নূর হোসাইন :
স্বাস্থ্যসেবা মানুষের মৌলিক অধিকার। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আমাদের সমাজে চিকিৎসার মতো পবিত্র পেশাকে পুঁজি করে গড়ে উঠেছে প্রতারণার এক বিশাল জাল। ভুয়া ডাক্তার, অনুমোদনহীন হাসপাতাল, ভেজাল ওষুধ এবং অপ্রয়োজনীয় প্যাথলজিক্যাল পরীক্ষার মাধ্যমে সাধারণ রোগীদের পকেট কাটার পাশাপাশি তাদের জীবনকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে চরম ঝুঁকির দিকে। এই প্রবণতা কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয়, এটি রীতিমতো জনস্বাস্থ্যের ওপর এক নীরব আক্রমণ।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে ছোট-বড় অনেক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। যার বেশির ভাগের নেই মানসম্মত ল্যাব বা দক্ষ জনবল। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কোনো ডিগ্রিধারী চিকিৎসক ছাড়াই একজন টেকনিশিয়ান বা সাধারণ কর্মী অপারেশন থিয়েটারে অস্ত্রোপচার করছেন। এছাড়া, কমিশন বাণিজ্যের লোভে অনেক ডাক্তার রোগীদের এমন সব অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে বাধ্য করেন, যা দরিদ্র মানুষের কাঁধে বাড়তি ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেয়।
ভুয়া চিকিৎসকদের দৌরাত্ম্য এখন এক জাতীয় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা চটকদার বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দুরারোগ্য ব্যাধি নিরাময়ের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে রোগীদের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির মুখে ফেলছে। যখন একজন অসহায় মানুষ সঠিক চিকিৎসার বদলে অপচিকিৎসার শিকার হয়, তখন কেবল একটি জীবনই ধ্বংস হয় না, একটি পুরো পরিবার নিঃস্ব হয়ে পড়ে।
এই অপরাধ দমনে কেবল আইন প্রয়োগই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন কঠোর ও নিয়মিত নজরদারি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরকে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর লাইসেন্স নবায়ন ও মান যাচাইয়ে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করতে হবে। প্রতিটি হাসপাতালের ডাক্তার ও কর্মীদের প্রোফাইল জনসমক্ষে বা যাচাইযোগ্য ডাটাবেজে থাকা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, রোগীদের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি—যেন তারা যেকোনো ডাক্তার দেখানোর আগে তার ডিগ্রি ও বিএমডিসি (BMDC) রেজিস্ট্রেশন যাচাই করে নেন।
পরিশেষে, স্বাস্থ্য খাতের এই নৈরাজ্য দূর করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব। জীবন বাঁচানোর জায়গায় কোনো ধরনের বাণিজ্য বা অপরাধ সহ্য করা যায় না। আইনের কঠোর প্রয়োগ এবং স্বচ্ছ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলেই কেবল সাধারণ মানুষ নিরাপদ স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার অধিকার ফিরে পাবে। চিকিৎসা খাতকে দালালের খপ্পর ও ভুয়া চিকিৎসকদের হাত থেকে মুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।