শাহজাহান ইস্যুতে চিকনাগুল বিএনপিতে পাল্টাপাল্টি অবস্থান
অবাঞ্ছিত ঘোষণার প্রতিবাদে বিক্ষোভ, ইউনিয়ন বিএনপির সিদ্ধান্তের এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন
জৈন্তাপুর (সিলেট) প্রতিনিধি::
জৈন্তাপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহজাহানকে দলীয় কার্যক্রম থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণাকে কেন্দ্র করে সিলেটের জৈন্তাপুরের চিকনাগুল ইউনিয়ন বিএনপিতে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। এক পক্ষ শাহজাহানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিলেও অপর পক্ষ সেই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে মাঠে নেমেছে। সোমবার (১০ আগস্ট) সন্ধ্যায় জৈন্তিয়া প্রবেশ গেইট এলাকার ঘাটেরচটি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি পয়েন্টে প্রতিবাদ সভা ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা।
এর আগে রোববার (৯ আগস্ট) রাত ৯টায় চিকনাগুল বাজারে ইউনিয়ন বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের উদ্যোগে একটি জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি হাজী সিরাজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে এবং সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুল ইসলাম চৌধুরীর পরিচালনায় অনুষ্ঠিত ওই সভায় মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ তুলে তাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে সংশ্লিষ্টরা জানান।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, ৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে শাহজাহানের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে সভায় আলোচনা হয়। এসব কর্মকাণ্ডে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে—এমন অভিযোগ তুলে সভায় উপস্থিত ৫১ জন নেতাকর্মীর স্বাক্ষরিত একটি পত্রের মাধ্যমে তাকে দলীয় কার্যক্রম থেকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা করা হয়।
তবে এ সিদ্ধান্তের পরই শুরু হয় পাল্টা প্রতিক্রিয়া।
‘সিদ্ধান্তের বিষয়ে জানতেন না অনেকে’
শাহজাহানের পক্ষের নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন বিএনপির ওই জরুরি সভায় বিএনপি ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের অনেক দায়িত্বশীল নেতাকর্মীকে জানানো হয়নি। শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়েও তাদের সঙ্গে কোনো আলোচনা করা হয়নি।
তাদের দাবি, বিভিন্ন বিষয় ভিন্নভাবে উপস্থাপন করে নেতাকর্মীদের কাছ থেকে চার পৃষ্ঠার একটি রেজুলেশনে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছে। পরে ওই স্বাক্ষরকে শাহজাহানের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের সমর্থন হিসেবে প্রচার করা হচ্ছে।
সভায় স্বাক্ষর করা কয়েকজন নেতাকর্মী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বলেও দাবি করেন তারা। তাদের ভাষ্য, শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার সিদ্ধান্ত জেনেশুনে তারা স্বাক্ষর করেননি।
‘অভিযোগগুলো মিথ্যা ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’
নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করে জৈন্তাপুর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক মো. শাহজাহান বলেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
তিনি বলেন, “মিথ্যা তথ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের বিভ্রান্ত করে স্বাক্ষর আদায়ের পর আমার বিরুদ্ধে কথিত সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।”
শাহজাহান আরও বলেন, “আমি যদি কোনো অপরাধ করে থাকি, তাহলে দলীয় কোনো সিদ্ধান্ত হলে উপজেলা বিএনপি ও আমার প্রাণের সংগঠন জেলা স্বেচ্ছাসেবক দল আমার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে। দলের নিয়ম ও সাংগঠনিক সিদ্ধান্তের প্রতি আমার পূর্ণ আস্থা রয়েছে।”
বিষয়টি খতিয়ে দেখে সাংগঠনিকভাবে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
প্রতিবাদ সভায় শতাধিক নেতাকর্মী
