শিরোনাম
মানুষ মানুষের জন্য, সকলে বন্যার্ত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো উচিত…এটিএম হামিদ প্রাকৃতিক দূর্যোগে দিশেহারা সিলেট, থৈথৈ করে বাড়ছে পানি কানাইঘাটে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের দ্বায়িত্বশীলরা পানি বিশুদ্ধ করন ট্যাবলেট নিয়ে উপজেলার বন্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে বানিয়াচংয়ে বাংলা টিভি’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন সরকার বন্যার্তদের পাশে আছে ত্রাণের অভাব হবেনা— এমপি মানিক সিলেটে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ঘাটাইল উপজেলায় আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দকৃত ঘরে ফাটল ছাতকে বন্যার অবনতি,নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গোবিন্দগঞ্জে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুর্ধ১৭ এর সেমিফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত পলাশবাড়ী‌তে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা জাতীয় গােল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের শুভ উ‌দ্বোধন
মঙ্গলবার, ২৪ মে ২০২২, ০২:৪৫ পূর্বাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

সিলেট অঞ্চলের হিন্দু বিবাহের প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠান।(ভিডিও সহ)

SATYAJIT DAS / ১০১ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : বুধবার, ২ মার্চ, ২০২২

সত্যজিৎ দাস(স্টাফ রিপোর্টার):“যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম,
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব “

দ্বিতীয় পর্বঃ-

উভয়পক্ষ স্ব স্ব থালা দ্রব্যাদি জোকাড়সহ ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘে তারপর গৃহিনী নিজ থালির চাল ডানহাতে একবার ঠেলে বর/কনের মা এর থালিতে দেয়। অল্প কিছু সরিষার তেল পুষ্পথালিতে রাখা বাটিতে গৃহিণী ঢেলে দেয়। অতঃপর বর/কনের মাকে মিষ্টি, জল খাইয়ে পুষ্পথালি বর/কনের মা-র মাথায় তুলে দেয়। বর/কনের মা সোহাগ মেগে বাড়ি ফিরে উঠানে একটি পাটি বিছিয়ে সংগৃহীত চাল ঘটি দিয়ে মাপে তারপর নৃত্য করে।
১২ঃ গায়ে হলুদ : অতি সাম্প্রতিককালে গায়ে হলুদ আচারটি এ অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে চালু হয়েছে। এ অনুষ্ঠানের জন্য একটি মঞ্চ করা হয়। মঞ্চে তিনজন বসতে পারে এমন একটি সোফা বসানো হয়। মঞ্চ ও সোফা সঙ্গত কারণেই আলোক সজ্জা ও ফুল দিয়ে সাজানো হয়। লাল পেড়ে হলুদ শাড়ি পরিয়ে কনে সাজানো হয় এবং বরকেও পাজামা পাঞ্জাবী কিংবা মানানসই কোন বস্ত্র পরিয়ে সাজানো হয়। বর/কনে সোফায় এমনভাবে বসে যেন তার দু’পাশে দু’জন মানুষ বসতে পারে। সোফার সম্মুখে টিটেবিলে সাজিয়ে ফলমূল ও মিষ্টিসামগ্রী এবং বাটা কাচা হলুদ রাখা হয়। বন্ধু বান্ধবী আত্মীয় স্বজন বর/কনের পাশে বসে হাতে ফুল দিয়ে হলুদ লাগিয়ে দেয়। অতঃপর বর/বধূকে ফল ও মিষ্টি খাইয়ে দেয়। বর/কনেও সেই লোকটির মূখে ফল বা মিষ্টি তুলে দেয়। একই সাথে পাশেই এ উপলক্ষে মিউজিক বা সংগীতানুষ্ঠান পরিচালনা করা হয়। সাধারণত এ অনুষ্ঠানটি অধিবাস রাতের সন্ধ্যায় করা হয় তাই একে হলুদ সন্ধ্যাও বলা হয়। কেউ কেউ এর বদলে অনুরূপ একটি অনুষ্ঠান করে থাকেন একে বলা হয় পুষ্প চন্দন বা চন্দন সন্ধ্যা। এক্ষেত্রে হলুদের পরিবর্তে চন্দন ব্যবহার করা হয়।

