপকরণ তালপাতা কোথায়? সকল প্রতিকুল পরিবেশে বসে জরাগ্রস্ত দেহে কৃষ্ণ দাস লিখলেন ‘শ্রীচৈতন্যচরিতামৃত” র মতো গ্রন্থ। কৃষ্ণদাসের মত ভক্তদের পক্ষেই তা সম্ভব হয়েছিল। কৃষ্ণদাস কেমন ভক্ত ছিলেন? মহাপ্রভুর নিজের কথায়- “ধর্মচারি মধ্যে বহুত কর্মনিষ্ঠ।
কোটি কর্মনিষ্ঠ মধ্যে এক জ্ঞানী শিষ্ট।।
কোটি জ্ঞানী মধ্যে হয় একজন মুক্ত।
কোটি মুক্ত মধ্যে দুর্লভ এক কৃষ্ণভক্ত।
কৃষ্ণ ভক্ত নিষ্কাম অতএব শান্ত। ।
ভুক্তি মুক্তি সিদ্ধিকামী সকলি অশান্ত।।” চৈতন্য চরিতামৃত,মধ্যঃঊনবিংশ।
কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী ছিলেন,
“কোটি মুক্ত মধ্যে দুর্লব এক কৃষ্ণভক্ত।”
এই জন্যই তাঁর পক্ষে সম্ভব হয়েছিল পৃথিবীর  অন্যতম শ্রেষ্ঠ এবং বৈষ্ণব জগতের বেদতুল্য গ্রন্থ ‘শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত ‘ রচনা করা।
সুধী পাঠক,শ্রীশ্রী রাধাকুণ্ডের তীরে যে কুটিরে বসে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামী শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত’ রচনা করেছিলেন,সেই স্থান এখনো সেখানেই  আছেন। আমি ২০১৮ তে  রাধাকুণ্ডের তীরে কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর সেই কুটির দর্শন করার সৌভাগ্য  লাভ করি। একজন বৃদ্ধ বৈষ্ণব সেই কুটিরে থেকে ভজন করেন। বলা হয়ে থাকে যে,এই কুটিরে যে অতি প্রাচীন একটি বৃক্ষ আছেন,কৃষ্ণদাস নাকি সেই বৃক্ষের ছায়ায় বসে এই মহা গ্রন্থ শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত  লেখেছিলেন। পাশে আছেন ছয় গোস্বামীর  এক গোস্বামী গোপাল ভট্ট প্রভুর পুষ্প সমাধি।

যদি রাধাকুণ্ড  দর্শনে যান,তাহলে রাধাকুণ্ড তীরস্থ শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত’ র শ্রী চৈতন্যের বাগ্ন্ময় গ্রন্থ চক্রবর্তীর রচিতা কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর সেই কুটির খানি দর্শন করে নিজেকে ধন্য করবেন।
সনাতন ধর্মের সবেই জানেন,চার যুগের চার অবতার। কলির অবতারী হলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু। যিনি দ্বাপর যুগের ব্রজেন্দ্র নন্দন শ্রীকৃষ্ণই কেবল নন,বরং রাধা কৃষ্ণের মিলিত যুগল তনু নিয়ে কলিতে অবতারী হলেন বঙ্গদেশের নদীয়া নগরের নবদ্বীপ ধামে। ভগবান হঠাৎ করে উড়ে এসে জুড়ে বসেন না। তাঁর  আগমনের বহু পূর্বে,তাঁর আগমনী বার্তা ধ্বনিত হয়ে থাকে বিভিন্ন গ্রন্থাবলীতে। তাই তো দেখা যায়:-
শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর অবতারী হওয়ার পাঁচ হাজার বছর পূর্বে মহাভারতে,শ্রীমদ্ভাগবতে এবং আরো অনেক পুরাণে তাঁর নাম ধাম,তাঁর দ্বারা কলির যুগধর্ম হরিনাম সংকীর্তন প্রচার ইত্যাদি সবই বর্ণিত হয়েছে।

কৃষ্ণদাস তাঁর ‘শ্রী শ্রী চৈতন্য চরিতামৃত ‘গ্রন্থে সব শাস্ত্র মথিত করে তা-ই  প্রমাণ করে বলেছেন-
“নন্দন সুত বলে যারে ভাগবতে গাই।
সেই কৃষ্ণ অবতীর্ন চৈতন্য গোসাঞি।।
তিনি জানালেন-ভাগবত ভারত শাস্ত্র আগম পুরাণ।
চৈতন্য কৃষ্ণ অবতার প্রকট প্রমাণ।।আদিঃ তৃতীয়।  ব্রজের কৃষ্ণ কলিতে কেন হলেন শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য? এর উত্তর তিনি শ্রীমদ্ভাগবত হতেই দিলেন-
” কলি কালে যুগ ধর্ম নামের প্রচার।
তথি লাগি পীত বর্ণ চৈতন্য অবতার।।” আদিঃত তৃতীয়।
সমস্ত শাস্ত্র গ্রন্থ মথিত করে ইহাই প্রমাণিত যে  কলিকালে বিষ্ণু কৃষ্ণের অবতার হলেন অবতারী নদীয়ার নিমাই বিশ্বম্ভর মিশ্র শ্রীকৃষ্ণচৈতন্য মহাপ্রভু।যিনি এক দেহে রাধাকৃষ্ণের মিলিত তনু নিয়ে  অবতীর্ণ হলেন কলির সন্ধ্যায়- আজ হতে পাঁচ শত  আটত্রিশ বছর পূর্বে।কিন্তু শ্রী কৃষ্ণ যে গৌর অবতারে তাঁর ভগবত্বা আড়াল করে দীনার্থ কৃষ্ণ ভক্ত হয়ে  হরিনাম প্রচার করবেন,এ কথা ও কৃষ্ণদাস ব্রজের শ্রীকৃষ্ণের মুখ হতে বের করলেন এভাবে-
যুগ ধর্ম প্রবর্তিমু নাম সংকীর্তন।
চারিভাবে ভক্তি দিয়া নাচামু ভূবন।।
আপনি করিমু ভক্ত ভাব অঙ্গীকারে।
আপনি আচরি ভক্তি শিখাব সভারে।।
আপনে না কৈলে ধর্ম শিখান না যায়।
এই তো সিদ্ধান্ত গীতা ভাগবতে গায়।। আদিঃ তৃতীয়।শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু নিত্য,সত্য,চির সুন্দর,চির আনন্দময়,প্রেম পুরুষোত্তম। জীবের আরাধ্য। আর কৃষ্ণদাস কবিরাজ গোস্বামীর শ্রীশ্রী চৈতন্য চরিতামৃত সর্বকালের সর্বস্তরের নর-নারীর অবশ্যই  পাঠ্য।


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

Registration Form

[user_registration_form id=”154″]

বিভাগের খবর দেখুন

Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code