নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের মানুষের নানা সমস্যা ও সংকট নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদ প্রকাশ করে আসা সাংবাদিক নাদিরুজ্জামান আজমল নিজের সাংবাদিকতা, অভিজ্ঞতা ও সাম্প্রতিক মানসিক ক্লান্তির কথা জানিয়েছেন। শুক্রবার রাতে নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, ‘মানুষের কথা বলতে গিয়ে একদিন একা হয়ে গেলে সাহস দেবে কে?’
পোস্টে নাদিরুজ্জামান আজমল লেখেন, গত কয়েক দিন ধরে তিনি নিজেকেই প্রশ্ন করছেন—‘আমি কি সত্যিই থেমে যাব?’
তিনি জানান, একটা সময় কোনো ঘটনা ঘটলেই তার ভেতর থেকে তাগিদ আসত বিষয়টি নিয়ে লিখতে হবে। মানুষের সমস্যা তুলে ধরতে হবে। যে মানুষটি নিজের কথা বলতে পারছেন না, তার হয়ে অন্তত কয়েকটি শব্দ লেখার চেষ্টা করতে হবে।
অষ্টগ্রামের সড়কের দুরবস্থা, মানুষের দুর্ভোগ, কৃষকের সমস্যা, স্বাস্থ্যসেবার সংকট ও প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন বিষয়ে তিনি সংবাদ প্রকাশ করেছেন বলে পোস্টে উল্লেখ করেন। পাশাপাশি অন্যায়ের শিকার মানুষের কথাও তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন বলে জানান।
তবে সবসময় এসব প্রতিবেদন বা প্রশ্নের পর কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাননি বলেও আক্ষেপ প্রকাশ করেন তিনি। তার ভাষায়, অনেক সময় লিখেছেন, কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি; প্রশ্ন করেছেন, কিন্তু পেয়েছেন নীরবতা। মানুষের জন্য দাঁড়ানোর পর সেই মানুষদের অনেককেই পরে পাশে না পাওয়ার অভিজ্ঞতার কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নাদিরুজ্জামান আজমল বলেন, সাংবাদিকতা তার কাছে শুধু পেশা নয়; মানুষের পাশে দাঁড়ানোর একটি মাধ্যম এবং নিজের বিবেকের কাছে দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা।
সাংবাদিকতা করতে গিয়ে নানা ধরনের প্রশ্ন ও সমালোচনার মুখোমুখি হওয়ার কথাও তুলে ধরেন তিনি। অন্যায়ের বিরুদ্ধে লিখলে ব্যক্তিগত আক্রোশ, প্রশ্ন তুললে কারও ইন্ধনে কাজ করা কিংবা অনিয়ম তুলে ধরলে শত্রুতার অভিযোগ ওঠে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন রাখেন, ‘তাহলে একজন সাংবাদিক একসময় নিজের কাছেই প্রশ্ন করে, আমি আসলে কার জন্য লিখছি?’
নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে আজমল বলেন, কারও বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত যুদ্ধ করা তার উদ্দেশ্য নয়। কাউকে ছোট করা বা অপমান করে নিজেকে বড় করার ইচ্ছাও নেই। অষ্টগ্রামের সাধারণ মানুষের কথা আরও দূরে পৌঁছে দেওয়াই তার উদ্দেশ্য।
হাওরের মানুষের জীবনযাত্রার বিভিন্ন সংকটের কথাও পোস্টে তুলে ধরেন তিনি। বর্ষায় মানুষের জীবনযাপন, পানি কমে গেলে যোগাযোগের দুর্ভোগ, রোগীকে হাসপাতালে নেওয়ার ভোগান্তি এবং কৃষকদের অনিশ্চয়তার বিষয়গুলো সামনে আনার কথা উল্লেখ করেন।
তার মতে, একটি সংবাদ দিয়ে পৃথিবী বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে একটি সংবাদ কখনো একজন মানুষের জন্য একটি দরজা খুলে দিতে পারে। একটি প্রতিবেদন কোনো কর্তৃপক্ষকে নড়েচড়ে বসতে বাধ্য করতে পারে। আবার একটি প্রশ্ন এমন কোনো বিষয় সামনে আনতে পারে, যা অনেকেই দেখেও এতদিন না দেখার ভান করেছেন।
দীর্ঘদিনের এই পথচলায় বর্তমানে কিছুটা ক্লান্তি এসেছে জানিয়ে আজমল লিখেছেন, কখনো কখনো মনে হয় সব ছেড়ে দেবেন। কলম পাশে রেখে দেবেন, ক্যামেরা বন্ধ করে দেবেন এবং আর কোনো অভিযোগ শুনবেন না।
তবে অষ্টগ্রামের সঙ্গে নিজের সম্পর্কের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, অষ্টগ্রাম শুধু একটি উপজেলা নয়—এটি তার জন্মস্থান, কর্মক্ষেত্র এবং নিজের মানুষের জায়গা। তাই চাইলেও পুরোপুরি দূরে সরে যেতে পারবেন না।
নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে প্রশ্ন তুলেছেন, তিনি চুপ থাকলেও মানুষের সমস্যাগুলো কি থেমে থাকবে? অন্যায় কি থেমে যাবে? তার উত্তর—না।
সাংবাদিকতা কোনো পদ-পদবি, পুরস্কার কিংবা কাউকে খুশি করার জন্য করেননি বলেও পোস্টে উল্লেখ করেন আজমল। তার ভাষায়, নিজের ভেতরের তাগিদ থেকেই তিনি লিখেছেন।
পোস্টের শেষদিকে তিনি লেখেন, ‘একজন সাংবাদিক যদি মানুষের কথা বলতে গিয়ে একদিন একা হয়ে যায়, তাহলে তাকে কে সাহস দেবে?’ এ প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না। তবে এমন একজনের অপেক্ষায় আছেন, যিনি একদিন এসে বলবেন—‘ভাই, আপনি থামবেন না। আপনি লিখুন। আমরা আপনার সঙ্গে আছি।’
মানুষের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, আহত, ক্লান্ত বা অভিমানী হতে পারেন, কিন্তু অষ্টগ্রামের মানুষের প্রতি তার দায়বদ্ধতাকে সহজে শেষ করে দিতে পারবেন না।
পোস্টের শেষাংশে তিনি লিখেছেন, ‘আমি জানি না আমি থামব কি না। তবে এটুকু জানি, আমাকে থামিয়ে দিলেও মানুষের প্রশ্নগুলো থামবে না।’
শনিবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় দেওয়া ওই ফেসবুক পোস্টের পর সাংবাদিকতা ও অষ্টগ্রামের মানুষের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রে তার দীর্ঘদিনের ভূমিকা নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা শুরু হয়েছে।