১৩ঃ অধিবাসের টিকা দেওয়া : অধিবাসের টিকা (টিপ/ ফোঁটা) বর/কনেকে একই নিয়মে দেয়া হয়। টিকার জন্য আগেই সুন্দা, মেথি বাটতে হয়। সুন্দা মাগা, সুন্দা পিশা সম্পর্কে পূর্বে বর্ণনা করা হয়েছে। অধিবাসের আনুষ্ঠানিকতা শেষরাতে শুরু করা হয়। তার আগে বর/কনের মা আয়োদের সাথে নিয়ে গীত-বাদ্যসহ পাঁচ ঘরে সুন্দা মাগে। শুভলগ্নে অধিবাসকালে অধিবাসের ঘট বসানো হয়। বর/কনে পূর্বমুখ করে বসানো হয়। তার সন্মুখে রাখা হয় ঘট এবং বিভিন্ন মিষ্টি সামগ্রীসহ দই, দুধ, চিড়া, খই, বাটা সুন্দা-মেথি, ধান, দূর্বা প্রভৃতি । পুরোহিত প্রথমে পান পাতায় রাখা সুন্দা-মেথি দিয়ে অধিবাসের ফোঁটা দেন, তারপর ধান, দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন, শেষে মিষ্টি সামগ্রীর খানিকটা খাইয়ে দেন। অনুরূপভাবে জেঠা-জেঠি, বাবা-মা, কাকা-কাকী, পিশা-পিশি, মেসো-মাসীসহ উপস্থিত সকল গুরুজনসহ কনিষ্ট ভাই বোনও বর/কনেকে অধিবাসের ফোঁটা দেয়। এক এক জনের ফোঁটাদান কার্য শেষ হলে বর/কনে বড়দের প্রণাম করে আর ছোটরা বর/কনেকে প্রণাম করে। অধিবাসের সবটুকু রাত মহিলারা ব্যান্ড পার্টির বাদ্যের তালে তালে ধামাইল গান গেয়ে কাটায়। তবে ভোর রাতে বিচ্ছেদ ও মিলন গাওয়া হয়। ব্যান্ডপার্টি বা বিবাহে বাদ্যানুষ্ঠান সম্পর্কে বলা যায়, ব্যান্ডপার্টি বা বিবাহে বাদ্যানুষ্ঠান একটি প্রাচীন প্রথা। শাস্ত্রে বলা হয়েছে, ‘ভূষণ, বস্ত্র্র, ভোজ্যদ্রব্য দিয়ে সম্মান প্রদর্শন করে বাদ্যাদি উৎসবের মধ্যে কন্যা প্রদান করে পিতা নিত্য স্বর্গপ্রাপ্ত হন’।

মৎস্যপুরাণে বলা হয়েছে, ‘বিদ্বান ব্যক্তি অমঙ্গলের বিনাশ ও ঋদ্ধির জন্য বিবাহের সময় মাঙ্গল্য বাদ্যের ধ্বনি, বেদ পাঠ ও গান করাবে’। এই প্রাচীন প্রথা মেনে আজও বিবাহে বাদ্যানুষ্ঠান করানো হয়।
১৪ঃ খাওয়া (দই-চিড়া) : অধিবাসের ফোঁটার কার্যক্রম শেষে অধিবাস স্থলেই একটি থালায় দই, চিড়া-মুড়ি বাবার সাথে কনে/মা-র সাথে বর খায়।
১৫ঃ শোয়া/ঘুমানো: দই, চিড়া খাওয়ার পর এই স্থানে শোয়েই তারা বাকি রাতটুকু কাটায়। বরকে তখন একাকী থাকতে দেয়া হয় না, মা-বাবা থাকতে না পারলে ভাই- বোন যে কেউ একজনকে বর/কনের সাথে থাকতে হয়। অতঃপর ঊষাকালে মা স্নান সেরে ঘাটনি দেয়।
১৬ঃ ঘাটনি (প্রদীপ ভাসানো ও জল ভরে আনা) : বর/কনের মা ঘাটনি দিতে জলাশয়ে যাবে। স্নান সেরে দু’টি ডুঙার (কলা গাছের খোল দিয়ে তৈরি) একটিতে ১০টি ঘি মাখা সলতা, অন্যটিতে ৫টি ঘি মাখা সলতা রেখে সিঁন্দুর ও চন্দনের ফোঁটা দেয়। (কেউ কেউ বরের জন্য ৭টি সলতা চন্দন মেখে এবং কনের জন্য ৭টি সলতা সিঁদুর রাঙিয়ে রাখে এবং এতেও সকলে টিকা দেয়।) দু’টির সলতা জ্বেলে বর ও কনের নাম ধরে, বরের প্রদীপ ডানহাতে আর কনের প্রদীপ বামহাতে ধরে একসাথে একই সমান্তরালে রেখে জলে ভাসিয়ে প্রণাম করে। ধারণা করা হয় প্রদীপ দু’টি যদি একসাথে একই সমান্তরালে ভাসে তবে বর-কনের মধ্যে মিল হবে। আবার যদি আলাদা হয়ে দূরত্ব সৃষ্টি করে ভাসে তবে বর-কনের মধ্যে মিল হবে না। সবশেষে জলভরে পিছন দিকে না তাকিয়ে মা জল নিয়ে আসে, যে জল দিয়ে দিনের বেলায় বর/কনেকে স্নান করানো হয়।

১৭ঃ আভ্যদিক : বিয়ে একটি শুভকর্ম, এর মাধ্যমে দু’টি প্রাণ, দু’টি জীবন একসাথে অতিবাহিত করে। বিয়ের মাধ্যমে যেন তাদের অভ্যুদয় বা সমৃদ্ধি আসে তাই সকল আত্মীয় স্বজন থেকে যেমন আশীর্বাদ কাম্য তেমনি মৃত পূর্বপুরুষেরও আশীর্বাদ আবশ্যক । তাই পূর্বপুরুষদের সন্তুষ্টির জন্য তাদের উদ্দেশ্যে যে শ্রাদ্ধ করা হয় তাকে বলা হয় আভ্যুদয়িক শ্রাদ্ধ । সিলেট অঞ্চলে একে বলা হয় আভ্যদিক। আবার একে বৃদ্ধি শ্রাদ্ধ, নান্দীমুখ শ্রাদ্ধ প্রভৃতিও বলা হয়। ব্রহ্মপুরাণে ‘নান্দী’ শব্দের অর্থ সমৃদ্ধি, কল্যাণ বা উন্নতি বলা হয়েছে। তাই সমৃদ্ধি, কল্যাণ বা উন্নতি যার মুখ বা উদ্দেশ্য তাকেই নান্দীমুখ বলা হয়েছে। বর/কনে স্নান সেরে নতুন বস্ত্র পরিধান করে এই শ্রাদ্ধবাসরে গিয়ে প্রথমে পূর্বপুরুষদের উদ্দেশ্যে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে তারপর ব্রাহ্মণ ও গুরুজনদের প্রণাম করে।
১৮ঃ ষোড়শ মাতৃকার ঘট বসানো : আভ্যদিকের ব্যাপারকালে কালীর ঘট বসিয়ে পূজা করার ন্যায় ষোড়শ মাতৃকার ঘট বসিয়েও পূজা করা হয়।

বরযাত্রা : যাত্রাকালে বরকে সাজিয়ে পূর্বদিকে মুখ করে একটি পিঁড়িতে বসানো হয়। সম্মুখে আম্র পল্লবসমেত একটি ঘট বসানো হয়। পুরোহিত প্রথমে মন্ত্র পড়ে আশীর্বাদ করেন,শান্তিজল ছিটিয়ে দেন। মুরব্বীরা আশীর্বাদ দেওয়ার পর পুরোহিত উচ্চারিত যাত্রা মন্ত্রের সহিত পুরোহিতের নির্দেশনা অনুযায়ী বর যাত্রা শুরু করে। পুরোহিতের অনুপস্থিতিতে পরিবারের জ্যেষ্ঠ কোন পুরুষ মানুষ এই দায়িত্ব পালন করে থাকে।

কনে বাড়িতে আপ্যায়ন : বিয়ে বাড়িতে পৌঁছালেই বাড়িতে উঠা যাবে না যতক্ষণ না বিয়ে বাড়ির মুরব্বীদের পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। বর ব্যতীত অন্যান্য সকলেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ওদের সঙ্গে বিবাহ বাসরে যাবে, নচেৎ নয়। বরকে নিয়ে যাওয়ার অনুমতি পেলেই বর এগুবে। কনের ছোট ভাই-বোন, বৌদি সকলে গেইট ধরে, বাড়ির বাইরে আটকে বসিয়ে আপ্যায়ন করে, কূট আপ্যায়ন; দুধ, সরবতের সাথে চুনের জল, নুনের জল প্রভৃতি অপানীয়ও পরিবেশন করে আবার গেইটের জন্য টাকাও দাবী করে। বর তাদের বায়না মিটালেই বিবাহ বাসরে যাওয়ার অনুমতি পায়। বিবাহ বাসরে বরকে মিষ্টি, দুধ, সরবত প্রভৃতি দিয়ে বিশেষভাবে আপ্যায়ন করা হয়। অপরাপর বৈরাতিদেরও মিষ্টি খাওয়ানো হয়।
১৯ঃ জামাইবরণ : নতুন বরকে বরণের আগে কনের জ্যেষ্ঠ ভগ্নীপতিকে ঐ স্থানে বসিয়ে পুরোহিতের পরিচালনায় মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে কনের পিতা বা যিনি কনে সম্প্রদান করবেন সেই অভিভাবক কর্তৃক কিছু কাপড়-চোপড় উপহার দিয়ে থাকেন একে জামাইবরণ বলা হয়।
২০ঃ বরণা/বরবরণ : কনের পিতা কিংবা কনের যে অভিভাবক কনে সম্প্রদান করবেন তিনি, এক কথায়- কন্যাকর্তা পূর্বমুখী বসে; বরকে পশ্চিমদিকে মুখ করে বরাসনে বসিয়ে মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে অর্ঘ্য, আচমনীয়, চন্দন, পুষ্প, বস্ত্র এবং অলঙ্কার দিয়ে অর্চনা করেন। দূর্বা ও আতপ চালের সঙ্গে বরের দক্ষিণ জানু ধরে মাস, পক্ষ, তিথি প্রভৃতির উল্লেখ করে উভয় পক্ষের তিন পুরুষের নাম, গোত্র ও প্রবরের উল্লেখ করে ‘অমুকী কন্যাকে বিয়ে করার জন্য তোমাকে অর্চনা করে বরণ করছি’ এই কথা বলে বরকে বরণ করেন। এ সময় বরের হাতে বরের যাবতীয় পোশাক পরিচ্ছদ তুলে দেন। এই পোশাক-পরিচ্ছদ পরিধান করে বর বিয়ের সকল অনুষ্ঠান সম্পন্ন করেন। এই আচারকে বরণা বলা হয়। বর কন্যাকর্তা প্রদত্ত পোশাক-পরিচ্ছদ ও মুকুট (টোপর) পরে দধিমঙ্গলে গমন করে।

২১ঃ দধিমঙ্গল : দই,খই,সাতনাল সুতা,সাতকুটি (সাতটি ছোট টুকরো করা) পান, সাতকুটি সুপারি একটি বরণ ডালায় নিয়ে ধান-দূর্বা দিবে। বিয়ের কুঞ্জে উঠার আগে বর ঘরের দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে পিছন ফিরে দাঁড়াবে। শাশুড়ি জল ও বরণডালা নিয়ে আসবে, বর ও শাশুড়ির মধ্যে একটি চওড়া কাপড় দিয়ে একে অপরকে আড়াল করে রাখবে। কোন একজন সুতা নিয়ে বরের আপাদ মস্তক দৈর্ঘ্য বরাবর সমান করে সাতবার সুতা প্যাঁচিয়ে সাতনাল সুতা নিবে। তারপর এই সুতা দিয়ে মুকুটের মধ্য বরাবর প্যাঁচিয়ে বেঁধে দিবে। এ অবস্থায় বরের বা হাত পিছন দিকে এগিয়ে দিবে। শাশুড়ি বরের হাতটি জল দিয়ে ধোয়ে দই, খই প্রভৃতি হাতে দিবেন। পরে আবার ধোয়ে হাত মুছে দিয়ে হাতের অনামিকায় অষ্টধাতুর তৈরি দধিমঙ্গলের আংটি পরিয়ে দিবেন। শাশুড়ি যে প্রক্রিয়ায় বরকে বরণ করেন তার উদ্দেশ্য হল বশীকরণ অর্থাৎ জামাই বাবাজীবন যেন চিরকাল তার মেয়ের গোলাম হয়ে থাকে।
২২ঃ বিবাহের কুঞ্জ : প্রায় ছয় ফুট ব্যাস বিশিষ্ট একটি বৃত্তের পরিধির সমান দূরত্ব আটটি কলাগাছ পূঁতে বিবাহের কুঞ্জ নির্মাণ করা হয়। পূর্ব বা উত্তরদিকের দু’টি করে গাছের ফাঁকা স্থান প্রবেশ বা বাহির স্থান হিসেবে রেখে বাকিটুকু সুতা, মালা, ফুল, কাগজ, বাঁশের চটি প্রভৃতি দিয়ে অলঙ্করণ ও বেষ্টন করে কুঞ্জ তৈরি করা হয়। কুঞ্জের মেজে লেপা-মোছা করে আল্পনা দিয়ে অলঙ্করণ করা হয়। দধিমঙ্গল শেষে বর কুঞ্জে আসবে তাই কুঞ্জের ভিতর মধ্যবর্তী স্থানে একটি পাটি ও বিছানার চাদর বিছিয়ে এর উপর বর বসার হাতলযুক্ত একটি চেয়ার রাখা হয়। চেয়ারটি উপর অনুরূপ আর একটি চাদর দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। মুখচন্দ্রিকার বিয়ের পর কুঞ্জের মেজে পরিস্কার করে আবার লেপা-মোছা করে এখানেই বিবাহ-হোম বা কুশণ্ডিকা সম্পন্ন করা হয় এবং এই কুঞ্জেই পরবর্তী দিন বাসী বিয়ে হয়।

