শিরোনাম
মানুষ মানুষের জন্য, সকলে বন্যার্ত অসহায় মানুষদের পাশে দাঁড়ানো উচিত…এটিএম হামিদ প্রাকৃতিক দূর্যোগে দিশেহারা সিলেট, থৈথৈ করে বাড়ছে পানি কানাইঘাটে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলের দ্বায়িত্বশীলরা পানি বিশুদ্ধ করন ট্যাবলেট নিয়ে উপজেলার বন্যাগ্রস্ত মানুষের পাশে বানিয়াচংয়ে বাংলা টিভি’র প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন সরকার বন্যার্তদের পাশে আছে ত্রাণের অভাব হবেনা— এমপি মানিক সিলেটে বন্যা দুর্গত এলাকা পরিদর্শন ও ত্রাণ সামগ্রী বিতরন করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্দুল মোমেন ঘাটাইল উপজেলায় আশ্রয়ন প্রকল্পের অধীনে বরাদ্দকৃত ঘরে ফাটল ছাতকে বন্যার অবনতি,নদ-নদীতে পানি বৃদ্ধি অব্যাহত উপজেলা সদরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন গোবিন্দগঞ্জে বঙ্গবন্ধু-বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট অনুর্ধ১৭ এর সেমিফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত পলাশবাড়ী‌তে বঙ্গবন্ধু ও বঙ্গমাতা জাতীয় গােল্ডকাপ ফুটবল টুর্ণামেন্টের শুভ উ‌দ্বোধন
শনিবার, ২১ মে ২০২২, ০৫:৩৯ পূর্বাহ্ন
Notice :
Wellcome to our website...

সিলেট অঞ্চলের হিন্দু বিবাহের প্রথা ও আচার-অনুষ্ঠান।(ভিডিও সহ)

Satyajit Das / ১৯০ বার এই সংবাদটি পড়া হয়েছে
প্রকাশের সময় : শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

সত্যজিৎ দাস(স্টাফ রিপোর্টার):প্রথম পর্বঃ-

“যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম,

যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব “

“বিবাহ” শব্দটি বি-পূর্বক বহ্ ধাতু ও ঘঞ্ প্রত্যয়যোগে গঠিত। বহ্ধাতুর অর্থ বহন করা এবং “বি” উপসর্গের অর্থ বিশেষরুপে।সুতরাং বিবাহ শব্দের অর্থ বিষেশ রুপে বহন করা। বিবাহের ফলে পুরুষ স্ত্রীর ভরণ-পোষণ এবং মানসম্ভ্রমরক্ষার সার্বিক ভার বহন করতে হয়।
স্মৃতি শাস্ত্রের বিখ্যাত গ্রন্থ মনুসংহিতায় আট প্রকার বিবাহের কথা বলা আছে।
সেগুলো হল:-
(১) ব্রাহ্ম।
(২) আর্য।
(৩) প্রাজাপত্য।
(৪) আসুর।
(৫) গান্ধর্ব।
(৬) রাক্ষস।
(৭) দৈব।
(৮) পৈশাচ।
জাতি এবং শ্রেণী বিভাগে এই বিবাহ গুলো হয়ে থাকে তবে ব্রাহ্ম, দৈব, আর্য, প্রাজাপত্য বিবাহ রীতি গুলোই প্রচলিত। বর্তমান মানব সমাজে ব্রাহ্ম বিবাহই স্বীকৃত এবং পালনীয়।
ব্রাহ্ম বিবাহ হল কন্যাকে বস্ত্র দ্বারা আচ্ছাদন করে এবং অলংকার দ্বারা আচ্ছাদন করে বিদ্বান ও সদাচারী বরকে স্বয়ং আমন্ত্রন করে যে কন্যা দান করা হয়। বর্তমানে কেউ না মানলেও সমাজে গান্ধর্ব বিবাহের প্রচলন আছে। নারী-পুরুষ পরস্পর শপথ করে মাল্যবিনিময়ের মাধ্যমে যে বিবাহ করে তার নাম গান্ধর্ব বিবাহ। এর উদাহরণ,মহাভারতে দুষ্মন্ত ও শকুন্তলার বিবাহ গাদ্ধর্ব বিবাহ ছিল।

