বিশেষ প্রতিনিধি:
সনাতনীরা ‘একদফা একদাবি ৮ দফা মানতে হবে’,‘প্রশাসন নীরব কেন? জবাব চাই দিতে হবে’,‘আমার মায়ের কান্না…… বৃথা যেতে দিব না’,‘আমার দেশ সবার দেশ, বাংলাদেশ বাংলাদেশ’, ‘আমার মাটি আমার মা, এই দেশ আমরা ছাড়বো না’,‘রক্তে আগুন লেগেছে, সনাতনীরা জেগেছে’,‘আমার ঘরে আগুন কেন,জবাব চাই দিতে হবে’,‘আমার মন্দিরে হামলা কেন, জবাব চাই দিতে হবে’,‘ হিন্দুদের উপর হামলা কেন?জবাব চাই,দিতে হবে’,‘বৈষম্যহীন বাংলায়, সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নাই’, ‘কথায় কথায় বাংলা ছাড়,বাংলা কি তোর বাপ- দাদার’,‘লাখো শহীদের বাংলায় সাম্প্রদায়িকতার ঠাঁই নাই’,‘লড়াই লড়াই লড়াই চাই লড়াই করে বাঁচতে চাই’সহ বিভিন্ন স্লোগান দিতে থাকে।
গতকাল শুক্রবার (১৩ সেপ্টেম্বর) বিকালে চট্টগ্রামের জামালখান মোড়ে আয়োজিত সমাবেশে চট্টগ্রাম ও সারাদেশের বিভিন্ন জেলা/উপজেলা ও পৌরশহরের ওয়ার্ডগুলো থেকে লাখো সনাতনীরা অংশগ্রহণ করেন।
ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী দেশব্যাপী মন্দির, হিন্দু বাড়িঘরে হামলা,শিক্ষকদের জোর করে পদত্যাগ, খুলনায় উৎসব মন্ডলের উপর বিচারবর্হিভূত হামলা এবং আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা প্রদানের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে সম্মিলিত সনাতনী সমাজ-বাংলাদেশ।
অন্তর্বর্তীকালীণ সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড.মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে উত্থাপিত ৮ দফা দাবি দ্রুত বাস্তবায়ন চাওয়া হয় সমাবেশ থেকে,কারণ এর আগেও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার সাথে বৈঠক হয়েছিলো। তখন মাননীয় উপদেষ্টা সংখ্যালঘুদের দাবি যৌক্তিক বলে স্বীকার করে দাবি পূরণের আশ্বাস দিয়েছিলেন।
আট দফা দাবি আদায়ে উক্ত সমাবেশ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সম্মিলিত সনাতনী সমাজ- বাংলাদেশের অন্যতম মুখপত্র ও পুন্ডরীক ধামের অধ্যক্ষ চিন্ময় কৃষ্ণ দাস ব্রহ্মচারী।
উপস্থিত ছিলেন সাধক সন্ন্যাসীরাও,তবে একই মঞ্চে। তখন বক্তারা বলেন, বাংলাদেশে সরকার আসে সরকার যায়,কিন্তু সনাতনীদের ভাগ্যবদল হয় না। কোনোকিছু হলেই সনাতনীদের ওপর হামলা হয়। তাদের বাড়িঘরে ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করা হয়।
কিন্তু ৫৩ বছরে এদেশে কোনো সরকার সনাতনীদের হামলার বিচার করেনি। সনাতনীদের ওপর হামলার বিষয়ে যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে তার কারণে হামলকারীরা উৎসাহিত হয়। সনাতনীদেরকে সব সময় রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এসব বিষয় থেকে সনাতনীরা মুক্তি পেতে চায়।
তারা বলেন,গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর আমরা মনে করেছিলাম একটি বৈষম্যহীন সমাজ ব্যবস্থা পাবো। কিন্তু ৫ আগস্ট পরবর্তী দেশের ৪৯টি জেলায় সনাতনীদের বাড়ি,মন্দির ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়েছে।
প্রথম আলোর সংবাদ অনুযায়ী ৫ থেকে ২০ আগস্ট পর্যন্ত ১০৬৮টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। এরপরও বিভিন্ন স্থানে ঘটনা ঘটেছে। যদিও এর সংখ্যা আরও বেশি। তাহলে এসব ঘটনা যদি ঘটে থাকে তবে ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? সনাতনীরা আন্দোলন সংগ্রাম করতে জানে,অধিকার আদায়ও করতে জানে। প্রধান উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি যেন সনাতনীদের জন্য শান্তির একটি দেশ প্রতিষ্ঠা করতে পারে সেই আশা করবো আমরা।
