মোঃ মাহবুব আলম
স্টাফ রিপোর্টার:
বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) সম্প্রতি ৪৬তম বিসিএসের লিখিত পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ করেছে। ফলাফল প্রকাশের পর থেকেই পরীক্ষার্থী ও বিভিন্ন পেশাজীবী মহলে ব্যাপক আলোচনা ও বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে দেশের চলমান চিকিৎসক সংকটের প্রেক্ষাপটে স্বাস্থ্য ক্যাডারে অস্বাভাবিকভাবে কম সংখ্যক উত্তীর্ণ হওয়া নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পিএসসি’র প্রকাশিত সার্কুলার অনুযায়ী, ৪৬তম বিসিএসে মোট ৩,১৪০টি ক্যাডার পদের মধ্যে সর্বাধিক পদ ছিল স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে। পরিবার পরিকল্পনা ক্যাডারে (১,৬৪:২+১৬+৪৯) মোট ১,৭৪৭টি শূন্য পদ থাকলেও লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চিকিৎসকের সংখ্যা মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। ফলে প্রায় ১,৫০০ পদ শূন্য থেকে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে, যা দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের ধাক্কা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রিলিমিনারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন প্রায় ১,৫৫৪ জন চিকিৎসক। তুলনামূলকভাবে সহজ প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও পুরো বিসিএসে ২১,৩৯৭ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ভাইভার জন্য নির্বাচিত হয়েছেন মাত্র ৪,০৪৬ জন, যা মোট পরীক্ষার্থীর প্রায় ১৮ শতাংশ।
ফলাফল প্রকাশের পাঁচ দিন পর ‘কারিগরি ত্রুটি’র কথা উল্লেখ করে ৮ জনকে নতুন করে উত্তীর্ণ এবং ২ জনকে অনুত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তীতে প্রায় দুই সপ্তাহ পর আরও ২ জন পরীক্ষার্থীকে অনুত্তীর্ণ ঘোষণা করা হয়। এ ধরনের বারবার ফলাফল পরিবর্তনের ঘটনা ফলাফলের স্বচ্ছতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
এছাড়া টেকনিক্যাল ক্যাডারে মোট উত্তীর্ণের সংখ্যা প্রায় ৭,০০৮ হলেও এর মধ্যে স্বাস্থ্য ক্যাডারের অংশ অত্যন্ত কম। আরও বিস্ময়কর বিষয় হলো—পূর্ববর্তী বিসিএসগুলোতে প্রশাসন, পুলিশ, পররাষ্ট্র কিংবা স্বাস্থ্য ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত অনেক পরীক্ষার্থী এবার লিখিত পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারেননি।
ফলাফল নিয়ে বিভিন্ন মহলে যেসব তত্ত্ব ও অভিযোগ আলোচিত হচ্ছে তার মধ্যে রয়েছে—পিএসসি সরবরাহকৃত নমুনা উত্তরপত্র অনুসরণ করে খাতা মূল্যায়ন, দ্রুত নিয়োগের লক্ষ্যে পাশ মার্ক ৫০ শতাংশের নিচে নির্ধারণ না করা, নতুন কমিশনের অধীনে বারবার কারিগরি ত্রুটি এবং ফলাফল প্রকাশের পর একাধিকবার রেজাল্ট পরিবর্তনের ঘটনা।
এ বিষয়ে পিএসসি চেয়ারম্যান একটি শীর্ষস্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, লিখিত পরীক্ষায় পাশ মার্ক ৪৫০ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং পিএসসি একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হওয়ায় খাতা পুনর্মূল্যায়নের সুযোগ নেই। তবে এসব ব্যাখ্যার পরও সংশ্লিষ্ট পরীক্ষার্থীদের প্রশ্ন ও উদ্বেগ থেকেই যাচ্ছে।
এদিকে বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন চাকরি-প্রত্যাশী কমিউনিটি ও পরীক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরব হলেও চিকিৎসক সমাজের অনেক সিনিয়র ও নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো অবস্থান বা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়নি।
ভুক্তভোগী পরীক্ষার্থীরা জানান, তারা ইতোমধ্যে সরকারি কর্ম কমিশন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সঙ্গে শান্তিপূর্ণভাবে যোগাযোগ করেছেন। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো মৌখিকভাবে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখার আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি।
পরীক্ষার্থীদের অনেকের জন্য ৪৬তম বিসিএসই শেষ সুযোগ। তাদের পরিবার-পরিজনের ভবিষ্যৎ এ পরীক্ষার সঙ্গে জড়িত বলে জানান তারা। সংশ্লিষ্টরা স্পষ্ট করে বলেন, তারা কোনো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অসংযত অভিযোগ বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান না। বরং দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থা শক্তিশালী করার স্বার্থে ৪৬তম বিসিএসে স্বাস্থ্য ক্যাডারের ১,৭৪৭টি শূন্য পদ পূরণের জন্য সরকারি কর্ম কমিশন বিধিমালা-২০১৪ এর ২০(২) উপবিধির যথাযথ বাস্তবায়ন এবং পিএসসি’র কার্যকর সহযোগিতা কামনা করছেন।