নিজস্ব প্রতিবেদক:
প্রকৌশলী হাসান শওকতের দুর্নীতির টাকা ক্যান্টনমেন্টে বিলাস বগুল ফ্ল্যাট সংকটে হাঁস ফাঁস শিক্ষার্থীরা
রাজধানীর পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ে ১০ তলা ভবন নির্মাণের নামে ২ কোটি ৮০ লক্ষ টাকা আত্মসাতের চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) ঢাকা মেট্রো সার্কেলের বিতর্কিত প্রকৌশলী হাসান শওকত ও একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের যোগসাজশে এই বিশাল অঙ্কের ছয় সরকারি অর্থ লোপাট করা হয়েছে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ১০ তলা ভবনের নকশা ও কার্যাদেশ থাকলেও বাস্তবে ভবনের ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে মাত্র ৮ তলা পর্যন্ত। অথচ নথিপত্রে ৯ ও ১০ তলার কাজ সম্পূর্ণ দেখিয়ে ভুয়া বিল তুলে পুরোটাই পকেটস্থ করেছেন সংশ্লিষ্ট চক্রটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, দীর্ঘদিন ধরে সরকারি ইইডির বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ লোপাট করাই এই প্রকৌশলীর প্রধান কৌশলে পরিণত হয়েছে। এভাবে অর্জিত অবৈধ অর্থ দিয়েই রাজধানী ঢাকার অভিজাত এলাকা ক্যান্টনমেন্টে কেনা হয়েছে শত কোটি টাকার বিলাসবহুল ফ্ল্যাট ও সম্পত্তি। সরকারি নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২২ সালের ১৩ জুন পরিমাপ বইয়ের (এমবি) ৪৬ থেকে ৯৪ পৃষ্ঠা পর্যন্ত ভুয়া বিবরণ তৈরি করে ৭ম চলতি বিলটি তড়িঘড়ি অনুমোদন করা হয়।
বাস্তবে যেখানে ৯ ও ১০ তলার ছাদ ঢালাইয়ের কোনো নামনিশানাই নেই, সেখানে কাগজে-কলমে মেম্ব্রেন, কাঠের সাটারিং, লিন্টেল, রড বাঁধাই ও পিলারের কাজ সম্পন্ন দেখিয়ে এই বিপুল অংকের অর্থ তুলে নেওয়া হয়। গত ৭ বছর ধরে চলা এই প্রকল্পের কাজ অর্ধসমাপ্ত ফেলে রাখায় চরম ক্ষতির মুখে পড়েছে শত শত ছাত্রী। নতুন ভবনে ক্লাস শুরু হওয়ার কথা থাকলেও কক্ষসংকটে হাঁসফাঁস অবস্থায় পাঠদান চালিয়ে যেতে বাধ্য হচ্ছেন শিক্ষকরা। অন্যদিকে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত এই দুর্নীতিলব্ধ অর্থে কোটিপতি বনে গেছেন বিতর্কিত কর্মকর্তা হাসান শওকত।
তদন্ত ও অন্যান্য প্রকল্পে দুর্নীতির জাল:
ইইডির নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্রে জানা গেছে, কেবল শেরে বাংলা বালিকা মহাবিদ্যালয়ই নয়, ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ইইডির অধীনে পরিচালিত একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে অনুরূপ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে হাসান শওকতের বিরুদ্ধে। অনেকক্ষেত্রে ঠিকাদারদের সাথে সিন্ডিকেট তৈরি করে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে বাজেট বৃদ্ধি করা এবং কাজ না করেই পরিমাপ বইয়ে (এমবি) ভুয়া তথ্য তুলে অগ্রিম বিল ছাড় করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। ইতিপূর্বে বিভাগীয় কয়েকটি তদন্তে তার অনিয়মের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলেও অদৃশ্য কোনো ক্ষমতার বলয়ে পার পেয়ে যান তিনি।
ভোগান্তিতে শিক্ষার্থীরা, ক্ষোভ অভিভাবক মহলে:
পুরান ঢাকার মতো জনবহুল এলাকায় ভালোমানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংকট দীর্ঘদিনের। শিক্ষার্থীরা স্থানসংকটের কারণে গাদাগাদি করে ক্লাস করছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রতিষ্ঠানের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষক আক্ষেপ করে বলেন, “নতুন ১০ তলা ভবনটির ওপর আমাদের অনেক আশা ছিল। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে কাজটি ঝুলে আছে। আমরা জানতে পেরেছি ভবনের ওপরের দুই তলার কাজই করা হয়নি, অথচ বিল তুলে নেওয়া হয়েছে। এটি শিক্ষার পরিবেশে সরাসরি আঘাত হানার শামিল।” অভিভাবকরা এই দুর্নীতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে অবিলম্বে হাসান শওকতসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং লোপাট হওয়া অর্থ উদ্ধারের দাবি জানিয়েছেন।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও আইনি ব্যবস্থা:
এ বিষয়ে অভিযুক্ত প্রকৌশলী হাসান শওকতের সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি এবং বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে অস্বীকৃতি জানান। অন্যদিকে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানান, সরকারি অর্থ আত্মসাৎ ও ভুয়া বিল তোলার বিষয়ে লিখিত বা সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেলে কোনো কর্মকর্তা ছাড় পাবেন না। উক্ত ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে অনুসন্ধান চালানোর জোর দাবি উঠেছে সাধারণ শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে।