সত্যজিৎ দাস:
বাংলাদেশ বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত F-7 সিরিজের যুদ্ধবিমান নিয়ে সম্প্রতি নানা ভুল ধারণা ছড়িয়েছে। বিশেষ করে ৫০-৬০ বছর পুরনো একটি বিমান বলে সমালোচনা করা হচ্ছে,যা প্রযুক্তিগত দিক থেকে আংশিক হলেও ভুল। এছাড়া সাম্প্রতিক মাইলস্টোন স্কুলের কাছে ঘটে যাওয়া বিমান দুর্ঘটনায় নিহত পাইলটের সাহসিকতা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে অনেক অপপ্রচার হচ্ছে।
এই বিষয়গুলো নিয়ে সাবেক স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) সাদরুল আহমেদ খান পরিষ্কার ভাষায় বলেছেন,যুদ্ধবিমান ও পাইলটকে ভুলভাবে বিচার করা উচিত নয়।
স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) সাদরুল বলেন,যুদ্ধবিমান F-7 নিয়ে আলোচনা করতে গেলে দু’টি বিষয় মাথায় রাখতে হবে—মডেল ও ভার্সন। বাংলাদেশ বিমানবাহিনী প্রথম F-7 মডেল ব্যবহার শুরু করে ১৯৮০-এর দশকে,তখন ব্যবহৃত ভার্সন ছিল F-7M। পরবর্তীতে প্রযুক্তিগত উন্নতির ফলে F-7MB ভার্সন আসে,যেগুলো পরবর্তী সময়ে ফেইজ আউট করা হয়।
এরপর বহরে যুক্ত হয় আরও আধুনিক সংস্করণ F-7BG ও F-7BG1। বিশেষ করে F-7BG1 ভার্সনটি ২০১৩ সালে যোগ দেয়,যা কোনো পুরাতন মডেল নয়,বরং আধুনিক প্রযুক্তিতে তৈরি একটি যুদ্ধবিমান।
তিনি উদাহরণ দেন,“ধরুন কেউ বলে আপনার iPhone পুরোনো,অথচ আপনার iPhone ১৫ প্রো ম্যাক্স। তাহলে বলা যায়,ফোনের আসল বয়স সেটা নয়। একইভাবে F-7BG1 ভার্সনটি মাত্র এক দশকের পুরোনো,তাই এটিকে পুরোনো বলে ডাকা সঠিক নয়।”
মাইলস্টোন স্কুল সংলগ্ন দুর্ঘটনায় নিহত পাইলটের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে স্কোয়াড্রন লিডার (অব.) সাদরুল বলেন,“অনেকে তদন্ত শেষ হওয়ার আগেই পাইলটকে দোষারোপ করছেন,যা দুঃখজনক।”
তিনি আরও বলেন,“পাইলট যুদ্ধবিমান চালাচ্ছিলেন,যা সাধারণ যানবাহন নয়,এটির গতি সেকেন্ডে প্রায় এক কিলোমিটার। বিমান যদি ত্রুটিগ্রস্ত হয়,তা মুহূর্তেই বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।”
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী,পাইলট ইজেক্ট করতে পারতেন,কিন্তু তিনি নিজের জীবন বাঁচানোর বদলে চেষ্টা করেছেন বিমানটি নিয়ন্ত্রণে রাখতে,যেন এটি জনবহুল এলাকা থেকে দূরে পড়ে। হয়তো এজন্য তিনি স্কুল মাঠকে বেছে নিয়েছিলেন।
স্কোয়াড্রন লিডার বলেন,“পাইলট বাঁচার চেষ্টা করছিলেন,কিন্তু পাশাপাশি তিনি সময় পেয়েই চেষ্টা করেছেন জনবহুল এলাকা এড়িয়ে যেতে। এই কঠিন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষের মত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ নয়।”
সাদরুল আহ্বান জানিয়ে বলেন,“সোফায় বসে বিশ্লেষণ করা সহজ,কিন্তু আকাশে একা যুদ্ধবিমান নিয়ে যেসব সিদ্ধান্ত নিতে হয় তা একদমই সহজ নয়।”
তিনি বলেন,“পাইলট ও গ্রাউন্ড ক্রু সবাই অত্যন্ত প্রশিক্ষিত ও দায়িত্বশীল। দুর্ঘটনার সঠিক কারণ তদন্তের পর জানা যাবে,তবে অনুমান করে পাইলটের দক্ষতা প্রশ্নবিদ্ধ করা অন্যায়।”
F-7BG1 যুদ্ধবিমান নিয়ে ভুল ধারণা থেকে সরাসরি সমালোচনায় না গিয়ে,সঠিক তথ্য জানা এবং পাইলটের সাহস ও দায়িত্ববোধকে সম্মান করা সময়ের দাবি। সামরিক প্রযুক্তি যেমন উন্নত হচ্ছে,তেমনি মানুষের মানবিকতা ও বীরত্বকেও সম্মান দিতে হবে।
আমাদের উচিত নির্দিষ্ট তথ্য ও বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আলোচনা করা,যাতে একদিকে প্রযুক্তির সঠিক ধারণা গড়ে ওঠে এবং অন্যদিকে পাইলট ও বাহিনীর প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা ও সম্মান বজায় থাকে।
সিলেট নিউজ/এসডি.