জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
ঋতু পরিবর্তনের নিয়মে দরজায় কড়া নাড়ছে কালবৈশাখী। একসময় এই মৌসুমটি এলেই সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলায় বাঁশ বিক্রির ধুম পড়ে যেত। ঝড়-তুফানে ঘরবাড়ি মেরামত কিংবা নতুন ঘর চালার প্রস্তুতিতে বাঁশ কিনতে হাটে-বাজারে ক্রেতাদের দীর্ঘ লাইন লেগে থাকত। দিনশেষে শতাধিক বাঁশ বিক্রি করে মুখে হাসি নিয়ে বাড়ি ফিরতেন বিক্রেতারা। তবে কালের বিবর্তনে সেই সোনালী দিন এখন কেবলই স্মৃতি। বর্তমানে চৈত্র-বৈশাখ মাসেও দেখা নেই কাঙ্ক্ষিত ক্রেতার; সারাদিন অপেক্ষা করেও ১৫-২০টির বেশি বাঁশ বিক্রি করতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় কমছে বাঁশের চাহিদা
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও প্রবীণদের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রযুক্তির উন্নয়ন আর আধুনিক নির্মাণ সামগ্রীর সহজলভ্যতাই এই ঐতিহ্যবাহী ব্যবসায় ভাটা পড়ার মূল কারণ। একসময় গ্রামীণ জনপদে ঘরবাড়ি, বেড়া, চাল কিংবা মাচা তৈরির প্রধান অনুষঙ্গ ছিল বাঁশ। কিন্তু এখন গ্রামেও বাঁশের জায়গা দখল করে নিয়েছে লোহার অ্যাঙ্গেল, প্লাস্টিকের পাইপ, আর টেকসই টিন, পাকা পিলার। ফলে কালবৈশাখীর মরসুমেও বাঁশের বাজারে আগের সেই চিরচেনা জৌলুস আর নেই।
বিপাকে ব্যবসায়ী ও কারিগররা
উপজেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, সারি সারি বাঁশ সাজিয়ে বসে আছেন বিক্রেতারা, কিন্তু ক্রেতার সমাগম একেবারেই সীমিত। কয়েকজন খুচরা ও পাইকারি বাঁশ বিক্রেতা জগন্নাথপুর গ্রামের আনকার মিয়া জানান, বার্শে চাহিদা কম হলেও, দাম একটু বেশি। থাকায় মানুষ কিনতে পারে না। একটা বাশের দাম ৩০০/৪০০ টাকা, আবার একটা পাকা পিলার ৫০০/৬০০ টাকা, পাকা পিলালে দিন যাবে এগুলো নিচ্চে।
”আগে বৈশাখ মাস আসার আগে থেকেই মানুষ এসে অগ্রিম টাকা দিয়ে বাঁশ বুকিং করে রাখত। দিনে ১০০-১৫০ বাঁশ বিক্রি করা কোনো ব্যাপারই ছিল না। আর এখন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বসে থেকে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি বাঁশ বিক্রি করতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। লাভ তো দূরের কথা, হাটের খাজনা আর পরিবহন খরচ তোলাই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার লড়াই
শুধু আবাসন খাতেই নয়, বাঁশ দিয়ে তৈরি কুটির শিল্পও এখন বিলুপ্তির পথে। প্লাস্টিক পণ্যের সস্তা ও সহজলভ্যতার কারণে বাঁশের তৈরি ঝুড়ি, কুলা, ডালা কিংবা চাটাইয়ের চাহিদাও কমে গেছে। ফলে এই পেশার সাথে জড়িত উপজেলার বহু পরিবার এখন জীবিকার তাগিদে অন্য পেশায় ঝুঁকছেন।
স্থানীয় সচেতন মহল মনে করেন, গ্রামীণ অর্থনীতি ও পরিবেশবান্ধব এই লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে বাঁশ চাষিদের প্রণোদনা দেওয়া এবং পরিবেশবান্ধব পণ্যের ব্যবহার বাড়ানো জরুরি। তা না হলে দ্রুতই জগন্নাথপুরের ঐতিহ্যবাহী এই বাঁশ শিল্প পুরোপুরি হারিয়ে যাবে ইতিহাসের পাতায়।বাশ ব্যবসায়ী মাসুদ মিয়া বলেন, আগের মতো বাসে চাহিদা নেই, বড় কষ্টে আছি, পাকার পিলার বের হয়ে বাশের চাহিদা কমে গেছে।।