আজ ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সময় : সকাল ১০:৪৮

বার : বৃহস্পতিবার

ঋতু : হেমন্তকাল

ধর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু সিলেট!

 

রাজা মিয়া বিশেষ প্রতিনিধিঃ

সিলেট এমসি কলেজ ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণ, কিশোরী ধর্ষণ এবং ৫ম শ্রেণির ছাত্রী ধর্ষণের রেশ এখনও কাটেনি। এরই মাঝে ঘটেছে আরও কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনা। সব মিলিয়ে যেন চলছে ধর্ষণের উৎসব। এসব ঘটনার প্রতিবাদে আন্দোলনও চলছে সমানতালে। তবে এমন ঘটনার কারণ হিসেবে সামাজিক অবক্ষয়ের পাশাপাশি বিচারহীনতার সংস্কৃতি, রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন এবং আইন শৃঙ্খলার চরম অবনতিকেই দায়ী করছেন সিলেটের আইনজীবী ও জনপ্রতিনিধিরা।

গত ২৫ সেপ্টেম্বর সিলেট এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে স্বামীকে বেঁধে রেখে গৃহবধূ গণধর্ষণ দিয়েই শুরু। এর মধ্যেই নগরীর দাড়িয়াপাড়ায় ঘটলো ছাত্রলীগ কর্মী কর্তৃক আরেক কিশোরী ধর্ষণের ঘটনা। একের পর এক ৬টি ধর্ষণের ঘটনায় দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এখন সিলেট।

সব ঘটনাতেই আটক আছে, তারপরও বিচার নিয়ে আছে অনিশ্চয়তা। সব মিলিয়ে নানা কর্মসূচিতে উত্তাল সিলেট। ধর্ষণ বন্ধে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি সরকারকে আরও কঠোর হওয়ার দাবি সকলের।

গণমাধ্যম ও পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে সিলেটের এমসি কলেজের ছাত্রাবাসে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হন এক তরুণী। স্বামীকে বেঁধে রেখে ওই তরুণীকে ধর্ষণ করা হয়। এ ঘটনায় ২৬ সেপ্টেম্বর তরুণীর স্বামী বাদী হয়ে ৬ জনের নাম উল্লেখ করে শাহপরান থানায় মামলা করেন। এরপর এজাহারভূক্ত আসামি সাইফুর রহমান, শাহ মাহবুবুর রহমান রনি, মাহফুজুর রহমান মাসুম, অর্জুন লস্কর, রবিউল ইসলাম, তারেকুল ইসলাম তারেক এবং সন্দেহভাজন হিসেবে আইনুল ও মো. রাজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরা সকলেই ছাত্রলীগের কর্মী। গ্রেপ্তারকৃত ৮ জনই আদালতে ধর্ষণের দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছে।

আর ২৫ সেপ্টেম্বর রাতে হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে ঘরে ঢুকে মা-মেয়েকে ধর্ষণ করে দুই যুবক। ওই রাতে দুই যুবক তাদের বাসায় প্রবেশ করে একসাথে মা-মেয়েকে ধর্ষণ করে। পরদিন ধর্ষিতা মেয়ে বাদী হয়ে চুনারুঘাট থানায় মামলা করেন। এরপর পুলিশ অভিযান চালিয়ে অভিযুক্ত শাকিল আহমেদ (২২) ও হারুন মিয়াকে (২৫) গ্রেপ্তার করে। সোমবার (৫ অক্টোবর) হবিগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট সুলতান উদ্দিন প্রধানের আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন এই দুই আসামি।

এছাড়া সিলেটে নগরীর দাড়িয়াপাড়া এলাকায় এক কিশোরীকে (১৪) ধর্ষণের অভিযোগে গত শুক্রবার (২ অক্টোবর) কোতোয়ালি থানায় মামলা করেন ওই কিশোরীর মা। মামলা দায়েরের পর গত শনিবার (৩ অক্টোবর) সন্ধ্যায় সিলেটের মোগলাবাজার থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সোমবার (৫ অক্টোবর) তার একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন সিলেট অতিরিক্ত মুখ্য মহানগর হাকিম জিয়াদুর রহমান।

