বিশেষ প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডা. সিনথিয়া তাসমিন। ৩৩তম বিসিএস (স্বাস্থ্য) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছেন। দায়িত্ব পালনকালে প্রসূতি সেবা, স্বাভাবিক প্রসব,সিজারিয়ান কার্যক্রম এবং নারী স্বাস্থ্যসেবাসহ বিভিন্ন কার্যক্রমে তাঁর নেতৃত্ব ও সমন্বয় নিয়ে স্থানীয়ভাবে প্রশংসা রয়েছে।
তবে সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও পোস্টকে কেন্দ্র করে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। এ ঘটনায় ডা. সিনথিয়া তাসমিন থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন। তিনি এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। অন্যদিকে,সংশ্লিষ্ট বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় অভিযোগগুলোর সত্যতা তদন্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে।
চিকিৎসক থেকে প্রশাসনিক দায়িত্বে:
ডা. সিনথিয়া তাসমিন এমবিবিএস ও মাস্টার অব পাবলিক হেলথ (এমপিএইচ) ডিগ্রিধারী। তিনি ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে স্বাস্থ্য ক্যাডারে যোগ দেন। শ্রীমঙ্গলে দায়িত্ব নেওয়ার আগে তিনি কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের প্রশাসনিক ও চিকিৎসাসেবা ব্যবস্থাপনায় তিনি দায়িত্ব পালন করছেন। মাঠপর্যায়ে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের কাছে পৌঁছে দিতে চিকিৎসক,নার্স,মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয়ে কাজ করছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রসূতি সেবায় উল্লেখযোগ্য কার্যক্রম:
শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তাঁর দায়িত্বকালীন ২০২৫ সাল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত প্রায় ১৫ মাসে মোট ২ হাজার ৭২৬টি স্বাভাবিক প্রসব হয়েছে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়,এ সময়ে ১১৩টি সিজারিয়ান অপারেশনও সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর তাঁর উদ্যোগ ও সমন্বয়ে মৌলভীবাজার সদর হাসপাতাল থেকে গাইনি কনসালটেন্ট এনে সপ্তাহে একদিন সিজারিয়ান কার্যক্রম পুনরায় চালু করা হয়।
হাসপাতাল সংশ্লিষ্টদের মতে,বিপুলসংখ্যক প্রসূতি মায়ের সেবা নিশ্চিত করতে চিকিৎসক, নার্স,মিডওয়াইফ ও অন্যান্য স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হয়েছে। এ কার্যক্রমে প্রশাসনিক তদারকি ও সমন্বয়ের দায়িত্বে ছিলেন ডা. সিনথিয়া তাসমিন।
নারী স্বাস্থ্যসেবায় স্বীকৃতি:
জরায়ুমুখ ও স্তন ক্যান্সার স্ক্রিনিং কর্মসূচিতে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কার্যক্রমও উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে বলে জানানো হয়েছে।
জনসংখ্যাভিত্তিক স্ক্রিনিং কর্মসূচি ও ইলেকট্রনিক ডাটা ট্র্যাকিং ব্যবস্থায় বিশেষ পারফরম্যান্সের জন্য ২০২৬ সালে সিলেট বিভাগের জেলা-ভিত্তিক সেরা স্ক্রিনিং পারফরম্যান্সের স্বীকৃতি অর্জন করে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স।
মাঠপর্যায়ে নারীদের স্ক্রিনিংয়ের আওতায় আনা এবং নারী স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রমকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে হাসপাতালের টিমের পাশাপাশি উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা হিসেবে ডা. সিনথিয়া তাসমিনের সমন্বয় ও তদারকির বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অভিযোগ,থানায় জিডি:
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডা. সিনথিয়া তাসমিনকে নিয়ে বিভিন্ন পোস্ট ও অভিযোগ প্রকাশের পর তিনি বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরে আনেন। এ ঘটনায় শ্রীমঙ্গল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
ডা. সিনথিয়া তাসমিনের অভিযোগ,সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর বক্তব্য প্রচার করা হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের কারণে তাঁর সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত অভিযোগগুলোর সত্যতা এবং এর পেছনে কারা জড়িত,তা তদন্তের বিষয়। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট কাউকে দোষী হিসেবে চিহ্নিত করা আইনগতভাবে সমীচীন নয়।
