জগন্নাথপুর (সুনামগঞ্জ) প্রতিনিধি:
নির্বাচন এলে প্রার্থীদের মুখে প্রতিশ্রুতির খৈ ফোটে, ভোট চাইতে প্রার্থীরা এই হাঁটুপানি ভেঙেই চলাচল করেন। সবাই বলেন, ‘আমাকে ভোট দিলে কাজ করে দেবো।’ এমনকি যিনি দু-দুবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছেন, তিনিও এই পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে পারেননি!
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা পরিষদ সংলগ্ন জগন্নাথপুর পৌরসভার ৬ নং ওয়ার্ডের বাসুদেব বাড়ি এলাকার প্রধান সড়কটিতে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় তীব্র জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় জমছে হাঁটুপানি। ফলে চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন ওই এলাকার শত শত মানুষ। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বারবার পৌরসভায় লিখিত আবেদন জানানো সত্ত্বেও প্রশাসন কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না।
জমিদার আমলের ইতিহাস ও ঐতিহ্যবাহী মন্দির
এলাকার ভুক্তভোগীরা জানান, এই এলাকায় একসময় বিখ্যাত জমিদার বিজয় সিংহের রাজত্ব বা এরিয়া ছিল। কালের বিবর্তনে আজ আর সেই জমিদারি নেই, তবে রয়ে গেছে রাজা বিজয় সিংহের আমলের একটি ঐতিহ্যবাহী বাসুদেব মন্দির। এই ঐতিহাসিক মন্দিরে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভক্ত ও দর্শনার্থীরা আসেন। এছাড়া এই সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন সরকারি কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীসহ শত শত মানুষ যাতায়াত করেন। কিন্তু রাস্তাটির বেহাল দশা ও স্থায়ী জলাবদ্ধতার কারণে বর্তমানে যাতায়াত প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে।
৪৫ ফুটের সরকারি খাল দখল, উচ্ছেদে স্থবিরতা
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় ৪৫ ফুট প্রশস্ত একটি সরকারি খাল রয়েছে, যা এলাকার পানি নিষ্কাশনের মূল মাধ্যম ছিল। কিন্তু কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি অবৈধভাবে খালের জায়গা দখল করে স্থাপনা নির্মাণ করায় পানি নিষ্কাশনের পথ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। এর আগে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সরকারিভাবে এই খালটি চিহ্নিত করে দখলদারদের নামের তালিকা করা হলেও, আজ পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
ক্ষুব্ধ এলাকাবাসীর বক্তব্য
বাসুদেব বাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী সুবল দেব ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন:
”আমাদের প্রতিদিন এই রাস্তায় হাঁটুপানি ভেঙে ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে হয়। পানি নিষ্কাশনের জন্য আমরা অনেকবার পৌরসভায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছি, কিন্তু আজ পর্যন্ত কোনো সমাধান হয়নি। আমরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং পৌর প্রশাসকের সুদৃষ্টি ও দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।”
এলাকার সাবেক কাউন্সিলর মুকুল ভট্টাচার্য বলেন, “পানি নিষ্কাশনের ড্রেনেজ ব্যবস্থা না থাকায় সামান্য বৃষ্টিতেই রাস্তায় হাঁটুপানি জমে থাকে। জনসাধারণের এই দুর্ভোগ লাঘবে কর্তৃপক্ষের দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।”
ক্ষোভ প্রকাশ করে স্থানীয় বাসিন্দা নিয়তি বালা দাস বলেন, “এই রাস্তা দেখার যেন কেউ নাই। ভোটের সময় প্রার্থীরা সব করে দেবেন বলে আশ্বাস দিলাইন (দিয়েছিলেন), কিন্তু পরে আর খবর থাকে না। জলাবদ্ধতার কারণে কোনো ভালো মানুষ এই এলাকায় আসতে চায় না।”
একই এলাকার বাসিন্দা লিটন দেব বলেন, “পৌরসভার প্রশাসক ও কর্মকর্তাদের একবার এই রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়া প্রয়োজন, তাহলেই তারা আমাদের কষ্ট চোখে দেখতে পাবেন। হাঁটুপানির নোংরা জলের কারণে আমরা ভালো কাপড়চোপড় পরে কোথাও বের হতে পারছি না।”
আশার বাণী শোনাল পৌর কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে জগন্নাথপুর পৌরসভার সচিব হেলাল আহমেদ জানান, তারা বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। তিনি বলেন, “আমরা এই রাস্তার জলাবদ্ধতা নিরসনে দ্রুত একটি ব্যবস্থা নিচ্ছি।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু মুখের আশ্বাসের বাণী আর শুনতে চান না তারা। উপজেলা প্রশাসন ও পৌর কর্তৃপক্ষ যেন দ্রুত খালের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে স্থায়ী ড্রেনেজ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে এই প্রাচীন জনপদকে অভিশাপমুক্ত করবো