নূর হোসাইন:
সাম্প্রতিক সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতন এবং পাচারের মতো জঘন্য অপরাধের পরিসংখ্যান উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। গবেষণায় দেখা যায়, অপরাধীরা অপরাধ সংঘটনের জন্য এমন সব জায়গা বেছে নেয় যেখানে নজরদারি কম বা যেখানে অর্থের বিনিময়ে গোপনীয়তা রক্ষা করা যায়। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আমাদের দেশের কিছু অসাধু আবাসিক হোটেল বর্তমানে অপরাধীদের ‘নিরাপদ ট্রানজিট পয়েন্ট’ বা নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
একটি আবাসিক হোটেল সমাজ ও পর্যটন শিল্পের অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু যখনই এই হোটেলের গণ্ডি অপরাধের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়, তখন তা পুরো সমাজকেই ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয়। এই অপরাধ চক্রে সরাসরি জড়িত না থাকলেও, হোটেলের অনেক কর্মীর নীরবতা বা উদাসীনতা অপরাধের পথকে প্রশস্ত করে দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি কোনো শিশুকে নিয়ে হোটেল রুমে প্রবেশ করছেন, কিন্তু পরিচয়পত্র যাচাই বা জিজ্ঞাসাবাদের তোয়াক্কা করেন না হোটেলের ফ্রন্ট ডেস্কে থাকা কর্মীরা। এই নীরবতা কি কেবল দায়িত্বহীনতা, নাকি এর পেছনে লুকিয়ে আছে কোনো অপরাধী চক্রের আর্থিক যোগসাজশ?
মূলত, হোটেলের কর্মীরাই অপরাধের প্রাথমিক সংকেতগুলো বোঝার অবস্থানে থাকেন। একজন কর্মী যদি চেক-ইনের সময় কঠোরভাবে জাতীয় পরিচয়পত্র যাচাই করেন, তবেই অপরাধীদের অর্ধেক পরিকল্পনা নস্যাৎ হয়ে যায়। একইভাবে, অস্বাভাবিক আচরণ বা শিশুর ভয়ার্ত মুখাবয়ব লক্ষ্য করলে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোই একজন সচেতন নাগরিক ও দায়িত্বশীল কর্মীর ধর্ম। কিন্তু মুনাফালোভী হোটেল মালিকরা অনেক সময় কর্মীদের এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেন, যেখানে অতিথির নিরাপত্তা বা নৈতিকতার চেয়ে ‘ব্যবসায়িক গোপনীয়তা’কে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এটি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক।
নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আবাসিক হোটেলগুলোকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে। প্রথমত, প্রতিটি হোটেলকে সিসিটিভি ক্যামেরার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সাথে ডেটা শেয়ারিং সিস্টেম চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, কর্মীদের কেবল হোটেল ব্যবস্থাপনার প্রশিক্ষণ দিলে চলবে না, বরং তাদের নিয়মিত মানবাধিকার ও শিশু সুরক্ষা বিষয়ক সচেতনতামূলক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। তৃতীয়ত, যদি কোনো হোটেলের কোনো রুমে অপরাধ সংঘটিত হওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়, তবে কেবল অপরাধী নয়, হোটেলের মালিক ও দায়িত্বরত কর্মীদেরও আইনি কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে।
পরিশেষে, হোটেল মানেই যেন কেবল বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান না হয়, বরং তা যেন একটি নিরাপদ আবাসের প্রতীক হয়ে ওঠে। আমাদের প্রতিটি আবাসিক হোটেলের কর্মীরা যদি তাদের চোখের সামনে ঘটা অপরাধের বিরুদ্ধে সামান্যতম সোচ্চারও হন, তবেই নারী ও শিশু পাচারের মতো ভয়াল অপরাধ অনেকাংশেই কমে আসবে। মনে রাখতে হবে, আপনার একটু সতর্ক দৃষ্টিই পারে একটি নিষ্পাপ জীবনকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করতে।
লেখক: সাংবাদিক ও সমাজকর্মি।