বেদে খুব পরিষ্কার ভাবে বলা হয়েছেঃ
” উদীর্স্বাতো বিশ্বাবাসো নমসেলামহে ত্বা ।
অন্যামিচ্ছ প্রফর্ব্যং সং জায়াং পত্যা সৃজ “।।১০/৮৫/২২।। —অর্থাৎ তুমি যাও ও অবিবাহিত নারীকে তোমার অর্ধাঙ্গিণী কর এবং তাকে সমান অধিকার প্রদান কর।

আমাদের সনাতন বিবাহে কত গুলো বিধিবিধান শাস্ত্রীয়, কিছু অনুষ্ঠান আচার রয়েছে। শুভলগ্নে নারায়ণ, অগ্নি, শিব, দূর্গা, গুরু ইত্যাদি দেবতাকে আহবান করে এবং পুরোহিত আত্মীয় স্বজনদের সাক্ষী করে মঙ্গল মন্ত্রের উচ্চারণ,উলুধ্বনি ও শঙ্খধ্বনির মাধ্যমে বিবাহনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। বিয়ের মন্ত্রের শেষ হয় যজ্ঞের মাধ্যমে।

বিবাহের মূল মন্ত্র যা স্বামী স্ত্রীরা প্রতিজ্ঞা করে থাকে:-
“যদেতত্ হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম ।
যদিদং হৃদয়ং মম, তদস্তু হৃদয়ং তব ।।”
তোমার এই হৃদয় আমার হোক আমার এই হৃদয় তোমার হোক। বিবাহের মাধ্যমে একজন নারীপুরুষ চীর জীবন একসাথে সুখে দুঃখে থাকবার প্রতিজ্ঞা করে। বিবাহ আমাদের সনাতন ধমেঃর একটি অন্যতম অংশ। প্রত্যেকেরই জীবনকে পরিপূর্ণ করতে বিবাহ করা আবশ্যক।
বিবাহ তারিখের পূর্বের আচার-অনুষ্ঠানঃ-
১) কনে দেখা ও আশীর্বাদ:- কনে দেখার পর বিয়ের কথা পাকা হয়ে গেলে কনের বাড়িতে পুরোহিত সঙ্গে থাকলে প্রথমে পুরোহিত তারপর বরপক্ষের জ্যেষ্ঠতা অনুসারে অভিভাবকবৃন্দ আশীর্বাদ মন্ত্র উচ্চারণপূর্বক কিংবা মন্ত্র উচ্চারণ ছাড়াই ধান, দূর্বা দিয়ে আশীর্বাদ করেন। এরপর বরপক্ষ থেকে আশীর্বাদ হিসেবে স্বর্ণালঙ্কার কিংবা টাকা প্রদান করা হয় । মহিলাগণ মঙ্গল কামনায় তৎসঙ্গে উলুধ্বনি বা জোকাড় দিয়ে থাকেন।
২) বর দেখা,আশীর্বাদ ও বাক্যদান:- বর পছন্দ হলে বরের বাড়িতে কনেপক্ষ কর্তৃক কনে আশীর্বাদের মতই বরকে আশীর্বাদ করা হয় । তবে এক্ষেত্রে এই বাড়িতে কনে বিয়ে দিবেন ও নতুন সম্পর্ক স্থাপন করবেন বলে কনের পিতা কিংবা নির্ভরযোগ্য অভিভাবক প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেন, যাকে বাক্যদান বলা হয়।