এদিকে গত শনিবার (৪ অক্টোবর) রাতে সিলেট নগরীর শামিমাবাদে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের অভিযোগে পুলিশ দিলোয়ার (৪০), হারুন মিয়া (৩৫) ও আফজালকে গ্রেপ্তার করেছে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই রেজাউল জানান, শামীমাবাদ এলাকার বাসায় স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে বসবাস করতেন ওই নারী। শনিবার সন্ধ্যায় বাসার দ্বিতীয় তলার ভাড়াটে দিলওয়ার তার দুই সহযোগীকে নিয়ে তাকে ধর্ষণ করে।

একই রাতে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জে সাত বছরের এক শিশু ধর্ষণের অভিযোগে মামলা হয়েছে। পরে পুলিশ অভিযার চালিয়ে অভিযুক্ত হৃদয় আহমদকে গ্রেপ্তার করে।

অন্যদিকে হবিগঞ্জের নবীগঞ্জে ইউনিয়ন পরিষদের পরিত্যক্ত ভবনে এক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন। সোমবার (৫ অক্টোবর) নবীগঞ্জ থানা পুলিশ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। পরে পুলিশ অভিযান চালিয়ে এক অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে।

সিলেট জজ কোর্টের আইনজীবী এডভোকেট আনোয়ার হোসেন সুমন বলেন, গেল কয়েকদিন থেকে ধর্ষণের প্রতিযোগিতা চলছে সিলেটে। মূলত দেশে আইন কানুনের চরম অবনতি কিংবা বিচারব্যবস্থা দীর্ঘায়িত হলে এ ধরনের ঘটনা ঘটে বলে জানান তিনি। এর থেকে ফিরে আসতে আইনের ধাপগুলো দ্রুত ও সহজভাবে সম্পন্ন করার পরামর্শ তাঁর।

তিনি আরও বলেন, অপরাধীরা যখন নানাভাবে প্রভাবিত হয়ে রেহাই পেয়ে যায় কিংবা দেশে যখন আইন কানুনের চরম অবনতি হয় অথবা বিচার দীর্ঘায়িত হয় তখনই এ ধরনের ঘটনা ঘটে। মানুষের মধ্যে অসুস্থতার চর্চা দ্রুত বৃদ্ধি পায়। মানুষ সংক্রমিত হয়।

তিনি আরও বলেন, এসব ঘটনার সাথে জড়িতরা যাতে কোনোভাবে ছাড় না পায় সেজন্য আইনের ধাপগুলো অতি দ্রুত ও সহজভাবে সম্পন্ন করতে হবে। এতে মানুষের মাঝে আস্তা আসবে ও অপরাধিরা ভয় পাবে।

আর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, যখন সমাজে দুর্নীতি ও অপকর্ম করলে পার পাওয়া যায় তখনই এরকম ঘটনা ঘটে বলে। ব্যালেন্স বলতে কিছু নাই। সবকিছু দলীয়ভাবে হচ্ছে। কারো বিরুদ্ধে কথা বলার মানুষ নেই, কথা বললেও অসুবিধা।

তিনি আরও বলেন, এত ঘটনা কিসের আলামত। এত অবক্ষয় আমার জীবনেও দেখিনি। পবিত্র এই মাটিতে কোনভাবেই এসব কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য না। এজন্য সবাই প্রতিবাদ করছে।

দ্রুত বিচার হয়ে গেলে এরকম ঘটতো না উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, যারা একশন নেয়ার তারা নিচ্ছেন না। সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সবাইকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে। এসব ঘটনার সাথে যারাই জড়িত থাকবে তাদের সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে হবে। তাহলেই এমন জঘন্য অপরাধ করতে কেউ সাহস পাবে না।

মেয়র আরিফ আরও বলেন, জনপ্রতিনিধিদের মূল্যায়ন থাকলে সমাজে এমন অবক্ষয় হতো না। এখন দেখা যায়, আমাদের সমাজে মানুষ জনপ্রতিনিধিদের মূল্যায়ন করছে না। অনেক জায়গায় দলীয় প্রভাবের কারণে জনপ্রতিনিধিরাও কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছেন। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে জনপ্রতিনিধিদের মূল্যায়ন বাড়াতে হবে। কারণ জনপ্রতিনিধিদের দায় দেয়ার আগে তাদেরকে মূল্যায়ন করতে হবে। শুধু শুধু দায় নিয়ে তো লাভ নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category