তানজিদুল হাসান জামাল:
এই কথাটা আগেও বলেছিলাম, আবারও বলি, ৫ আগস্টের পর বিএনপির/ছাত্রদলের দরকার ছিল একজন রুথলেস সিইও এবং একজন ব্র্যান্ড ম্যানেজার নিয়োগ করা, যারা কঠোরভাবে দলের লোকজনকে বহিষ্কার করবে; সৎ এবং সুন্দর আচার-ব্যবহারের প্রার্থীদেরকে নিয়োগ করবে, রাজনীতির কৌশল পুনর্ধিরাণ করবে, এবং দলের রিব্র্যান্ডিং করবে। কিন্তু সেই পথে তারা হাঁটে নাই।
ছাত্রদল যে সবগুলো ছাত্র সংসদ নির্বাচনে গণহারা হেরেছে, তার একটা প্রধান কারণ তো তাদের ব্র্যান্ডনেম। যে বিপুল সংখ্যক ছাত্রছাত্রী শিবিরকে প্যানেল ধরে ভোট দিয়েছে, তারা কি অ্যাক্টিভলি শিবির করে? তা তো না। তারা জাস্ট সুইং ভোটার।
তাদেরকে জিজ্ঞেস করলে দেখবেন, অনেকে প্যানেলের সব সদস্যকে চেনেও না, তাদের প্রতিশ্রুতি কী, সেটাও জানে না। তারা ভোট দিয়েছে শিবির ব্র্যান্ডকে। বা উল্টোভাবে বলা যায়, তারা ভোট দিয়েছে ছাত্রদল ব্র্যান্ডের বিরুদ্ধে।
সে কারণেই যে একটা বিশ্ববিদ্যালয়ে নন-শিবির ভিপি হয়েছে, সেটাও ছাত্রদল থেকে হয়নি। আজকের নির্বাচনেও প্রধান তিন পদের মধ্যে যে পদে সবচেয়ে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হয়েছে, সেই পদের প্রার্থীও অরিজিনাল ছাত্রদলের না। ছাত্রদলের প্রার্থী হলে ব্যবধানটা হয়তো আরও বেশিই হতো।
যে ব্যাপারটা পরিষ্কার, সেটা হচ্ছে, ছাত্ররা ছাত্রদল ব্র্যান্ডটাকেই পছন্দ করছে না। যে পুরাতন রাজনীতির মডেল ছাত্রদল অনুসরণ করছে, সেটাই ছাত্রছাত্রীরা রিজেক্ট করছে। তারা তাদেরকে ছাত্রলীগেরই একটা দুর্বল ভার্সন হিসেবে দেখছে।
কথা হচ্ছে, পাঁচ-পাঁচটা বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি এই অবস্থা হয়, জাতীয় রাজনীতিতে চিত্রটা কি খুব ভিন্ন হবে? এই ছাত্ররা কি সমাজেরই একটা উল্লেখযোগ্য অংশ না? এদের পরিবারে কি এদের এই সিদ্ধান্ত এবং এদের বিজয়ের আনন্দ সংক্রমিত হবে না?
তারপরেও এখনও কেন যেন অধিকাংশ মানুষই নিশ্চিত, আগামী নির্বাচনে বিএনপিই ক্ষমতায় আসবে। হতেই পারে। আমি তো আর সব আসনের বাস্তবতা জানি না। আমরা তো শুধু ছাত্রদের মনোভাবই দেখেছি। আর বড়জোর রিকশাওয়ালা-সিএনজিওয়ালাদের সাথে কথা বলেছি।
কিন্তু এর বাইরে সমাজের বড় একটা অংশ – সরকারী চাকরিজীবি, ব্যবসায়ী, বেকার, মধ্যবয়সী থেকে বয়স্ক – যারা সারা জীবন এক ধরনের রাজনীতি করে এসেছে, তারা হয়তো আসলেই বিএনপিকেই ভোট দিয়ে জয়ী করবে। সেই সাথে মিডিয়া, প্রশাসন, নির্বাচন কমিশন যেরকম বিএনপি-তোষণ শুরু করেছে, সেই ইফেক্টের প্রভাবও হয়তো থাকবে।
কিন্তু আগামী নির্বাচনই তো শেষ না। এর পরেও তো নির্বাচন হবে। এবং সেসব নির্বাচনের ফলাফল তো এই ছাত্রদের এবং তাদের পরবর্তী জেনারেশনের হাত ধরেই নির্ধারিত হবে। বিএনপি যদি তাদের পুরাতন মডেলের রাজনীতি থেকে বেরিয়ে না আসে, যদি এই পরিষ্কার ইন্ডিকেশনগুলো থেকে শিক্ষা না নেয়, যদি নিজেদের রাজনীতিকে ঢেলে না সাজায়, তাহলে বিএনপির কপালে তো দুঃখ আছেই, তার সাথে সাথে আমাদের কপালেও দুঃখ আছে।
নাহ, এটা বলছি না যে বিএনপিকেই ক্ষমতায় আসতে হবে, তা না হলে আমাদের কপালে দুঃখ আছে। বরং বিএনপি যদি পরবর্তী কোনো নির্বাচনে ছাত্র সংসদগুলোর মতো গো-হারা হারে, তাহলে তারা যে সেই ফলাফল মেনে নিতে পারবে না, সেই সরকারকে শান্তিতে থাকতে দিবে না, পুরাতন মডেলে হরতাল, জ্বালাও-পোড়াও আন্দোলন শুরু করবে, সেই সুযোগটা যে বিদেশী শক্তি গ্রহণ করবে , এবং এর মধ্য দিয়ে আবারও যে লীগের ফিরে আসার সুযোগ পাবে, সেখানেই আমাদের দুর্ভাগ্য নিহিত।