২৩ঃ জামাইয়ের কুঞ্জে বসা : বর/বধূ পূর্ব বা উত্তরদিকে কুঞ্জে প্রবেশ করে পূর্বমুখী হয়ে চেয়ারে বসবে। দধিমঙ্গল থেকে শুরু করে মুখচন্দ্রিকার বিবাহ সমাপ্ত না হওয়া পর্যন্ত বরকে একটি খোলা ছাতার নিচে রাখা হয়। ভগ্নীপতি/ ভাগিনা এরাই ছাতা ধরে।
২৪ঃ কনে যাত্রা ও কনের কুঞ্জে আগমন : কনের মা ধানের মচায় (খড় দিয়ে বানানো পুঁটুলি যার ভিতরে ধান রাখা হয়।) কিংবা পাথুর (পাথরের থালা) উপুড় করে বিয়ের সাজে সাজানো কনেকে কোলে নিয়ে তার উপর বসেন। উল্লেখ করা আবশ্যক যে, কনে সাজানোর সময় কনের কপালে কপালিকা (চূড়া) বেঁধে দেওয়া হয়। পুরোহিত মন্ত্র পড়ে কনের মাথায় ধান-দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন, কনেকে মিষ্টিমুখ করান ও শান্তি জল ছিটিয়ে দেন। কনে তার সম্মুখে রাখা পাত্র থেকে ডানহাত বাম দিকে এবং বামহাত ডান দিকে নিয়ে (ক্রস হাতে) দুই মুষ্টি ধান নিয়ে ডানহাতের ধান বাবার উঘারে (গোলায়) ছুড়ে ফেলে দেয়। আর বামহাতের মুষ্টির ধান শ্বশুড় বাড়ির জন্য তার কাপড়ের খুঁটে বেঁধে দেয়া হয়। এই অবস্থায় কনে মুখচন্দ্রিকার বিবাহ তথা সাতপাকের উদ্দেশ্যে কুঞ্জে গমন করে।

২৫ঃ কুঞ্জে উঠা : কনে নিয়ে কুঞ্জে প্রবেশ করেন সাধারণত কনের ভ্রাতৃবধূ, তারা একাধিকও হতে পারেন। তাদের সহায়তা ও নির্দেশনাতেই মূলতঃ মুখচন্দ্রিকার বিয়ের সকল কাজ সম্পন্ন হয়। ভ্রাতৃবধূ ছাড়া বর ও কনের দু’জন কনিষ্ট ভাই দু’পক্ষের দু’টি চাটা-পাতিল (ঘি এর প্রদীপ) ধারণ করে বিয়ের পূর্ণ সময় কুঞ্জে অবস্থান করে।
কনে/বর উভয় পক্ষের চাটা-পাতিল (ঘিয়ের প্রদীপ) বিবাহ-হোম বা যজ্ঞসহ সকল মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে এই প্রদীপদ্বয় জ্বালানো থাকে। এই প্রদীপদ্বয় কনের সাথে শ্বশুড় বাড়িতে পাঠানো হয়।
২৬ঃ বর-কনে বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ : বরপক্ষ বিয়ে বাড়িতে উপস্থিত হলেই বিয়ের আসরে বর-কনে বিষয়ক পত্রিকা প্রকাশ করা হত । একে ‘পত্রিকা’ বা ‘উপহার’ বলা হত। এতে বর বা কনের উদ্দেশ্যে পদ্য থাকত। লেখক হিসেবে উল্লেখ থাকত ঠাকু’মা-ঠাকুরদা’, দাদু-দিদি মা, মা-বাবা, ভাই-বোন, ভগ্নিপতি, বন্ধু-বান্ধব, ভাই পো- ভাই ঝি, ভাগিনা-ভাগিনী প্রভৃতি। ৩৫-৪০ বছর আগেও এর প্রচলন ছিল,বর্তমানে নেই।
২৭ঃ মুখ চন্দ্রিকার বিয়ে : বরের ভাই এবং কনের ভাই দু’জনে চাটা (ঘি এর প্রদীপ) ধরবে। প্রতি পাক (প্রদক্ষিণ) শেষে কনে বরের মুখোমুখি হলে সুন্দর মুদ্রায় হাত দু’টি কাঁপিয়ে ফুল/ ফুলের পাপড়ি, আবির প্রভৃতি বরের চরণে ছড়িয়ে দিয়ে প্রণাম করবে। ছয় পাক শেষে ধুতুরা কাটাইল বদল এবং সাতপাক শেষে মালা বদল করবে। তারপর একে অপরে নিরীক্ষণ (শুভদৃষ্টি) করলে মুখ চন্দ্রিকার বিয়ে শেষ হবে। এবারে এখানেই মামা শ্বশুড় কর্তৃক কনের হাতে কলা তুলে দিবেন। বরের মাতৃকুল থেকে এই একটি আচারই পালন করা হয়। ফল সাদৃশ্যে এক কাঁদি কলা বধূর হাতে তুলে দেওয়ার মাধ্যমে এক ঝাঁক পুত্র সন্তান কামনা।

২৮ঃ যজ্ঞ/বিবাহ-হোম বা কুশণ্ডিকা :
মুখচন্দ্রিকার বিবাহের পরে কুঞ্জের ভিতরেই এই অনুষ্ঠানটি নিষ্পন্ন হয়। তবে তার আগে সম্পদানদাতা মন্ত্র পাঠের মাধ্যমে বরের নিকট কনে বিধিমত সম্প্রদান করেন। বিবাহ অনুষ্ঠানে বরের হাতে কনেকে যে আচার অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সম্প্রদান করা হয় তাকে কন্যাদান বলে। তারপর যজ্ঞের কাজ সম্পন্ন করা হয়।
বৈদিক যুগের সূচনায় বিবাহের বিশেষ কোন আচার-অনুষ্ঠান ছিল না। পরস্পর শপথ গ্রহণের মাধ্যমেই বিবাহকার্য সম্পন্ন হত (ঋগ্বেদ, ১০ম মণ্ডল, ৮৫ স্তোত্র)। বিবাহে আচার-অনুষ্ঠানের বাহুল্যের উদ্ভব হয় অথর্ববেদ ও গৃহ্যসূত্রসমূহের যুগে। অথর্ববেদে বলা হয়েছে যে কন্যাকে নীল ও লাল শাড়ি পরিয়ে ও ঘোমটা দিয়ে বিবাহের স্থানে নিয়ে আসা চাই। বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হওয়ার পূর্বে বর যেন কন্যার মুখ না দেখে। অনুষ্ঠানের মধ্যে ঋগ্বেদের যুগের শপথ গ্রহণই বলবৎ ছিল; তবে মন্ত্র, যজ্ঞ/বিবাহ-হোম বা কুশণ্ডিকা ও কন্যাকে একখণ্ড পাথরের উপর দাঁড় করানো (শিলারোহণ) ইত্যাদি অনুষ্ঠান প্রচলিত হয়। আনুষ্ঠানিক বাহুল্য বিশেষভাবে বর্ধিত হয় গৃহ্যসূত্রসমূহের যুগে। এ যুগেই বিবাহের শুভকাল ও সুলক্ষণযুক্ত কন্যা নির্বাচন সম্বন্ধে বিধান দেওয়া হয়।

