বিশেষ প্রতিনিধি:
মৌলভীবাজারে এবারের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফলাফল জেলার শিক্ষাব্যবস্থার সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার দুটি বিপরীত চিত্র সামনে এনেছে। একদিকে ৭২৫ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়ে কৃতিত্বের স্বাক্ষর রেখেছে,অন্যদিকে ৮ হাজার ৭৫৩ জন পরীক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে। ফলে জেলার সামগ্রিক শিক্ষার মান ও পিছিয়ে পড়ার কারণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সিলেট শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মৌলভীবাজার জেলায় এ বছর এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নেয় ১৯ হাজার ৮৫৬ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে উত্তীর্ণ হয়েছে ১১ হাজার ১০৩ জন। জেলার গড় পাসের হার ৫৫ দশমিক ৯২ শতাংশ। অর্থাৎ পরীক্ষায় অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের প্রায় ৪৪ শতাংশই উত্তীর্ণ হতে পারেনি।
ফলাফলের এই চিত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, একই জেলার ৭২৫ জন শিক্ষার্থী যেখানে সর্বোচ্চ ফলাফল অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে,সেখানে এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী কেন পাস করতে পারল না। জেলা সদর ও পৌর এলাকার প্রতিষ্ঠিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি কুলাউড়া,বড়লেখা, জুড়ী,রাজনগর,শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানও ভালো ফল করেছে। এমনকি গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার কিছু বিদ্যালয় প্রত্যাশার চেয়েও ভালো ফলাফল করেছে। এতে স্পষ্ট হয়, প্রয়োজনীয় সুযোগ,দক্ষ পাঠদান ও যথাযথ দিকনির্দেশনা পেলে জেলার শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ ভালো ফল করার সক্ষমতা রাখে।
তবে এর বিপরীতে অনেক প্রতিষ্ঠানে কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। কোথাও কোথাও পাসের হার নেমে গেছে উদ্বেগজনক পর্যায়ে। শিক্ষাবিদদের মতে,ইংরেজি ও গণিতের মতো আবশ্যিক বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দুর্বলতা সামগ্রিক ফলাফলে বড় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে গ্রামীণ ও মফস্বল এলাকার কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিষয়ভিত্তিক দক্ষতার ঘাটতি, নিয়মিত অনুশীলনের অভাব এবং দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা সহায়তার ব্যবস্থা না থাকা গুরুত্বপূর্ণ কারণ হতে পারে।
তবে শুধু একটি বা দুটি কারণ দিয়ে এত শিক্ষার্থীর অকৃতকার্য হওয়ার ব্যাখ্যা দেওয়া সম্ভব নয়। শিক্ষাবিদদের মতে,ফলাফলের প্রকৃত চিত্র বুঝতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ও বিষয়ভিত্তিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। কোন উপজেলায় কতজন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে,কোন প্রতিষ্ঠানে পাসের হার সবচেয়ে কম,কোন বিষয়ে সবচেয়ে বেশি শিক্ষার্থী ব্যর্থ হয়েছে এবং গত কয়েক বছরের তুলনায় প্রতিষ্ঠানগুলোর ফলাফলে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে,তা খতিয়ে দেখা জরুরি।
বিশেষ করে শ্রীমঙ্গল ও কমলগঞ্জের চা-বাগান অধ্যুষিত এলাকার ফলাফলেও সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার মিশ্র চিত্র দেখা গেছে। নানা আর্থসামাজিক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও এসব এলাকার অনেক শিক্ষার্থী ভালো ফল করেছে। কেউ কেউ জিপিএ-৫ অর্জন করে দেখিয়েছে,প্রতিকূল পরিবেশ মেধা বিকাশের পথে একমাত্র বাধা নয়। তবে একই বাস্তবতায় অনেক শিক্ষার্থী কাঙ্ক্ষিত ফল করতে পারেনি। আর্থিক সংকট,পারিবারিক বাস্তবতা, পড়াশোনার অনুকূল পরিবেশের অভাব এবং প্রয়োজনীয় একাডেমিক সহায়তার ঘাটতি এর পেছনে ভূমিকা রাখতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের ধারণা।
শিক্ষাবিদদের মতে,একটি জেলার শিক্ষার মান শুধু জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা দিয়ে বিচার করা ঠিক নয়। ৭২৫ জনের জিপিএ-৫ যেমন শিক্ষার্থীদের মেধা ও সম্ভাবনার প্রমাণ,তেমনি ৮ হাজার ৭৫৩ জনের অকৃতকার্য হওয়ার ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার বড় একটি অংশের দুর্বলতাকেও সামনে আনে। তাই ভালো ফল করা শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদযাপনের পাশাপাশি পিছিয়ে থাকা শিক্ষার্থীদের সমস্যার কারণও গুরুত্ব দিয়ে খুঁজে বের করতে হবে।
এ জন্য ফল প্রকাশের পর সাময়িক আলোচনার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফল বিশ্লেষণের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন শিক্ষাবিদরা। যেসব প্রতিষ্ঠান ধারাবাহিকভাবে খারাপ ফল করছে,সেগুলো চিহ্নিত করে শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সহায়তা, ইংরেজি ও গণিতে বিশেষ পাঠদান,নিয়মিত মূল্যায়ন ও পরীক্ষা,শিক্ষকদের পাঠদান পর্যবেক্ষণ এবং অভিভাবকদের আরও সক্রিয়ভাবে যুক্ত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে।
তাদের মতে,ফল প্রকাশের পর ব্যর্থতার কারণ খোঁজার চেয়ে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই ঝুঁকিতে থাকা শিক্ষার্থীদের শনাক্ত করা বেশি কার্যকর। নিয়মিত মূল্যায়নের মাধ্যমে কোন শিক্ষার্থী কোন বিষয়ে পিছিয়ে আছে,তা চিহ্নিত করে সময়মতো সহায়তা দেওয়া গেলে অকৃতকার্যের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
এবারের ফল প্রকাশের পর বিদ্যালয়গুলোতে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেমন আনন্দ-উচ্ছ্বাস চলছে,তেমনি হাজারো শিক্ষার্থীর পরিবারে নেমে এসেছে হতাশা। এই দুই বাস্তবতাকে পাশাপাশি রেখে জেলার শিক্ষাব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
মৌলভীবাজারের ৭২৫ শিক্ষার্থীর জিপিএ-৫ অর্জন নিঃসন্দেহে গর্বের বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে ৮ হাজার ৭৫৩ জনের অকৃতকার্য হওয়ার সংখ্যাটিও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এবারের ফলাফল তাই শুধু সাফল্যের হিসাব নয়,বরং শিক্ষাব্যবস্থার কোথায় ঘাটতি রয়েছে তা খুঁজে বের করার একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তাও। আগামী বছরের ফল প্রকাশের আগেই সেই বার্তা কতটা গুরুত্ব দিয়ে বাস্তব পদক্ষেপে রূপ দেওয়া যায়,এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
সিলেট নিউজ২৪/এসডি.