সোমবার সন্ধ্যায় ঘাটেরচটি আইসক্রিম ফ্যাক্টরি পয়েন্টে আয়োজিত প্রতিবাদ সভায় সভাপতিত্ব করেন ৮ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি ও ইউনিয়ন বিএনপির সহ-সভাপতি আফতাব আলী। সভা পরিচালনা করেন জেলা তাঁতি দলের সদস্য মো. সাইফুল্লাহ।
সভায় বক্তারা দাবি করেন, দলের দুর্দিনে শাহজাহান আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। জেল-জুলুমের শিকার হয়ে তিনি দলের একজন ত্যাগী নেতা হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন।
বক্তাদের অভিযোগ, কিছু ‘হাইব্রিড নেতা’ দলের সুবিধা নিতে মরিয়া হয়ে শাহজাহানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন।
তারা বলেন, কোনো নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে দলীয় ফোরামে তা উপস্থাপন করে তদন্ত ও সাংগঠনিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। এভাবে কাউকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে তার সাংগঠনিক ও সামাজিক ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার চেষ্টা মেনে নেওয়া হবে না।
৬৬ নেতাকর্মীর স্বাক্ষর
প্রতিবাদ সভায় রেজুলেশনে স্বাক্ষর করেন উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা দলের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম সেনাজ, সিলেট জেলা প্রচার দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মুজাম্মিল আহমদ, জৈন্তাপুর উপজেলা জাসাসের সহসভাপতি কামরান হোসেন, উপজেলা যুবদল নেতা মঈনুল ইসলাম, চিকনাগুল ইউনিয়ন যুবদলের সিনিয়র সহসভাপতি নজরুল ইসলাম, সহসভাপতি বাশির আলী, সহসাংগঠনিক সম্পাদক মজনু মিয়া, মাসুম আহমদ, চিকনাগুল ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি আদনান সাব্বির, সাধারণ সম্পাদক রাজন আহমদ রিমন, ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আহমদ জুয়েল আহমদ, সদস্যসচিব শাকিল আহমদ, ইউনিয়ন শ্রমিক দলের সভাপতি আনোয়ার হোসেন, সাধারণ সম্পাদক দিলদার হোসেন, ইউনিয়ন মুক্তিযোদ্ধা দলের সভাপতি আজমত আলী, সাংগঠনিক সম্পাদক রাজু আহমেদসহ ৬৬ জন নেতাকর্মী।
এ সময় ইউনিয়নের বিভিন্ন পর্যায়ের শতাধিক নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
সভা শেষে শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার প্রতিবাদে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি স্থানীয় বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে প্রতিবাদ জানায়।
‘ইউনিয়ন বিএনপির এ সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার নেই’
ঘটনাটি নতুন মোড় নেয় জৈন্তাপুর উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাফিজের বক্তব্যে।
তিনি বলেন, “মো. শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে। তবে ইউনিয়ন বিএনপি এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখতিয়ার রাখে না।”
তিনি আরও বলেন, “বিষয়টি নিয়ে আগামী বৃহস্পতিবার মাননীয় মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর উপস্থিতিতে উভয় পক্ষকে নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদকের এই বক্তব্যের পর ইউনিয়ন বিএনপির নেওয়া সিদ্ধান্তের সাংগঠনিক বৈধতা নিয়ে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
এখন নজর বৃহস্পতিবারের বৈঠকে
শাহজাহানকে ‘অবাঞ্ছিত’ ঘোষণা নিয়ে চিকনাগুল ইউনিয়ন বিএনপিতে যে পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা এখন প্রকাশ্য বিরোধে রূপ নিয়েছে। একদিকে শাহজাহানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে সাংগঠনিক ব্যবস্থার দাবি, অন্যদিকে সেই সিদ্ধান্তকে ‘অসাংগঠনিক’ ও ‘উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ দাবি করে প্রতিবাদ—দুই পক্ষের অবস্থানই এখন স্পষ্ট।
উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে বৃহস্পতিবার উভয় পক্ষকে নিয়ে বৈঠকের কথা জানানো হয়েছে। সেই বৈঠকে বিরোধের কী সমাধান আসে এবং শাহজাহানকে অবাঞ্ছিত ঘোষণার সিদ্ধান্তের বিষয়ে দলীয়ভাবে কী অবস্থান নেওয়া হয়, এখন সেদিকেই নজর স্থানীয় নেতাকর্মীদের।