গৃহ্যসূত্রসমূহ সকলেই বিবাহ সম্পাদনের জন্য যে সকল বিধান দিয়েছেন তা হচ্ছে-
১.বিবাহ যজ্ঞাগ্নি: বিবাহ যজ্ঞাগ্নির সম্মুখে সম্পাদিত হতে হবে ।
২. লাজহোম: ‘লাজ’ শব্দের অর্থ খই। ধান থেকে খই করে হোম করা হয় বলে এই হোমকে লাজহোম বলে। এই অনুষ্ঠানে কনের কনিষ্ট ভাই লাজ বা খই ভাগ করে দেয় এবং এই হোম শুধুমাত্র বিবাহ অনুষ্ঠানে কনের দ্বারাই অনুষ্ঠিত হয়। এই কাজের জন্য শালাকে বর কর্তৃক শালা বরণ (পোশাক) দিতে হয়। লাজ হোমের অগ্নির উত্তরে একখানা শিল এবং তার উপরে একটি নোড়া রাখা হয়। হোমের পর বর তার ডান পা দিয়ে বধূর ডান পা ঠেলে দিলে বধূ শিলের উপর আরোহণ করবে এবং তখন বর মন্ত্র উচ্চারণ করবে এই আচারটিকে শিলারোহণ বলে।
লাজ হোমের পর বর পশ্চিমমুখ হয়ে পূর্বমুখী কনের ডানহাত নিজের ডানহাতের উপর গ্রহণ করে মন্ত্র বলবেন এই আচারকে হস্তগ্রহণ বলে। ঋগ্বেদের এই মন্ত্রের (১০/৮৫/৩৬) অনুবাদগত অর্থ: (বর বলছেন) ‘হে নারী, আমাদের উভয়ের সৌভাগ্যের উদ্দেশ্যে আমি তোমার হস্তগ্রহণ করছি, তুমি আমার সঙ্গে অন্তিম বয়স পর্যন্ত সর্বসৌভাগ্য ভোগ করো। আর তুমি আমার গৃহের স্বামিনী হবে। ‌এ কারণে, ভগ, অর্যমা, সবিতা এবং পুষা দেব তোমাকে আমার হস্তে প্রদান করলেন’।