সাম্প্রতিক বিষয় নিয়ে জানতে চাইলে ডা. সিনথিয়া তাসমিন বলেন,“আমার বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও কিছু ক্ষেত্রে গণমাধ্যমে যে ধরনের অভিযোগ ও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে,তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং আমার সামাজিক ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার একটি চেষ্টা মাত্র। একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে আমি দেশের আইন ও চলমান পুলিশি তদন্তের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধাশীল। আমি বিশ্বাস করি,সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমেই সঠিক সত্যটি উন্মোচিত হবে।
মাঠপর্যায়ে সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে,বিশেষ করে প্রসূতি মায়েদের সেবা ও অন্যান্য স্বাস্থ্য ক্যাম্পেইন সফল করতে আমি ও আমার পুরো টিম দিনরাত কাজ করে যাচ্ছি। এ ধরনের অপপ্রচার আমাদের কাজের গতিকে থামিয়ে দিতে পারবে না। আমি শ্রীমঙ্গলের সাধারণ জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ,যারা আমাদের ভালো কাজের পাশে আছেন। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত বিষয়টি চিহ্নিত করবে,এটাই আমার প্রত্যাশা।”
নারী কর্মকর্তার কর্মপরিবেশ ও আইনি সুরক্ষা:
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন মানবাধিকারকর্মী ও আইনজীবী বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর সমঅধিকার,নিরাপদ পরিবেশ এবং হয়রানি থেকে সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। বাংলাদেশের সংবিধানের ২৮(২) অনুচ্ছেদেও রাষ্ট্রীয় ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারীর সমঅধিকারের কথা বলা হয়েছে।
তিনি বলেন,বাংলাদেশ CEDAW-এর সঙ্গে যুক্ত থাকায় নারীর প্রতি বৈষম্য ও সহিংসতা প্রতিরোধের আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারও রয়েছে। একইভাবে কর্মক্ষেত্রে সহিংসতা ও হয়রানি প্রতিরোধে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (ILO) বিভিন্ন নীতিমালা ও কনভেনশন গুরুত্বপূর্ণ।
তাঁর মতে,কোনো সরকারি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যথাযথ তদন্ত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা জরুরি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কোনো অভিযোগ প্রকাশিত হলেই সেটিকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
তিনি আরও বলেন,কারও বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার,হুমকি,হয়রানি বা মানহানির মতো কর্মকাণ্ড ঘটলে প্রযোজ্য আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারে।
কাজ থামেনি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে:
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিতর্কের মধ্যেও শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বিশেষ করে প্রসূতি সেবা,স্বাভাবিক প্রসব,সিজারিয়ান কার্যক্রম, নারী স্বাস্থ্য ও ক্যান্সার স্ক্রিনিংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলো চালু রয়েছে।
স্বাস্থ্যসেবা সংশ্লিষ্ট ও সচেতন নাগরিকদের ভাষ্য, উপজেলা পর্যায়ের একটি সরকারি স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সীমিত জনবল ও নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও সেবার মান ধরে রাখতে চিকিৎসক,নার্স,মিডওয়াইফ ও অন্যান্য কর্মীদের সমন্বিত প্রচেষ্টা গুরুত্বপূর্ণ।
ডা. সিনথিয়া তাসমিনের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ওঠা অভিযোগের সত্যতা এবং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিষয়ে তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিষয়টি নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হবে এবং একই সঙ্গে একজন সরকারি কর্মকর্তার নিরাপদ ও স্বাভাবিক কর্মপরিবেশও নিশ্চিত থাকবে।
সিলেট নিউজ২৪/এসডি.