সিলেট নিউজ ডেস্ক :
সবেমাত্র ক্লাস নাইনে ভর্তি হয়েছিল তামান্ন। বোরকা পড়েই স্কুলে যেত সে। প্রথম কিছুদিন স্যাররা কিছু বলেনি।
কিন্তু কিছুদিন পর এক স্যার হঠাৎ তাকে দাঁড় করিয়ে বলেছিল – এই মেয়ে মুখ খুলো, স্কুলে বোরকা পড়ে আসো কেন?
স্যারকে এভাবে বলতে শুনে থতমত খেয়ে যায় সে। গাজীপুরের ওই স্কুলে নতুন ভর্তি হয়েছিল তাই একটু ভয়ও পাচ্ছিল সে।
তবুও সে তার জায়গায় অটুট ছিল। বোরকা খুলে মুখ দেখায়নি সে।
এজন্যে ওই স্যার রেগে রেগে ধমক দিয়ে বলেছিল- হয় মুখ খুলবা, না হয় ক্লাস থেকে বের হয়ে যাবা।
তামান্না বুঝতে পারছিল না কি করবে। এতদিনের করা ইসলামের পর্দার বিধান লঙ্ঘন করবে না-কি বের হয়ে যাবে? এসব ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়।
কিন্তু পর্দার প্রতি তার এতটা অটুট সম্মান ছিল যে সে বোরকা খুলেনি। ওই বেঞ্চে চুপচাপ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। ভেবেছিল স্যার হয়তো মাফ করে দিবে, আর রাগারাগি করবে না।
কিন্তু স্যারটা আরও বেশি ক্ষেপে যায় এবং হাজিরা খাতায় তার রোল কল না করে তাকে ধমকিয়ে ক্লাস থেকে বের করে দেয়।
প্রচন্ড অপমান এবং কষ্ট নিয়ে ক্লাস থেকে বের হতে হয়েছিল তাকে। পুরোটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল সে।
এরপর স্কুলের গন্ডি পেরিয়ে গাজীপুরে বাহিনী দ্বারা পরিচালিত একটা কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিল তামান্না।
তার বাসা থেকে কলেজটা কাছাকাছি হওয়ায় সেখানেই ভর্তি হতে চেয়েছিল সে। তাই তার বাবাকে পাঠিয়েছিল কলেজের স্যারদের সাথে কথা বলতে।
তামান্নার বাবা কলেজে কথা বলতে যাওয়ার পর স্যাররা তামান্নার রেজাল্টের কথা শুনে প্রচন্ড প্রশংসা করেছিল।
কিন্তু যখনই তামান্নার বাবা জিজ্ঞেস করল- আমার মেয়েটা কলেজে বোরকা পড়ে আসতে পারবে কি-না? এরপর স্যাররা নাকমুখ কুচকে বাজে একটা রিয়্যাকশন দিয়েছিল।
তাই তামান্নার বাবা সেদিন সেখান থেকে বের হয়ে এসেছিলেন। তামান্নারও আর সে কলেজে পড়া হয়নি। কষ্ট করে ভর্তি হতে হয়েছিল দূরের একটা কলেজে।
তারপর কলেজ থেকে ভালো রেজাল্ট করে সে চান্স পেয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা দিতে আসার সময়ও তার বোরকা এবং হিজাব নিয়ে গার্ডের স্যাররা হাসাহাসি করেছিল, পরীক্ষাতে সমস্যা করেছিল।
ঢাবিতে ভর্তি হওয়ার পর ক্লাস করার সময় এক স্যার তাকে সবসময় ক্লাসে দাঁড় করিয়ে রাখতো। মজার ছলে ক্লাসের বাকিদেরকে জিজ্ঞেস করতো – এই বোরখা পড়া মেয়েটাকে চিনো কি-না দেখো তো।
ঢাবিতে পড়াকালীন সময়ে তামান্না বিবাহিত ছিল তাই ওই স্যার প্রতি ক্লাসে এসেই তাকে দাঁড় করিয়ে রাখতো আর অপমান করে বলতো- এই বয়সে বিয়ে কেন করলা? তুমি তো মর্ডাণ না,ক্ষ্যাত।
এসব অপমান করার সময় স্যারটা পৈশাচিক একটা হাসি দিতো যেন বোরখা পড়া মেয়েদেরকে অপমান করতে তার ভালোই লাগে।
তামান্না তখন কিচ্ছু বলেনি, দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে গিয়েছে আর আল্লাহর কাছে বিচার দিয়েছে শুধু।
ডাকসু নির্বাচনের সময়ও বামপন্থী এবং ছাত্রদলের পোলাপানরা তার পোস্টারে শিং একে দিয়েছিল, কালি দিয়ে চোখমুখ বিকৃত করে দিয়েছিল।
ছাত্রলীগের পোলাপানরাও তাকে নিয়ে কটুক্তি করতো, বোরখা পড়ায় বাজে ইঙ্গিত দিতো। তার সাথের বাকি মেয়েদেরকেও হিজাবী মা*গী বলে গালি দিতো।
তার এতসব শাস্তির একটাই অপরাধ ছিল- সে বোরকা পড়তো, হিজাব পড়তো, ইসলামিক রীতিগুলো মানতো।
বোরখার জন্যে এতসব নির্মম কষ্ট সহ্য করা তামান্না এবারের ডাকসু নির্বাচনে জিতেছে। সে একাই ১০ হাজারেরও বেশি ভোট পেয়েছে।
তার নাম মাইকে ঘোষণা করার সময় সবাই জোরে জোরে হাততালি দিচ্ছিল, হিজাব হিজাব বলে স্লোগান দিচ্ছিল। কারণ- এই হিজাবের কারণেই এতদিন এতটা কষ্ট পেতে হয়েছিল তার।
সবাই যখন তার নাম ধরে স্লোগান দিচ্ছিল তামান্না তখন খুশিতে কেঁদে ফেলেছিল। কান্নারত কন্ঠে পাশের মেয়েদের জড়িয়ে ধরেছিল।
সবাই যখন উল্লাস করছিল, হাততালি দিচ্ছিল, তার নাম ধরে চিৎকার করছিল, ছলছল করা চোখে তামান্নার তখন মনে পড়ছিল ক্লাস নাইনের কথা।
তামান্নার বারবার মনে পড়ছিল- সামান্য বোরখা পড়ার জন্যে তার স্যার তাকে ক্লাস থেকে বের করে দিয়েছিল।
সেদিন পুরোটা রাস্তা কাঁদতে কাঁদতে বাড়ি ফিরেছিল তামান্না!
লেখা- Ibrahim Khalil Shawon