৩. সপ্তপদীগমন: হোমের অগ্নির উত্তরে পিঁটুলি দিয়ে একটি ছোট গোলাকৃতি মণ্ডল আঁকা হয়। তার পূর্বে আর একটি, তার পূর্বে আরও একটি; এইভাবে মোট সাতটি গোলাকৃতি মণ্ডল আঁকা থাকে। বধূ পশ্চিমের শেষ মণ্ডলে দাঁড়াবে, বর তার পিছনে দাঁড়াবে। বধূর ডান পা সব সময় আগে থাকবে, বাম পা পিছনে থাকবে। বর তার ডান পা দিয়ে বধূর ডান পা প্রথম মণ্ডলের উপর ঠেলে দিবে, এভাবে সপ্তপদ বা সাতবার পা এগিয়ে যাবে। প্রতি পদেই একটি করে মন্ত্র বলতে হবে। এই সপ্তমপদ গমনের পরই নারীর স্বগোত্র অর্থাৎ পিতৃগোত্র নিবৃত্তি হয়।
৪. পানিগ্রহণ: এই অনুষ্ঠানে বর তার ডানহাত কনের বুকের ওপর রেখে বলবে, ‘তোমার হৃদয় যেন আমার হৃদয় হয়, তোমার মন যেন আমার মন হয়, তুমি একমন চিত্তে যেন আমার আদেশ অনুসরণ কর, তুমি যেন আমাকে ও আমার সহচরদের অনুসরণ কর’।
৫. উপরতি বা পরিহার অনুষ্ঠান উদযাপন:
বিবাহ পরবর্তী পর পর তিন রাত্রি স্বামী-স্ত্রী উভয়েই মেঝের ওপর শয়ন করবে ও যৌন সংসর্গ পরিহার করবে। তিনদিন উত্তীর্ণ হওয়ার পর, তারা যৌন মিলন নিষ্পন্ন করবে। পরবর্তীকালে উল্লেখিত আচার-অনুষ্ঠান মনুসংহিতায় অন্তর্ভুক্ত হলে মনুর বিধান ভারতবর্ষের সকল প্রদেশ ও অঞ্চলের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের বিবাহে শাস্ত্রীয় অনুষ্ঠান হিসেবে গণ্য হয়। তাই উত্তরকালের নিষ্ঠাবান হিন্দুসমাজের বিবাহে এর সাদৃশ্য খুঁজে পাওয়া যায়। সিলেট অঞ্চলের বিবাহেও এর ব্যতিক্রম হয় না।
(ক) পাশা খেলা : মুখ চন্দ্রিকার বিয়ে ও যজ্ঞ শেষে ঘরের ভিতরে একটি পাটিতে বর-কনে বসানো হয়। কনের বৌদি, ছোট বোন, বান্ধবী সহযোগে শুরু হয় পাশা খেলা। পুরোহিতের পরিচালনায় খেলাটি সম্পন্ন হয়।
(খ) খেলায় উপকরণ : সরাসহ (ঢাকনা) একটি আইহাঁড়ি, ধান, ২১টি কড়ি, কাচা হলুদ, সোনার আংটি ও রূপার আংটি।
(গ) খেলায় করণীয় : (১) বর কড়িগুলো হাতের তালুতে নিয়েই করজোড়ে প্রণাম করে বধূর হাতে দিবে। বধূও অনুরূপভাবে প্রণাম করে পুনরায় বরের হাতে দিবে। এভাবে সাতবার কড়ি আদান প্রদান করবে।
(২) বর কড়ি বামহাতে কড়ি চালনা করবে। তারপর বামহাতেই কড়ি তোলে বধূর হাতে দিবে, বধূ ডানহাতে কড়ি গ্রহণ করে কড়ি চালনা করবে। তবে ডানহাতে কড়ি তোলে বরের হাতে দিবে এভাবে উভয় সাতবার করে কড়ি চালনা করবে। ৭টি, ৫টি কিংবা ১০টি কড়ি যদি চিৎ অবস্থায় থাকে তবে একদান বলা হয়। যার দান বেশি সে-ই জয়ী।
(৩) অনেক জায়গায় খেলা শেষে কড়িগুলো জড় করার এক সুযোগে কড়িসহ পরাজিত বরের হাত একটি নোড়া দিয়ে চেপে ধরা হয়। বধূর জন্য কোন যৌতুকের প্রতিশ্রুতি না পাওয়া পর্যন্ত বরকে মুক্তি দেওয়া হয় না।
(৪) বর এবার আইহাঁড়িটি ধান দিয়ে পরিপূর্ণভাবে ভর্তি করে উপরে কড়িগুলো রাখে। এরপর বামহাতের তর্জনী, কনিষ্ঠা ও বৃদ্ধাঙ্গুলি সহযোগে সরাটি ধরে সরা দিয়ে হাঁড়িটি ঢেকে রাখে। অনুরূপভাবে বধূর ডানহাতের তিনটি আঙ্গুল দিয়ে সরাটি ধরে যতটা সম্ভব ধান ও কড়ি ফেলে দেয়। বর আবার হাঁড়িতে ধান ভর্তি করে,গুণে গুণে কড়ি উঠায়, যথারীতি সরা দিয়ে ঢাকে আর বধূও যথারীতি সরাটি ধরে ধান ও কড়ি কেটে ফেলে। এই কাজটি এইভাবে সাতবার চলে।
(৫) বর পূর্বের ন্যায় হাঁড়িতে ধান ভরে তার উপরে কড়ি, কাচা হলুদ, সোনা ও রূপার আংটি রেখে সরা দিয়ে ঢেকে নিবে। এবার ঢাকনা খানিকটা আলগা করে বধূকে দেখিয়ে বলবে, ‘দেখ, এখানে সোনা, রূপা, অর্থ কড়ি, মণি, মুক্তা আছে। (বর) এইসব এনে তোমার নিকট দিলে তুমি তা যত্ন করে রাখবে।‘ বধূ রাখার সম্মতি দিবে।

চলবে…………………


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

Registration Form

[user_registration_form id=”154″]

পুরাতন সংবাদ দেখুন

সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র শনি রবি
 
১০১১১২১৩
১৪১৫১৬১৭১৮১৯২০
২১২২২৩২৪২৫২৬২৭
২৮২৯৩০৩১  

বিভাগের খবর দেখুন