জাকির হোসেন, বানারীপাড়া (বরিশাল) প্রতিনিধি:
এক চিলতে টিনের ঘর, তাতে মাটির সোঁদা গন্ধ আর অভাবের নিত্য আনাগোনা। নুন আনতে পান্তা ফুরানো দিনমজুর বাবার সংসার। মা প্রতিদিন একটুখানি আলোর স্বপ্নে আঁধার ঘরে প্রদীপ জ্বালান। সেই ঘরেই বেড়ে ওঠা ছেলেটির বুকভরা স্বপ্ন—সে পড়বে, মানুষের মতো মানুষ হবে। সব প্রতিকূলতাকে পেছনে ফেলে অবশেষে সেই স্বপ্নের প্রথম জয় এসেছে। ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫.০০ পেয়ে পুরো এলাকাকে তাক লাগিয়ে দিয়েছে বানারীপাড়ার জবেদপুর গ্রামের দিনমজুর মোঃ ফারুক হোসাইনের ছেলে তাওহীদ ইসলাম। কিন্তু এই সোনালী সাফল্যের হাসির আড়ালেই লুকিয়ে আছে এক অসীম বেদনার গল্প। ফলাফলের আনন্দে পুরো পরিবার যখন হাসার কথা, তখন তাদের চোখের কোণে শুধুই নোনা জল। কারণ, এসএসসির গণ্ডি তো পার হলো, কিন্তু এরপর? কীভাবে হবে ভালো কোনো কলেজে ভর্তি? বই-খাতা, যাতায়াত আর পড়াশোনার খরচ জোগাবে কে? “স্যার, আমি পড়াশোনা করে বড় হতে চাই… কিন্তু আমার তো কোনো সামর্থ্য নেই।”
আজকের এই জিপিএ-৫ পাওয়ার পেছনে লুকিয়ে আছে এক শিক্ষকের পরম মমতা আর মানবতার স্পর্শ। অষ্টম শ্রেণি পাস করার পর তাওহীদের নিজের স্কুলে বিজ্ঞান শাখা না থাকায় থমকে গিয়েছিল তার পড়াশোনা। দিনমজুর বাবার পক্ষে ভালো স্কুলে ভর্তি করানোর সাধ্য ছিল না। একদিন সরকারি বানারীপাড়া মডেল ইউনিয়ন ইনস্টিটিউশনের মাঠে একপাশে একা বসে থাকা এক অসহায় বালককে দেখে এগিয়ে এসেছিলেন শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ। কচি গলায় তাওহীদের আকুতি গলে গিয়েছিল সেই শিক্ষকের মন। বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের বিশেষ অনুমতি নিয়ে শিক্ষক পলাশ স্যারই তাকে নবম শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে দেন।
শিক্ষকের সেই বিশ্বাসের মর্যাদা তাওহীদ রেখেছে নিজের রক্তজল করা পরিশ্রমে। নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষা থেকে শুরু করে আজকের এই এসএসসি পরীক্ষা—মেধার আলোয় সে বারবার প্রমাণ করেছে, সদিচ্ছা থাকলে কোনো দারিদ্র্যই পথ আটকাতে পারে না। কিন্তু গল্পের সুন্দর সমাপ্তি তো এখানেই হতে পারত, যদি দারিদ্র্যের নিষ্ঠুর বাস্তব থাবা না বাড়াত। তাওহীদের শিক্ষক নিয়াজ মাহমুদ পলাশ গর্বিত গলায় দোয়া চেয়েছেন প্রিয় ছাত্রের জন্য। কিন্তু প্রতিদিনের রোজগারে পরিবার চালাতে হিমশিম খাওয়া দিনমজুর বাবার কাছে আজ ছেলের উচ্চশিক্ষা এক অচেনা পর্বতসম পাহাড়।
একটি চারা গাছ কেবল কুঁড়ি মেলেছে, ফুল হয়ে ফোটার আগেই কি ঝরে যাবে সে? নিভে যেন না যায় এই মেধার আলো
আজ বানারীপাড়ার জবেদপুর গ্রামের মানুষ তাওহীদের দিকে তাকায় আশা ও বুকচাপা কষ্ট নিয়ে। যে ছেলেটি মেধার জোর দেখিয়ে আঁধার ঘরে আলোর প্রদীপ জ্বালিয়েছে, সমাজের হৃদয়বান মানুষদের সামান্য ভালোবাসাই পারে সেই আলোকে পুরো দেশের জন্য আলোকময় করে তুলতে। কোনো এক সহৃদয় ব্যক্তি, শিক্ষানুরাগী বা মানবিক প্রতিষ্ঠান কি এগিয়ে আসবে তাওহীদের এই স্বপ্নযাত্রাকে বাঁচিয়ে রাখতে? আজকের এই তাওহীদের পাশে একটুখানি দাঁড়ালে কাল সে-ই হয়ে উঠতে পারে পরিবার, সমাজ ও দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ।
প্রতিভা তো ধনী কিংবা দরিদ্র চিনে জন্মায় না। তাওহীদ তার মেধার প্রমাণ দিয়েছে, এখন বাকি দায়িত্ব আমাদের। আসুন, মেধার এই জ্বলন্ত শিখাটি অর্থের অভাবে নিভে যাওয়ার আগেই আমরা তার পাশে দাঁড়াই।