৩) মঙ্গলাচরণ/ টিকামঙ্গল:- বরপক্ষ কর্তৃক মঙ্গলাচরণের জন্য কেনা প্রয়োজনীয় সামগ্রী যেমন, শাঁখা, সিঁদুরসহ যাবতীয় প্রসাদন সামগ্রী, অলঙ্কার, শাড়িসহ সকল কাপড়-চোপড় একটি ঝাঁপিতে (বর্তমানে ঝাঁপির স্থান জুড়েছে বড় ব্যাগ) সাজিয়ে রাখতে হবে। কনে বাড়ি নিয়ে যাওয়ার আগে একটি পাটি বিছিয়ে তার উপর ঝাঁপি রেখে এর সাথে পাঁচটি পুঁটি মাছ, দই, সিঁদুর, পান, সুপারি, ধান, দূর্বা পাটিতে রাখবেন। শাঁখা, শাড়ি ও পুঁটি মাছের উপর সিঁদুর দিয়ে পাঁচটি করে ফোঁটা দিবেন এবং ঝাঁপি বন্ধ করে ঝাঁপিতেও পাঁচটি করে সিঁদুরের ফোঁটা দিতে হবে । একটি মঙ্গল ঘট বসাবেন। পাঁচজন আয়ো (সদবা রমণী) সম্মিলিতভাবে ঝাঁপি আর্ঘিবেন। বরের বাড়িতে আমন্ত্রিতদের সংখ্যা হিসেব করে প্রয়োজনীয় পরিমাণ মিষ্টি সামগ্রীসহ ঝাঁপি নিয়ে কনের বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করবেন। মঙ্গল কামনায় যাত্রাকালে আয়োগণ উলুধ্বনি দিবে।
বরপক্ষ কনে বাড়িতে পৌঁছার পর আত্মীয় স্বজনসহ পাড়া প্রতিবেশীকে নিমন্ত্রণ দিবে। মুরব্বীদের অনুমতি সাপেক্ষে সকলে দেখতে পারেন এমন জায়গায় একটি পাটির উপর ঝাঁপি উঠাবে। ঝাঁপির সাথে ধান, দূর্বা, শাঁখা, সিঁদুর, দই, মিষ্টি, পুঁটি মাছ প্রভৃতি রাখবে আর রাখবে কনেকে আশীর্বাদ করে খাওয়ানোর জন্য সন্দেশ। কনের মা পুঁটি মাছগুলো টেনে টেনে অন্দরে নিয়ে যাবে। পাঁচজন আয়ো জল ভরে নিয়ে এসে কনেকে বাড়িতে স্নান করাবে। পরে কনে সাজিয়ে এনে ঐ পাটিতে বসাবে। কনের সামনে থাকবে ঝাঁপিসহ সকল কিছু, কনে পক্ষের ঝাঁপি এনেও এখানে এক পাশে রাখা হবে। সধবাগণ উভয় ঝাঁপিই ধান দূর্বা দিয়ে আর্ঘিবে এবং পাঁচটি করে সিঁদুরের ফোঁটা দাবে। তারপর শুভলগ্নে (মহেন্দ্রযোগ/অমৃতযোগ) পুরোহিত দই ও খই ছিটিয়ে মন্ত্র পড়ে কনে আশীর্বাদ করবে, কনের জন্য আনা শাঁখায় প্রথমে পাঁচটি সিঁদুরের ফোঁটা দিবে তারপর কনের কপালে ও সিঁথিতে সিঁদুরের ফোঁটা দিবে। তবে মুখচন্দ্রিকার বিয়ের পর লাজহোম বা যজ্ঞের সময় এবং চতুর্থ মঙ্গলের দিনে বর কনের সিঁথিতে সিঁদুর পরাবে। পুরোহিতের কাজ শেষ হলে পাঁচজন আয়ো মিলে কনেকে আশীর্বাদ করবে, শাঁখাসহ কনের কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরাবে। তারপর বর ও কনে পক্ষের পুরুষ মহিলা সকল অভিভাবক একে একে আশীর্বাদ করবে তাদেরও শাঁখাসহ কনের কপাল ও সিঁথিতে সিঁদুর পরাতে কোন বাধা নেই । সবশেষে পুরোহিত শান্তি মন্ত্র উচ্চারণ করে শান্তি জল ছিটাবে। তারপর কনের ডানহাতে লোহার চূড়িসহ উভয় হাতে পলা, শাঁখা ও অন্যান্য স্বর্ণালঙ্কার পরিয়ে দেয়া হয়। অবশ্য কেউ কেউ এসব কনেকে ছুঁইয়ে রেখে দেয় এবং বিবাহের দিনে কনেকে পরায়।

বিবাহ বা শুভ কাজে বন্ধা নারী এবং বিধবা নারী অবাঞ্ছিত,তাদের কোন কাজে অংশগ্রহণ করতে দেওয়া হয় না। এক্ষেত্রে উর্বরতাকেন্দ্রিক সংস্কারের প্রভাব আছে,তারা উৎপাদনের সম্ভাবনা হারিয়েছে তাই এই বিধি নিষেধ। বলা হয় শাঁখা, পলা ও লোহার চূড়ি যথাক্রমে সত্ত্ব, রজ ও তমগুণের প্রতীক, কনে যেন এই তিনগুণের সমন্বয়ের মাধ্যমে এদের অধীনে থেকে সংসারধর্ম পালন করে। বস্তুগুলো সবসময় কনেকে এ ব্যাপারে স্মরণ আর সতর্ক করিয়ে দেয়। স্বামীকে বশ করে রাখার উদ্দেশ্যে শাঁখা পরার রীতি ‘শিবমঙ্গলে’ উল্লেখিত হয়েছে। এ অনুষ্ঠানেই বিয়ের দিন-ক্ষণ সর্বসমক্ষে ঘোষণা করা হয়। পুরোহিত বিয়ের দিন দেখে বিবাহ তারিখ মুদ্রিত পঞ্জিকার পৃষ্ঠাটি খোলে রেখে পঞ্জিকায় সিঁদুরের শুভসূচক পাঁচটি টিকা দেন। আশীর্বাদ হিসেবে পঞ্জিকার পাতার ভাঁজে ধান দূর্বা রাখে। বরপক্ষের আনা ঝাঁপির দ্রব্যাদি সকলকে দেখানো হয়। বরপক্ষ ও কনেপক্ষ বর-কনেকে কে কী দিবে তা উপস্থিত সকলকে ঘোষণা দিয়ে জানানো হয়। পানখিলি বরপক্ষ কোন তারিখে কখন দিবে জানানো হয়। কারণ বরপক্ষের পানখিলির পর কনেপক্ষ পানখিলি দেয় এবং বিয়ের অন্যান্য আচার-অনুষ্ঠান আরম্ভ করে। এ সময় উভয়পক্ষ একে অপরকে বিয়ের নিমন্ত্রণ প্রদান করে। মঙ্গলাচরণ করে বরপক্ষ বাড়ি ফিরে পাড়া প্রতিবেশী ও সমাজের লোকজনকে নিমন্ত্রণ করে পান-মিষ্টি খাওয়ায়। এ সময় মহিলারা বিয়ের গীত গায়।

বিবাহে ধান, দূর্বা, পান, সুপারি, মাছ ব্যবহার করার কারণ- বস্তুগুলো হল বংশবৃদ্ধির প্রতীক। মাছের ডিম থেকে অসংখ্য পোনা জন্মে। ধান, পান ও সুপারির ফলন হয় প্রচুর। দূর্বা শুকিয়ে গেলেও মরে না পানি পেলে বেঁচে ওঠে এবং সহজে বংশ বিস্তার করে। দূর্বাকে দীর্ঘজীবনের, আবার ধানকে ঐশ্বর্য্যের প্রতীকরূপেও গণ্য করা হয়। সুতরাং বিবাহের মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানে এগুলোর ব্যবহারে ভাবী দাম্পত্য জীবনকে সফল ও ফলবানরূপে দেখতে চায়, তারই কামনা-বাসনার প্রতিফলন এতে রয়েছে।

এক্ষেত্রে সিঁদুর বা সিন্দুর প্রসঙ্গে দু’একটি কথা বলা আবশ্যক। বিবাহের আচারে আনুষ্ঠানিকভাবে সিঁদুর পরানোই মূখ্য বলে ধরা হয়। বিবাহে বধূর সীমন্তে সিঁদুর দেওয়া একটি প্রাচীন প্রথা। সিঁথিতে সিঁদুরের রেখা নারীর সৌভাগ্যের বা সধবা অবস্থার পাকা প্রমাণ বলে ধরা হয়। বৈদিক শাস্ত্রে এর ব্যবস্থা নেই। সামবেদীয় পদ্ধতিকার ভট্টদেব [একাদশ শতক] এবং যজুবেদীয় পদ্ধতিকার পশুপতি পণ্ডিত [দ্বাদশ শতক] দুই বাঙালি ব্রাহ্মণ পণ্ডিতই তাঁদের পদ্ধতি পুস্তকে পৌরাণিক কোন শাস্ত্রে এর ব্যবস্থা খুঁজে না পেয়ে ‘শিষ্টসমাচারাৎ’ বা ভদ্রসমাজে প্রচলিত প্রথা অনুসারে সীমন্তে সিঁদুরদানের উপদেশ দিয়েছেন।
বাংলাদেশে কোন মহিলার সিঁথিতে সিঁদুর সধবা লক্ষণ। তবে হ্যাঁ,একজন সধবার রজঃস্বলাকালে যেমন সিঁদুর ব্যবহারের নিয়ম নেই তেমনই অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায়ও সিঁদুর ব্যবহারের নিয়ম নেই। তিনি যে যৌন সম্ভোগের উপযোগী নন; এই স্ত্রী আচারের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। লাল রঙ নবোদিত সূর্যের প্রতীক। সূর্যোপাসক কোন আদিম জাতির মধ্যে বিবাহ আচারে সূর্যের প্রতীককে স্বামী নববধূর ললাটে সূর্যের তেজ ধারণ করিয়ে শুভকার্য সম্পন্ন করেছিলেন বলে অনেকে বিশ্বাস করেন।

