আজ ৯ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ, ২৪শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ

সময় : দুপুর ১২:১৩

বার : মঙ্গলবার

ঋতু : হেমন্তকাল

সৌদি গেল ১৩ পেরোনো মেয়েটি! নি’র্যাতন শেষে ফিরল তার লা’শ হয়ে

সিলেট্ম নিউজ ডেস্ক-

রান্না করা, ঘর মোছা, ঘর গুছানো থেকে শুরু সব কাজ করতে হত শি’শু উম্মে কুলসুমকে। সারাদিনের পরিশ্রম শেষে থেকে যাওয়া কিংবা উচ্ছিষ্ট খাবার থেকে চাইলে তাও মিলত না। ক্ষুধায় কাতরানো যেন নিত্যদিনের ঘ’টনা। নিজের বেতনের টাকায় আনা খাবারও নিয়ে যেত বাড়ির ছোট্ট শিশুরা।

এসব নিয়ে কথা বললেই চলতো নি’র্যাতন। কুলসুমের ওপর নজর পড়ে বাড়ির মালিকের ছেলের। একদিন সে মূর্তীমান বিভীষিকা হয়ে হাজির হলো। ১৩ বছর বয়স পার করা মেয়েটির সঙ্গে শারীরিক সম্পর্ক গড়তে চায় ওই ছেলে। একদিন তাকে জো’রপূর্বক বাথরুমে নিয়ে যাওয়ার জন্যে পিড়াপী’ড়ি শুরু করে।
ধ’র্মীয় অ’নুসা’শনের কথা মনে করিয়ে দিয়ে কুলসুম কোনোভাবেই এতে রাজি হয় না। মালিকের ছেলের সাফ কথা, ‘বাংলাদেশ থেকে তাদেরকে আনাই হয় এসব কাজের জন্য’। এক কথা দুই কথায় কুলসুমের ওপর নেমে আসে নি’র্যাতনের খড়্গ।
নিপীড়নের পর ফেলে রাখা হয় বাড়ির বাইরে। পু’লিশ কুলসুমকে উ’দ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করায়। কুলসুম এখন বেঁ’চে নেই। কয়েক মাস মৃ’ত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ে সৌদি আরব থেকে লা’শ হয়ে ফিরেছে নিজ বাড়িতে। কুলসুম ওরফে সানজিদার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজে’লার গোকর্ণ ইউনিয়নের নুরপুর গ্রামে।
সংসারে স্বচ্ছলতা ফেরানোর আশায় প্রায় ১৭ মাস আগে কুলসুমকে পাঠানো হয় সৌদি আরবে। গত শুক্রবার রাতে কুলসুমের লা’শ দেশে আসে। পরদিন এলাকার ক’বরস্থানে তার লা’শ দা’ফন করা হয়। ৯ আগস্ট সৌদি আরবের কিং ফয়সাল হাসপাতালে চিকিৎ’সাধীন অবস্থায় মা’রা যায় কুলসুম।
বাবা শহিদুল ই’সলাম ও মা নাসিমা বেগমের কাছ থেকেই কুলসুমের উপর এমন ব’র্বরতার বিষয়টি জানা। মোবাইল ফোনে প্রায়ই নি’র্যাতনের কথা জানাতো কুলসুম। বলতো দিনের পর দিন না খেয়ে থাকার কথা, বেতন না পাওয়ার কথা। তবে বেশ কয়েকমাস ধ’রে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ ছিলো না কুলসুমের।

জানুয়ারি মাসে হাসপাতালে ভর্তি থাকা অবস্থায় এক নার্সের মোবাইল ফোন থেকে সর্বশে’ষ কল করে কুলসুম। প্রায় সাড়ে তিন মিনিটের এক ভিডিও কলে দেখা যায়, হাসপাতাল থেকে পরিবারের লোকজনের সঙ্গে কথা বলছে উম্মে কুলসুম। কফিল মানে মালিক, তাকে নি’র্যাতন করে পা ভে’ঙে দিয়েছে বলে সে জানায়।

সে আর হাঁ’টচলা করতে পারছে না। ওই ভিডিও কলে সে কোমর থেকে নীচের অংশের আ’ঘাতের চিহ্নও দেখায়। ঘ’টনা সম্পর্কে জানতে সোমবার দুপুরে মোবাইল ফোনে কথা বললে মা নাসিমা বেগম কা’ন্নায় ভে’ঙে পড়েন। মেয়েকে হ’ত্যার অ’ভিযোগ এনে বাবা শহিদুল ইস’লাম বি’চার না পাওয়ার শ’ঙ্কার কথা বলেন এ প্রতিবেদকের কাছে।

বিষয়টি নিয়ে পত্রিকায় লেখালেখি করে মেয়ে হ’ত্যাকা’রীদের বি’চারও দা’বি করেন তারা। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে কুলসুম ছিলেন দ্বিতীয়। ২০১৯ সালের ৭ এপ্রিল গৃহকর্মী হিসেবে সৌদিতে যায় সে। এছাড়া সৌদি যাওয়ার স্থানীয় মাধ্যম আব্দুর রাজ্জাকের মেয়েও সেখানে যায়।
প্রথমে ৩০ হাজার টাকা দিয়ে কুলসুমকে সৌদিতে পাঠানো হয়। পরে আরো ভালো বাড়ি দেয়ার কথা হলে কুলসুমের বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা নেন আব্দুর রাজ্জাক। এদিকে কুলসুমের লা’শ আসার পর থেকেই প’লাতক রয়েছেন আব্দুর রাজ্জাক।

কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, নাসিরনগরের নূরপুর লাহাজুড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে ২০১৭ সালে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপণী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৩.০৮ পেয়ে উত্তীর্ণ হয় কুলসুম। ওই সনদপত্রে কুলসুমের জ’ন্ম তারিখ ২৬ ডিসেম্বর ২০০৬ সাল লেখা। অথচ তার পাসপোর্টে জ’ন্মতারিখ উল্লেখ আছে ১৩ মার্চ ১৯৯৩।
মূলত মেয়েকে সৌদি আরব পাঠিয়ে পরিবারের স্বচ্ছলতা আনতেই সং’শ্লিষ্টদের সহযোগিতা নিয়ে কৌশলে হেরফের করান পরিবারের সদস্যরা। ৭ মার্চ ২০১৯ ব্রাহ্মণবাড়িয়া আঞ্চলিক অফিস থেকে পাসপোর্টটি ইস্যু করা হয়। ভিসা ইস্যু হয় ২০ মার্চ।
কথা হলে পরিবারের সদস্যরা জানান, সৌদি আরবের বাড়ির মালিক ও তার ছেলে কুলসুমের দুই পা, হাত ও কোমর ভে’ঙে দেয়। ন’ষ্ট করে ফেলে একটি চোখ। এসব নি’র্যাতনের কথা জেনে স্থানীয় যে ব্যক্তির মাধ্যমে পাঠানো হয় তাকে বিষয়টি অবহিত করা হয়।
তিনি কুলসুমকে অন্য বাড়িতে দেবেন বলেও আ’শ্বস্ত করেন। ঢাকার এজেন্টও একই কথা জানান। কিন্তু ওই এজেন্টের লোকজন এক পর্যায়ে যোগাযোগ ব’ন্ধ করে দেয়। কুলসুমকে নি’র্যাতন, বেতন কম দেয়াসহ সার্বিক পরিস্থিতি বিষয়ে নাসিরনগর থানা পু’লিশ কয়েকমাস আগে লিখিতভাবে জানানো হয়।

লিখিত অ’ভিযোগ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) হিসেবে নথিভুক্ত হলেও কার্যত কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলে কুলসুমের পরিবারের অ’ভিযোগ। এদিকে, জনশ’ক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক বরাবর কুলসুমের গত ১৭ আগস্ট একটি লিখিত দেন।

সেখানে তিনি মেয়ের লাশ দেশে আনা ও আট মাসের বকেয়া বেতন পাওয়ার আবেদন করেন। মেয়ের ওপর শারীরিক, মানসিক ও যৌ’ন নি’র্যাতনের অ’ভিযোগ এনে তিনি জানান, মেসার্স এম এইচ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মেয়েকে তিনি সৌদিতে পাঠিয়েছিলেন। তবে ওই আবেদনে সৌদিতে পাঠানোর স্থানীয় মাধ্যম আব্দুর রাজ্জাকের নাম তিনি উল্লেখ করেননি।
গোকর্ণ ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান সোয়াব আহমেদ রিতুল বলেন, ‘কয়েকমাস আগে থা’নায় একটা জিডি করা হয়েছে বলে মেয়ের বাবা আমাকে জানায়। এরপর আর কিছু জানতাম না। পরবর্তীতে সেদিন মেয়েটির লা’শ আসার কথা শুনে আ’ইনি ব্যবস্থা নেয়া যায় কি-না সে বিষয়ে পু’লিশের সঙ্গে কথা বলি। মেয়েটির বাবা জানিয়েছে তার মেয়েকে সৌদিতে নি’র্যাতন করা হয়েছে।

নাসিরনগর থা’নার পরিদর্শক (ত’দন্ত) মো. কবির হোসেন বলেন, খবর পেয়ে ওই মেয়ের বাড়িতে পু’লিশ পাঠানো হয়। তবে সৌদি থেকে পাঠানো কাগজপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে মেয়েটি দীর্ঘদিন চিকিৎ’সা শে’ষে স্বাভাবিক মৃ’ত্যুবরণ করেছে। এছাড়া যেহেতু দুই দেশের সংশ্লিষ্টদের মাধ্যমে লা’শ দেশে এসেছে সেক্ষেত্রে আমারা কোনো আ’ইনগত ব্যবস্থা নিতে পারছি না।

নাসিরনগর উপজে’লা নির্বাহী কর্মক’র্তা (ইউএনও) নাজমা আশরাফী সাংবাদিকদেরকে জানান, কুলসুমের লা’শ আসার বিষয়টি তিনি জেনেছেন। পরিবারের পক্ষ থেকে যদি এ বিষয়ে রাষ্ট্রীয় কোনো সহযোগিতা চাওয়া হয় তাহলে সেটা করা হবে। সূত্রঃ বাঙ্গালী স্টাফ

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

     More News Of This Category