নূর হোসাইন :
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার মূল ভিত্তি হলো ইউনিয়ন পরিষদ। তৃণমূল পর্যায়ে জনসেবা নিশ্চিতকরণ, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন এবং স্থানীয় পর্যায়ে ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের ভূমিকা ও গুরুত্ব অপরিসীম। তবে সাম্প্রতিক সময়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে আরও যুগোপযোগী, গতিশীল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আইনি ও সাংবিধানিক বিতর্ক সামনে এসেছে। স্থানীয় সরকার (ইউনিয়ন পরিষদ) আইন, ২০০৯-এর ২৬ ধারায় চেয়ারম্যান পদের জন্য ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ না করার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টের রুল জারির পর এই বিষয়টি এখন জাতীয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
আইনের বর্তমান বিধান অনুযায়ী, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বা সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার জন্য প্রার্থীর কোনো ধরনের ন্যূনতম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক নয়। অর্থাৎ, ন্যূনতম স্বাক্ষরজ্ঞান ছাড়াও যে কেউ চাইলে ইউনিয়ন পরিষদের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নির্বাচন করতে পারেন। অথচ সাধারণ জনপ্রতিনিধি হিসেবে তারা কেবল গ্রামীণ রাস্তাঘাট নির্মাণ, সামাজিক সুরক্ষার নানা ভাতা বিতরণ বা ভৌত অবকাঠামো উন্নয়নের মতো প্রশাসনিক কাজই পরিচালনা করেন না, বরং আইনগতভাবে তাদের ওপর অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিচারিক দায়িত্বও ন্যস্ত থাকে।
এই বাস্তবতার আলোকেই সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবীদের করা এক রিট আবেদনে যৌক্তিক প্রশ্ন তোলা হয়েছে যে, একজন চেয়ারম্যানকে যদি আইনগতভাবে বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগ করতে হয়, তবে তার জন্য কেন ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা নির্ধারণ করা হবে না? রিট আবেদনকারীদের মূল যুক্তি ছিল, ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা গ্রাম আদালত পরিচালনা করেন। এর মাধ্যমে তারা নির্দিষ্ট আর্থিক অংক পর্যন্ত দেওয়ানি ও ফৌজদারি বিরোধ স্থানীয় পর্যায়ে সালিশ ও নিষ্পত্তির আইনি ক্ষমতা রাখেন। অন্যদিকে, বিচার বিভাগের সমমানের বা সামান্য বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগকারী একজন জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটকে নিয়োগ পেতে হলে আইন বিষয়ে স্নাতক ডিগ্রির পাশাপাশি অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশনের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়।
বিচারিক দায়িত্ব পালনের এই মানদণ্ডের ক্ষেত্রে স্পষ্ট বৈসাদৃশ্য ও অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। সামান্য বিচারিক ক্ষমতা প্রয়োগের জন্যও যেখানে দীর্ঘ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও পেশাগত দক্ষতার প্রয়োজন হয়, সেখানে একজন ইউপি চেয়ারম্যানের শিক্ষাগত যোগ্যতা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত থাকাটা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে রিটকারিরা একে সংবিধানের কয়েকটি মৌলিক অনুচ্ছেদের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে দাবি করেছেন। বিশেষ করে, সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বর্ণিত সমতার অধিকারের সঙ্গে এটি সাংঘর্ষিক হতে পারে, কারণ আইনি দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যোগ্যতার মাপকাঠিতে চরম বৈষম্য রয়েছে।
তাছাড়া, সংবিধানের ৫৯ ও ৬০ অনুচ্ছেদে স্থানীয় সরকার পরিচালনার জন্য কার্যকর ও জনকল্যাণকর প্রশাসনের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে। আজকের আধুনিক ও ডিজিটালাইজড যুগে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে নানা ধরনের বাজেট প্রণয়ন, সরকারি অনুদান বণ্টন, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তনির্ভর প্রতিবেদন তৈরি করতে হয়। একজন চেয়ারম্যান যদি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় সম্পূর্ণ অজ্ঞ হন, তবে তিনি কেবল আমলা ও সচিবদের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে সুশাসন ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয় এবং প্রায়ই প্রকল্পের অর্থ অপচয় বা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হয়।
অবশ্য এই বিতর্কের অন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে, যা গণতান্ত্রিক অধিকার ও প্রতিনিধিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অনেকেই মনে করেন, ন্যূনতম শিক্ষাগত যোগ্যতা বাধ্যতামূলক করলে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী, যারা প্রান্তিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের কারণে উচ্চশিক্ষা অর্জনের সুযোগ পায়নি, তারা স্থানীয় নির্বাচনে অংশগ্রহণের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হবেন। গণপ্রজাতন্ত্রের মূল চেতনা হলো জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে প্রতিনিধি নির্বাচন। অনেক সময় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা না থাকলেও প্রথাগত প্রজ্ঞা, নেতৃত্ব দেওয়ার অসাধারণ ক্ষমতা এবং জনকল্যাণে উৎসর্গীকৃত প্রাণ একজন সাধারণ মানুষকে সফল জনপ্রতিনিধি করে তুলতে পারে। তাই শিক্ষাগত যোগ্যতার শর্ত আরোপ করলে তা সাধারণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণের পথ সংকুচিত করতে পারে কি না, সেটিও একটি গভীর চিন্তার বিষয়।
তবে সময়ের পরিবর্তনশীল চাহিদা এবং প্রশাসনিক দক্ষতার প্রয়োজনীয়তা আজ অস্বীকার করার উপায় নেই। ইউনিয়ন পরিষদ কেবল একটি গ্রামীণ সালিশের জায়গা নয়, এটি কোটি কোটি টাকার বাজেট পরিচালনা ও বহুমুখী উন্নয়ন প্রকল্পের কেন্দ্রবিন্দু। তাই নেতৃত্বকে দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক করতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা জরুরি। হাইকোর্ট অন্তর্বর্তীকালীন আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানতে চেয়েছেন কেন এই ধারাটি সংবিধানের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ ঘোষণা করা হবে না এবং কেন চেয়ারম্যান পদে ন্যূনতম ‘স্নাতক’ ডিগ্রি নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হবে না।
এই রুলের জবাব ও আদালতের চূড়ান্ত রায় দেশের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক হয়ে থাকবে। গণতন্ত্রের মূলধারাকে অক্ষুণ্ণ রেখে এবং তৃণমূলের নেতৃত্বকে আরও দক্ষ ও আধুনিক করে তোলার মাধ্যমেই এই আইনি বিতর্কের একটি টেকসই ও জনবান্ধব সমাধান খুঁজে পাওয়া সম্ভব। নীতিনির্ধারক ও বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার মাধ্যমে এমন একটি পথ বের করতে হবে, যা একদিকে যেমন তৃণমূলের প্রতিনিধিত্বশীলতা নিশ্চিত করবে, অন্যদিকে তেমনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও সুশাসনের মানদণ্ডকেও সমুন্নত রাখবে।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মি, চেয়ারম্যান- জিগীষা মানবিক উন্নয়ন ফাউন্ডেশন