নূর হোসাইন:
ঢাকার আবাসন ও ভূমি ব্যবসা বর্তমান সময়ের অন্যতম লাভজনক অথচ ঝুঁকিপূর্ণ পেশা। একদিকে আকাশচুম্বী জমির দাম, অন্যদিকে আবাসন সমস্যার সমাধানে সাধারণ মানুষের মরিয়া প্রচেষ্টা—সব মিলিয়ে এই খাতটি অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। তবে এই ঝকঝকে আবরণের পেছনে লুকিয়ে আছে এক অন্ধকার জগত। জমি কেনাবেচা বা ভবন নির্মাণের সাথে জড়িত ব্যবসায়ীদের জন্য অদৃশ্য এক অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্থানীয় চাঁদাবাজি। এই চাঁদাবাজরা কেবল ব্যবসায়িক মুনাফায় ভাগ বসায় না, বরং ক্ষেত্রবিশেষে ব্যবসায়ীদের জীবনের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ঠেলে দেয়। চাঁদাবাজির বহুমুখী রূপ
রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ল্যান্ড বা ভূমি ব্যবসায়ীদের ওপর চাঁদাবাজির ধরণ অত্যন্ত সুসংগঠিত এবং বহুমুখী। এদের তৎপরতা সাধারণত কয়েকভাগে বিভক্ত: ভূমি দস্যুতার দাপট: অনেক সময় বড় কোনো প্রকল্পের কাজ শুরু করতে গেলেই স্থানীয় প্রভাবশালী বা তথাকথিত ‘মস্তান’ বাহিনী উপস্থিত হয়। তাদের দাবি—এলাকায় কাজ করতে হলে তাদের ‘ম্যানেজ’ করে চলতে হবে। এটি অনেকটা অলিখিত ট্যাক্সের মতো, যা না দিলে নির্মাণ কাজ বন্ধ করে দেওয়া বা মালামাল লুট করার মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। অফিস ও সাইটে আতঙ্ক: আবাসন কোম্পানির বিক্রয় কেন্দ্র বা নির্মাণাধীন সাইটে গিয়ে সরাসরি হুমকি দেওয়া এখন গা সওয়া বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক সময় তারা ভয়ভীতি দেখিয়ে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। যারা প্রতিবাদ করার সাহস দেখাচ্ছেন, তাদের মিথ্যা মামলা, মারধর কিংবা সামাজিকভাবে হেনস্তা করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে। ত্রাসের রাজত্ব: এই চাঁদাবাজরা স্থানীয় রাজনীতি বা পেশিশক্তির দাপট ব্যবহার করে। তারা এতটাই বেপরোয়া যে, অনেক ব্যবসায়ী থানায় অভিযোগ করার সাহসও পান না। কারণ, অভিযোগ করার পর নিরাপত্তার বিষয়টি আরও নাজুক হয়ে পড়ে। ভুক্তভোগীদের নীরব আর্তনাদ
ভূমি ব্যবসায়ীরা আজ এক অদ্ভুত সংকটের মুখে। একদিকে বিনিয়োগের ঝুঁকি, অন্যদিকে এই চাঁদাবাজদের করতল। ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা পুঁজি হারিয়ে অনেকেই এই ব্যবসা থেকে সরে যেতে বাধ্য হচ্ছেন। বড় কোম্পানিগুলো কোনোমতে টিকে থাকলেও তাদের নির্মাণ খরচ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে, যার চূড়ান্ত দায় গিয়ে পড়ছে সাধারণ ক্রেতাদের ওপর। ফ্ল্যাট বা জমির উচ্চমূল্যের পেছনে অন্যতম একটি লুকায়িত কারণ হলো এই চাঁদাবাজদের অবৈধ আবদার।
প্রতিকারের পথ কোথায়? এই সংকট কেবল ব্যবসায়ীদের নয়, এটি জননিরাপত্তারও প্রশ্ন। ঢাকার প্রতিটি এলাকায় প্রশাসনের নজরদারি আরও জোরদার করতে হবে। চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা না হলে আবাসন খাত ধুঁকতে থাকবে। ভয়হীন অভিযোগ কেন্দ্র: চাঁদাবাজির শিকার ব্যবসায়ীদের জন্য একটি বিশেষ হটলাইন বা গোপন অভিযোগ সেল থাকা প্রয়োজন, যেখানে পরিচয় গোপন রেখে আইনি সহায়তা পাওয়া যাবে। রাজনৈতিক সদিচ্ছা: স্থানীয় পর্যায়ে যারা চাঁদাবাজির আশ্রয় দেয়, তাদের রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে আইনের আওতায় আনতে হবে। আইনের প্রয়োগ: চাঁদাবাজির মামলায় যেন দ্রুত বিচার সম্পন্ন হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
পরিশেষে বলা যায়, একটি পরিকল্পিত ও আধুনিক ঢাকা গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নে আবাসন ব্যবসায়ীদের অবাধ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। চাঁদাবাজদের এই ত্রাসের রাজত্ব বন্ধ না করা গেলে উন্নয়নের এই ধারা বাধাগ্রস্ত হবে এবং শহরের সামগ্রিক শান্তি বিঘ্নিত হবে। সময় এসেছে এই ‘অদৃশ্য ঘাতক’দের শিকড় থেকে উপড়ে ফেলার।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মী