আজ ২০শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৮ বঙ্গাব্দ, ৫ই ডিসেম্বর, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ

সময় : দুপুর ১:০১

বার : রবিবার

ঋতু : হেমন্তকাল

শেরপুরে হাতি হত্যার পর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে মাটি চাপা দেয়ার চেষ্টা।

স্টাফ রিপোর্টার:

শেরপুরে আবারও বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হাতি হত্যার পর অপরাধের চিহ্ন মুছে ফেলতে হাতিটিকে রাতের অন্ধকারে মাটিচাপা দিতে চেয়েছিল হত্যাকারীরা। কিন্তু ভোর হয়ে যাওয়ায় ধরা পড়ার ভয়ে ঘটনাস্থল থেকে তারা পালিয়ে যায় হত্যাকারীরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার (১৮ নভেম্বর) দিবাগত রাতে বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হাতিটিকে হত্যা করে তারা।

শেরপুরের নালিতাবাড়ী সীমান্তের পানিহাতা গ্রামের ফেকামারির পাহাড়ঘেরা একটি ধানক্ষেতে ফাঁদ পেতে হাতিটিকে হত্যা করা হয়। শুক্রবার (১৯ নভেম্বর) সকালে হাতিটির ‍মৃতদেহ উদ্ধার করে বন বিভাগ।

ঘটনার আগের দিন বন্যহাতির ছবি তুলতে শেরপুরে গিয়েছিলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান। ঘটনাস্থল থেকে তিনি জানান, আলামত দেখে এটি স্পষ্ট যে হাতিটিকে জেনারেটরের বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয়েছে। হাতিটির শুড় বিদ্যুতের শকে পুড়ে গেছে।

তিনি বলেন, গতরাত ১২টার দিকে স্থানীয়রা হাতিটির গগনবিদারী চিৎকার শুনেছে। এর অর্থ ওই সময়েই হাতিটি ফাঁদে পড়েছিল।

ড. মনিরুল বলেন, সকালে ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখা যায়, সদ্যমৃত হাতির পাশে একটি গর্ত খোঁড়া হয়েছে। এর মানে দাঁড়ায় হাতিটি হত্যার পর গর্ত খুড়ে এটিকে মাটিচাপা দিয়ে হত্যার ঘটনাকে লুকানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তবে মাটিচাপা দেবার আগেই হয়তো ভোর হয়ে গিয়েছিল। তাই কাজটি অসমাপ্ত রেখেই ঘটনাস্থল থেকে পালিয়েছে হত্যাকারীরা।তিনি আরও জানান, মৃত হাতিটির বয়স আনুমানিক পাঁচ বছর। এটি একটি পুরুষ হাতিশাবক।

এদিকে হাতির মৃত্যর খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে যান বন বিভাগের মধুটিলা রেঞ্জ কর্মকর্তা আব্দুল করিম। তিনি বলেন, হাতিটি একটি ধানক্ষেতে মারা গেছে। আমি ঘটনাস্থলে আছি। উপজেলা প্রাণিসম্পদ অফিসের চিকিৎসক হাতিটির ময়নাতদন্তের জন্য নমুনা সংগ্রহ করেছেন। ময়নাতদন্তের পর বলা যাবে কিভাবে হাতিটির মৃত্যু হয়েছে। আমরা পরবর্তীতে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেব।

এদিকে হাতি হত্যার বিষয়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে জানতে চাইলে বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিচালক জহির আকন সময় নিউজকে বলেন, স্থানীয় বন কর্মকর্তারা সেখানে আছেন। আমরাও ঢাকা থেকে ঘটনাস্থলে যাচ্ছি। সেখানে গিয়ে পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এর আগে গত (৯ নভেম্বর ২০২১) শ্রীবরদী উপজেলার সীমান্ত সংলগ্ন গারো পাহাড় এলাকায় বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে একটি হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় প্রথমে শ্রীবরদী থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হলেও বিদ্যুতের ফাঁদে হাতি মৃত্যুর ঘটনা প্রমাণিত হলে ১১ নভেম্বর চারজনের নামে মামলা করেন শ্রীবরদী রেঞ্জ কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম।

বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, গত বছরও শ্রীবরদী উপজেলার খাড়ামোড়া সীমান্তে একটি হাতি বিদ্যুতের ফাঁদ হত্যা করা হয়েছিল। ১৯৯৫ সাল থেকে ২০২১ সালের এখন পর্যন্ত আনুমানিক ৭৩টি হাতি মারা গেছে। শুধু ২০১৪ সাল থেকে এ পর্যন্ত শুধু শেরপুরে ২৬টি হাতির মৃত্যু হয়েছে, যার বেশিরভাগই বিদ্যুতের ফাঁদ পেতে হত্যা করা হয়েছে। কিন্তু রহস্যজনক কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঠেকাতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে ব্যর্থ হয়েছে বন বিভাগ।

হাতিকর্তৃক যে কোনো ক্ষতির বিপরীতে আবেদন করলে বন বিভাগ তার ক্ষতিপূরণ দেয়। তাই হাতিহত্যা কোনোভাবেই সমর্থনযোগ্য নয় মন্তব্য করেন বাংলাদেশ বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা এবং তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক জোহরা মিলা।

তিনি জোহরা মিলা বলেন, আইন অনুযায়ী কোনো ব্যক্তি হাতি হত্যা করলে এটা জামিন অযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। এক্ষেত্রে সর্বনিম্ন ২ বছর ও সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড এবং সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা ও সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন। একই অপরাধের পুনরাবৃত্তি করলে সর্বোচ্চ ১২ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ও সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।

উল্লেখ্য যে,চলতি মাসের ৬ থেকে ১৯ তারিখ পর্যন্ত ১৪ দিনের ব্যবধানে দেশের বিভিন্ন স্থানে ৬টি বন্যহাতি হত্যার ঘটনা ঘটেছে। এভাবে একের পর এক হাতি হত্যার ঘটনা প্রাণীটির বিলুপ্তির আলামত হিসেবেই দেখছেন বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category