আল-মামুন খান, নিজস্ব প্রতিনিধি:
কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে তানিম নামে এক যুবকের আত্মহত্যার ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। আত্মহত্যার আগে তিনি একটি চিরকুট লিখে গেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। ওই চিরকুটে মারজানা ইসলাম আনিকা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করা হয়েছে বলে দাবি করেছে তানিমের পরিবার।
মামলার নথি ও পরিবারের অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, তাড়াইল উপজেলার তালজাঙ্গা ইউনিয়নের নন্দীপুর গ্রামের মৃত নজরুল ইসলামের ছেলে তানিম পেশায় টাইলস মিস্ত্রি ছিলেন। বাবা না থাকায় তিনি ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাঁর আয়ের ওপরই পরিবারের সংসার চলত।
মামলার অভিযোগে বলা হয়েছে, পার্শ্ববর্তী দড়িজাহাঙ্গীরপুর গ্রামের মৃত ওয়াজ উদ্দিনের মেয়ে মারজানা ইসলাম আনিকার সঙ্গে তানিমের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। পরবর্তীতে তাঁদের বিয়ের বিষয়ে আলোচনা হয়। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে আনিকা ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন সময়ে তানিমের কাছ থেকে ৮ লাখ টাকা নেন। পরে বিয়েতে টালবাহানা শুরু হলে তানিম টাকা ফেরত চান। তবে ওই টাকা ফেরত দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মামলার নথিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, টাকা ফেরত চাওয়াকে কেন্দ্র করে তানিম ও আনিকার পরিবারের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এ ঘটনায় তানিম থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগ করার পর তাঁকে মোবাইল ফোনে হুমকি দেওয়া হয় বলেও মামলায় দাবি করা হয়েছে।
পরিবারের দাবি, এসব ঘটনায় তানিম মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। আত্মহত্যার আগে তিনি একটি চিরকুট লিখে যান, যেখানে মারজানা ইসলাম আনিকা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেছেন বলে পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
মামলার নথি অনুযায়ী, গত ৪ আগস্ট রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিষপান করে তানিম বাড়িতে লুটিয়ে পড়েন। পরে পরিবারের সদস্য ও স্থানীয়রা তাঁকে দ্রুত তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসার পর অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে কিশোরগঞ্জের শহীদ সৈয়দ নজরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত সাড়ে ৩টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
ঘটনার খবর পেয়ে কিশোরগঞ্জ মডেল থানার পুলিশ একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে। জিডির নম্বর ৩০৭, তারিখ ৫ আগস্ট ২০২৬।
এ ঘটনায় তানিমের পরিবারের পক্ষ থেকে মারজানা ইসলাম আনিকা (২০), আছেমা (৪৫), শ্রাবণ (২৫), দিপু আক্তার (২৬), আবু বকর (৫০), সুমী আক্তার (৪৭) ও সুচনা (২২)-এর বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের আদালতে দণ্ডবিধির ৩০৬/৪০৬/৪২০/১০৯/৩৪ ধারায় মামলা করা হয়েছে। মামলাটি ২০ আগস্ট ২০২৬ তারিখে দায়ের করা হয়। মামলার নম্বর ৩১৭।
মামলার নথি সূত্রে জানা গেছে, মামলাটি তদন্তের জন্য ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি)-এ পাঠানো হয়েছে।
মামলার সাক্ষী ও তানিমের ভগ্নিপতি সিএনজি চালক সজল মিয়া অভিযোগ করে বলেন, “মামলা করার পর থেকেই আসামিরা মামলা তুলে নেওয়ার জন্য আমাদের হুমকি দিয়ে আসছে।” তিনি এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
এদিকে একমাত্র উপার্জনক্ষম ছেলেকে হারিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে তানিমের পরিবার। ছেলের ছবি হাতে নিয়ে তাঁর মা ন্যায়বিচারের আশায় দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তাঁর দাবি, ছেলের মৃত্যুর ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন করে দায়ীদের আইনের আওতায় এনে বিচার নিশ্চিত করা হোক।
অভিযুক্ত মারজানা ইসলাম আনিকাসহ অন্য আসামিদের বক্তব্য জানতে তাঁদের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি। ফলে চিরকুটে উত্থাপিত অভিযোগ, টাকা লেনদেন, হুমকি এবং মামলা তুলে নেওয়ার হুমকিসহ মামলায় আনা অভিযোগের বিষয়ে আসামিপক্ষের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে চিরকুটের বক্তব্য, টাকা লেনদেন, হুমকি এবং আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগের সত্যতা তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে।