নূর হোসাইন:
চেয়ারম্যান, জিগীষা মানবিক পার্টি ও জিগীষা মানবিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন।
আজকের সমাজে দিকে দিকে প্রতিশোধের এক দাউ দাউ আগুন জ্বলছে। সামান্য মতপার্থক্য, রাজনৈতিক কোন্দল কিংবা সামাজিক দ্বন্দ্বের জের ধরে মানুষ আজ একে অপরের রক্তপিপাসু হয়ে উঠছে। প্রতিহিংসার এই বহ্নিশিখা কেবল ব্যক্তি জীবনকেই ছারখার করছে না, বরং সমগ্র সমাজব্যবস্থাকে এক চরম অস্থিতিশীলতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এই হিংসাত্মক বৃত্ত থেকে যদি আমরা বের হয়ে আসতে না পারি, তবে মানবতা, শান্তি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠা করা কখনোই সম্ভব হবে না। শান্তি চাইলে সবার আগে আমাদের হৃদয়ে ক্ষমার প্রদীপ জ্বালাতে হবে।
সাম্প্রতিক একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আমাকে এই উপলব্ধির মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছিল। আমার সহধর্মিনীকে উত্ত্যক্ত করার মতো একটি গুরুতর ও বেদনাদায়ক অপরাধ সংঘটিত হয়েছিল জিয়া নামের এক ব্যক্তির দ্বারা। আইনের আশ্রয় নেওয়া বা প্রতিশোধ নেওয়ার পথ আমার সামনে খোলা ছিল। কিন্তু সাংবাদিকতা, সমাজকর্ম এবং রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় আমি শিখেছি যে, আইন দিয়ে হয়তো অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত করা যায়, কিন্তু তার মন বদলানো যায় না। তাই সমস্ত ক্ষোভ ও আঘাতের ঊর্ধ্বে উঠে আমি অপরাধী জিয়াকে ক্ষমা করে দিয়েছি। এই ক্ষমা কেবল তাকে সংশোধনের একটি সুযোগই দেয়নি, এটি আমাকেও এক অদ্ভুত মানসিক মুক্তি ও শান্তির স্বাদ দিয়েছে।
সাংবাদিকতা জাতির বিবেক। একজন সাংবাদিকের দায়িত্ব যেমন সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরা, তেমনি মানুষের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তনের পথ দেখানো। অন্যদিকে, ‘জিগীষা মানবিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন’-এর মাধ্যমে সমাজকর্মে যুক্ত থেকে আমি অনুভব করেছি—মানুষকে ঘৃণা করে নয়, বরং ভালোবেসে ও শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিয়েই সমাজ বদলাতে হয়। আর ‘জিগীষা মানবিক পার্টি’-র রাজনীতির মূল মন্ত্র হওয়া উচিত প্রতিহিংসামুক্ত জনকল্যাণ। রাজনীতি বা সমাজসেবা মানে মানুষকে দমন করা নয়, বরং মানুষের হৃদয় জয় করা। নবীজি হজরত মুহাম্মদ (সা.) তায়েফের ময়দানে এবং মক্কা বিজয়ের দিনে চরম শত্রুদের ক্ষমা করে দিয়ে আমাদের শিখিয়েছেন যে, ক্ষমার চেয়ে বড় কোনো শক্তি পৃথিবীতে নেই।
আজ এই উপসম্পাদকীয়র মাধ্যমে আমি শুধু আমার নিজের অবস্থান পরিষ্কার করছি না, বরং সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি—আসুন, আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি ও হিংসার সংস্কৃতি চিরতরে বর্জন করি। পরিবারে, সমাজে ও রাষ্ট্রে ক্ষমার সংস্কৃতি গড়ে তুলি। কেউ ভুল করলে, অপরাধ করলে তাকে তাৎক্ষণিকভাবে ধ্বংস করে না দিয়ে, সংশোধনের একটি সুযোগ দিই।
প্রতিশোধের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে যাওয়া সমাজকে বাঁচাতে হলে ক্ষমার স্নিগ্ধতা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত জীবনের এই কঠিন সিদ্ধান্ত আমাকে শিখিয়েছে যে, রাগ বা প্রতিশোধের চেয়ে মানবতা অনেক বড়। আসুন, জিগীষা তথা মুক্তির প্রত্যাশায় আমরা সবাই মিলে এমন এক মানবিক ও ক্ষমাশীল সমাজ গড়ে তুলি, যেখানে হিংসা হেরে যায় এবং ভালোবাসার জয় হয়।
হিংসা বিদ্বেষ পরিহার করি, আসুন মানবিক বাংলাদেশ গড়ি। জয় মানবিক – জয় হোক মানবতার।