বক্তারা আরও বলেন আসন্ন দুর্গাপূজা নিয়ে সনাতনীরা আতঙ্কিত। সুন্দরভাবে সনাতনীদের এই সর্ববৃহৎ উৎসব উদযাপনের জন্য বৃহতর পরিকল্পনা গ্রহণ করা দরকার। এছাড়া দুর্গাপূজায় ছুটি বাড়ানোর বিষয়ে সরকার এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো ঘোষণা দেয়নি। ঘোষণার বিষয়ে আমরা জানতে চাই। পাশাপাশি হামলার ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্থ মন্দির ও বাড়িঘর সরকারীভাবে মেরামত ও সংস্কার করতে হবে। এছাড়া যারা নিহত হয়েছে তাদের বিষয়ে তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
আগামী ১ মাস দেশের বিভিন্ন জেলা,উপজেলা,পাড়া ও মহল্লায় ৮ দফা দাবির সমর্থনে গণসংযোগ হবে। দুর্গাপূজার আগে ৮ দফা দাবি বাস্তবায়নের বিষয়ে দৃশ্যমান পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে,কঠোর আন্দোলন করা হবে।
এসময় আরও বক্তব্য রাখেন পটিয়া পাচুরিয়া তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ রবীশ্বরানন্দ পুরী মহারাজ, বাঁশখালী ঋষিধামের মোহন্ত সচিদাননন্দ পুরী মহারাজ, ইসকন প্রবর্তক শ্রীকৃষ্ণ মন্দিরের অধ্যক্ষ লীলারাজ গৌর দাস ব্রহ্মচারী, নন্দনকানন মন্দিরের সাধারণ সম্পাদক তারণনিত্যানন্দ দাস ব্রহ্মচারী, তপোবন আশ্রমের অধ্যক্ষ প্রাঞ্জলানন্দ পুরী মহারাজ, শ্রীমৎ মুরারী দ্স বাবাজী, শ্রীমৎ কৃষ্ণ দাস বাবাজী, শ্রীমৎ স্বরূপ দাস বাবাজী, উজ্জ্বলানন্দ ব্রহ্মচারী, সম্মিলিত সনাতনী সমাজ বাংলাদেশের সমন্বয়ক স্বতন্ত্র গৌরাঙ্গ দাস ব্রহ্মচারী, কাঞ্চন আচার্য্য, ডা. যীশুময় দেব, সুব্রত দাশ আকাশ,টিটু শীল, বাংলাদেশ হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীস্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সাংগঠনিক সম্পাদক রাজীব ধর তমাল, উজ্জ্বল বরণ বিশ্বাস,বিপ্লব চৌধুরী বিল্লু প্রমুখ।
আট দফা দাবি গুলো হলোঃ-
১) সংখ্যালঘু নির্যাতনের বিচারের জন্য দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল গঠন করে দোষীদের দ্রুততম সময়ে উপযুক্ত শাস্তি প্রদান, ক্ষতিগ্রস্থদের যথাপোযুক্ত ক্ষতিপূরণ প্রদান ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
২) অনতিবিলম্বে সংখ্যালঘু সুরক্ষা আইন প্রনয়ন করতে হবে।
৩) সংখ্যালঘু বিষয়ক মন্ত্রণালয় গঠন করতে হবে।
৪) হিন্দুধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টকে হিন্দু ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে। পাশাপাশি বৌদ্ধ ও খ্রিষ্টানধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টিকেও ফাউন্ডেশনে উন্নীত করতে হবে।
৫) ‘দেবোত্তর সম্পত্তি পুনরুদ্ধার ও সংরক্ষণ আইন প্রণয়ন এবং অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পন আইন’ যথাযথ বাস্তবায়ন করতে হবে।
৬) প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সংখ্যালঘুদের জন্য উপাসনালয় নির্মাণ এবং প্রতিটি হোস্টেলে প্রার্থনা রুম বরাদ্দ করতে হবে।
৭) সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড,আধুনিকায়ন করতে হবে।
৮) শারদীয় দুর্গাপূজায় ৫ দিন ছুটি দিতে হবে।
সিলেট নিউজ/এসডি.