ছোটনাগপুরের অধিবাসী ওরাওঁ বীরহোড় প্রভৃতি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে কনের সিঁথিতে সিঁদুরদানই বিয়ের মূখ্য আচার। এই অনুষ্ঠানের নাম ‘ইসুং সিন্দ্রি’। অনার্য ভাষার এই ‘সিন্দ্রি’ শব্দটি থেকেই সিন্দুর শব্দটি এসেছে বলে মনে করা হয়। ওরাওঁ বিয়েতে বর কনেকে সিঁদুর দান করলে বিবাহ অর্ধেক হল বলে ধরা হয়। এরপর কনের বৌদি কনের তর্জনীটি ধরে তাতে সিঁদুর লাগিয়ে বরের কপালে দিতে বললে, কনে এটি করলেই বিবাহ সম্পন্ন হল। এদের রীতি দু’জন দু’জনকেই সিঁদুর দান করবে অর্থাৎ সূর্যের তেজ দু’জনেই গ্রহণ করবে।
অনেকে মনে করেন,অনার্য ভারতে অসভ্য জাতির কন্যাহরণ কালে যুদ্ধবিগ্রহে রক্তপাত ঘটত, যার জয় হত সেই হরণকারী যুবক নিজের আঙ্গুল কেটে রক্ত বের করে সেই অপহৃতা যুবতীর ললাটে রক্তের ফোঁটা দিয়ে তার উপর নিজের স্বত্ব বা অধিকার স্থাপন করার প্রমাণ দিত। সেই রক্ত ফোঁটাই পরবর্তীকালে সিঁদুর ফোঁটা হয়ে প্রাচীন বিশ্বাসকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আবার সিঁদুরকে ‘বশীকরণ’ এর উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয় বলেও অনেকে মনে করেন।
৪) রূপসী ব্রত:- পুরোহিত ডেকে বিধি অনুসারে বিয়ে উপলক্ষে কালী পূজা করা হয়। সমর্থ হলে কালীর প্রতিমা গড়ে পূজা করা হয়। তবে ঘটেই রূপসী পূজা করা হয়। রূপসীর ভেরুয়া মাথায় নিয়ে বর/কনের মা ব্রতধারী সধবাদের নিয়ে রূপসী (শেওড়া) গাছ তলায় সম্মিলিতভাবে গীত গেয়ে যান; রূপসীর উদ্দেশ্যে নৈবেদ্যাদি নিবেদন করেন। রূপসীর গাছের একটি পাতা জল দিয়ে ধুয়ে এতে পাঁচটি সিঁদুরের ফোঁটা দেন তারপর এই সিঁদুর মাথার চুল দিয়ে মুছে আনেন। রূপসীর সাথে বইনালা করেন (বোন সম্পর্ক পাতেন)। রূপসী তলায় আসা সকল সধবা একে অপরের শাঁখা ও কপালে সিঁদুর পরিয়ে দেন তারপর সবাই রূপসীর প্রসাদ খেয়ে বাড়ি ফিরেন। রূপসীর প্রসাদ নিয়ে বাড়ি ফেরা বারন। বর/কনের মা বাড়ি ফিরলে কোন এক সধবা কর্তৃক হাতপাখায় পানি ঢেলে ছিটিয়ে কনের মাকে ভিজিয়ে দেয়।
৫) খোলা বসানো ও চিড়া কুটা:- পানখিলির পরে মঙ্গলের খোলা বসানো ও চিড়া কুটার লক্ষ্যে দশ মুষ্টি ধান সিদ্ধ করা হয়। লেপা-মোছা উঠানে আরগ (আলপনা) দেয়া হয়। ছয়টি মাটির পিঁড়া ও দুইটি মাটির খোলা (মাটির পাতিল/পিতলের হাঁড়ি) সাদাগুড়ি (চালের গুড়ো পানিতে গুলে) দিয়ে সাজানো হয়। তিনটে করে পিঁড়ে একসাথে নিয়ে চুলার মত করে বসিয়ে তার উপরে খোলা চাপানো হয়। ডানপাশের খোলাটি বরের এবং বাঁ পাশেরটি কনের খোলা,বরের খোলাটিতে পাঁচটি চন্দনের ফোঁটা এবং কনের খোলায় পাঁচটি সিঁদুরের ফোঁটা দিয়ে পাঁচজন সধবা মিলিত হয়ে ধান দূর্বা দিয়ে খোলা দুটিকে আর্ঘিবে। বর/কনের মা হাত কেওড়া কেউড়ি (ডানহাত বা দিকে আর বাঁ হাত ডান দিকে নিয়ে) করে দু’টি চুলায় আগুন ধরাবে, খোলায় ধান দিবে, দু’হাতে দু’টি কলার পাঁচল (কলা পাতার ডাটা বা বৃন্ত) ধরে খোলায় ধান ভেজে অবশেষে ঘাইল-ছিয়া দিয়ে চিড়া কুটবে।

অতঃপর উঠানে পাটি বিছিয়ে চাটা-বগুনা ও রূপসীর ঘট এনে পাটির পূর্বদিকে রাখবে। পাটির উপরে নকশি কাঁথা/বিছানার চাদর বিছিয়ে পাঁচজন সধবা একটি পুষ্পথালিতে ২০টি পান, ১০টি সুপারি, ১০টি কলা, বাঁশের খইড়কা ১০টি, দই এর ঘটি, চিড়া, ধানের খই, বাতাসা, চিনি, সিঁদুর, চন্দন প্রভৃতি নিয়ে পানে খিলি দেয়ার ‌উদ্দেশ্যে বসবে। শহরের জীবন ধারায় খোলা বসানো ও চিড়া কুটার আচারটি আর পালন করা হয় না।
৬) পানখিলি:- পাঁচজন আয়ো মিলিত হয়ে দুইটি করে পান নিয়ে খইড়কা (বাঁশের চিলকা) গেঁথে পানে খিলি দেয়। বাঁশের খইড়কার পরিবর্তে আগে সোনা বা রূপার কাঠি ব্যবহার করা হত। আজকাল এর ব্যবহার সীমিত হয়ে গিয়েছে। খিলিতে চন্দন ও সিঁদুরের পাঁচটি করে ফোঁটা দেয়া হয়। সুপারী কাটা হয়। খিলিগুলো পুষ্প থালিতে নিয়ে একটি টাওয়েল দিয়ে ঢেকে ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘিয়ে নেয়া হয়। অতঃপর তুলসী তলা,দেবস্থলী ও মন্দিরসমেত কমপক্ষে পাঁচটি স্থানে এই খিলিপান অর্পণ করা হয়।
পরে সকল আয়ো মিলে মিষ্টিমুখ করে এবং একে অপরকে সিঁদুর মাখিয়ে দেয়। প্রথম খিলিটি তুলসী গাছে দেওয়া হয়। অন্যগুলো বিয়ের আগের দিন গঙ্গায়, দেবস্থলীতে ও আভ্যদিকে দেওয়া হয়।
দেবস্থান থেকে ফিরে পাঁচজন সধবা রমণী মিলে ঘরে একটি প্রজ্জ্বলিত লণ্ঠন বেঁধে রাখবে। লণ্ঠনটি রাতভর জ্বলবে, কেউ স্থানচ্যুত করবে না। এবারে রমণীগণ একটি কুলায় কিছু ধান রেখে এর উপরে একটি পাটা (শিল) এবং পাটার উপর পুথাইল (নোড়া) রেখে পান, সুপারি ও ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘিবে। কাচা হলুদ, সরিষা প্রভৃতি বাটার জন্য এর সাথে রাখা হবে। ঘাটস্নানের আগ পর্যন্ত এই পাটা-পুথাইল স্থান চ্যুত করা যাবে না।

বিবাহে পানেখিলি বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে বলেই অনুমান করা যায়। বরের বাড়িতে পানেখিলির পরেই কনের বাড়িতে বিবাহের আচার-অনুষ্ঠান আরম্ভ করা হয়। আর পান-সুপারির কথা কী আর বলা যায়, বিবাহ তো বটে; সকল মাঙ্গলিক আচার-অনুষ্ঠানে পান-সুপারির গুরুত্ব অপরিসীম। খুব প্রাচীনকাল থেকেই এর ব্যবহার চলে আসছে। মুকুন্দরাম চক্রবর্তী ‘চণ্ডীমঙ্গলে’ ধনপতি সওদাগরের বিবাহ উপলক্ষে যে অধিবাস প্ররণ করেছিলেন সেখানে এই পান-সুপারির (পান গুয়া) উল্লেখ রয়েছে:-
‘তৈল সিন্দুর পান গুয়া বাটা করি গন্ধ চূয়া
আম্র দাড়িম্ব পাকা কাঁচা।
পাটে ভরি নিল খই ঘড়া ভরি ঘৃত দই
সাজয়্যা সুরঙ্গ নিল বাছা’।
বশীকরণ ক্রিয়া সম্পাদনের উপকরণ হিসেবে পান সুপারির প্রয়োগ দেখা যায়। বলা হয়, পানের রস কামোত্তেজক এবং কাচা সুপারি নেশা ধরায়।
৭) আদরী/আদ্রী স্নান:- আদরী স্নানের নিয়ম বর, কনে উভয়ের ক্ষেত্রে সমান। আমসর (আম্র পল্লব) সমেত সাতটি ঘট, একটি লোটা ও একটি কলসী নিয়ে বর/কনের মা জল ভরে আনবে । তবে আরও আয়ো মহিলা কিংবা অবিবাহিতা মেয়েও সাথে যেতে পারবে। জল ভরতে যাওয়ার আগেই বর/কনের মা ঘটগুলোকে ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘিবে। গঙ্গায় তেল সিঁন্দুর দেওয়ার জন্য যাবতীয় উপকরণ যেমন- কলা পাতা, ধান, খই, দই, কলা, খিলিপান, আগর বাতি, মোম বাতি, কাস্তে বা কাচি একটি ডালায় সাজিয়ে সঙ্গে নিবে। বর/কনের মা উলুধ্বনিসহ গঙ্গায় তেল সিঁন্দুর, খই, দই, ডিম প্রভৃতি দিবেন। অতঃপর জল ভরে বাড়ি ফিরবেন। যেখানে বর/কনেকে স্নান করাবে, সেখানে নিয়ে জল ঢেকে রাখবে। বর/কনে সেখানে গিয়ে পূর্বমুখ হয়ে বসার পর পাঁচজন আয়ো রমনীসহ মা ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘিবে। তারপর মা কাচি বা কাস্তে দিয়ে বর/কনের ডানে-বামে শত্রু কাটবে। এরপর গায়ে মাটি দিয়ে হলুদ লাগিয়ে দিবে এবং উলুধ্বনিসহ শুভক্ষণে (মহেন্দ্র বা অমৃতযোগে) মা বর/কনেকে স্নান করাবে। স্নান সেরে বর/কনে উঠে যাওয়ার পর স্থানটি ভাল করে পরিস্কার করা হয়, যাতে স্নানের দ্রব্যাদি কারো পায়ে না লাগে। মা সন্তানকে আদরের সাথে এ স্নান করান বলে একে আদ্রী স্নান বলা হয়।
৮) সুন্দা মাগা ও সুন্দা পিশা:- অধিবাসের রাতে সুন্দা মাগা প্রভৃতি কাজ করা হয়। গীত-বাদ্য সহযোগে পাঁচটি ঘরে সুন্দা মেগে বাড়ি ফিরে উঠানে পাটি বিছাবে। পাটির উপর বর/কনের মা সুন্দা মাগায় প্রাপ্ত চাল একটি ঘটি দিয়ে পরিমাপ করবে, এরপর নৃত্য করবে। তুলসী তলায় সিঁদুর দিয়ে ধান-দূর্বা দিয়ে আর্ঘিবে। তুলসী তলা থেকে তিনটি পিঁড়ার মাটি নিবে। সুন্দা ও মেথি এই মাটিসহ ভাজবে। বর/কনের মা-সহ পাঁচজন সধবা রমণী মিষ্টি মুখে দিয়ে এসব দ্রব্য একটি পাথুরে (পাথরের থালা) নিয়ে নিঃশব্দে মৌন থেকে কলার পাঁচল দিয়ে পিশে গুঁড়ো করবে। তারা একে অপরের হাতের উপর হাত রেখে নিঃশব্দে সুন্দাপিশা সম্পন্ন করেন। কোন কোন সম্প্রদায়ে এই সুন্দাপিশাকালে রমণীদের একটি বড় কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতে দেখা যায়। এই গুঁড়োতে সুন্দা মাগায় প্রাপ্ত তেল মিশিয়ে দু’টি পান পাতায় উঠিয়ে রাখা হয়। একটির সুন্দা দিয়ে অধিবাসের ফোঁটা ও ঘাটনি দেয়া হয় অন্যটি পরবর্তী দিনের জন্য সংরক্ষণ করতে হয়।
১০) নরসুন্দর কর্তৃক বর/কনের নখ খুঁটা ও আশীর্বাদ প্রদান:- অধিবাসের স্নানের আগে নরসুন্দর বর/কনের নখ নরুন দিয়ে নখ খুঁটে দেন অতঃপর তিনি ধান-দূর্বা বর/কনের মাথায় দিয়ে আশীর্বাদ করেন। তাকে বর/কনের পক্ষ থেকে সদক্ষিণা বস্ত্রদান করা হয়, সিধা (চাল, ডাল, তেল, লবণ, মশলা, সবজি প্রভৃতি ভোজ্যবস্তু) দেয়া হয়। বলা হয়, বিবাহ কাজে বর কনেকে নরসুন্দর এসে নখ কেটে না দিলে গায়ে অশৌচ এঁটে থাকে। তাই বিয়ের দিন এসে নখ খুঁটে দিয়ে যায়।
১১) অধিবাসের স্নান (হলুদ মেখে):- পানখিলি অনুষ্ঠান শেষে রক্ষিত পাটা-পুথাইলে কাচা হলুদ ও সরিষা বেটে খানিকটা সরিষার তৈল মিশ্রিত করে রাখা হয়। যা অধিবাসের স্নানসহ প্রতিবার স্নানেই বর/কনের মুখমণ্ডল ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে লাগিয়ে স্নান করানো হয়।
১২) ধুৎরা/ধুতুরা কাটাইল:- ধুৎরা/ধুতুরা কাটাইল তৈরি ও কনে/বরকে দেওয়া হয়। আট্টিয়া কলার মাঞ্জ ৭টি, ডালিম পাতা, ধুতুরা পাতা, সরিষা, ধূপ, দূর্বা, ফুল ও একটি লোহার ফলা বা কাটারী একত্রে বেঁধে অধিবাসের স্নানের পর পর নরসুন্দর বর/কনের হাতে প্রদান করে।
১৩) কনে/বর সাজানো:- অধিবাসের টিকা (ফোঁটা/টিপ) শুভ অধিবাস অনুষ্ঠানের জন্য কনে/বরকে সাজানো হয়। বর ধূতি, পাঞ্জাবী পরিধান করে শাল/উত্তরীয় বামকাঁধে নিয়ে সাজে আর বধূকে লাল-খয়েরী শাড়ি পরিয়ে সাজানো হয়। বিবাহে কনের জন্য লাল রঙ বাঞ্ছনীয়।
১৪) কালীপূজা:- পানখিলির পরে যে কোন শুভদিনে দিবাগত রাতে বিবাহ উপলক্ষে প্রতিমায় কালীপূজা করা যেতে পারে। তবে আভ্যদিকের ব্যাপারের সময় কালীর ঘট বসিয়ে ঘটে পূজা করা হয়। যেখানে প্রতিষ্ঠিত কালী প্রতিমা রয়েছে সেখানে পূজা দিয়ে কেউ কেউ এ আচারটি সেরে ফেলে।
১৫) সোহাগ মাগা:-  বিয়ের দিন কন্যার সোহাগ ডালা সাজানো হয়। পুষ্পথালির মধ্যে চাল, কলা, ফুল, দূর্বা, তেলের বাটি, দইয়ের ঘটি, মিষ্টি প্রভৃতি একখানা টাওয়েল দিয়ে ঢেকে বর/কন্যার মা তার মাথায় তুলে নেয়। গীত বাদ্যসহ বাড়ি বাড়ি যায়। বাড়ির দরজার সামনে বারান্দায় আল্পনা এঁকে এতে কিঞ্চিত পান সুপারি দেয়। বাড়ির সধবা এর উপরে একটি পিঁড়ি এনে রাখে। বর/কনের মা পুষ্পথালি মাথা থেকে নামিয়ে পিঁড়ির উপর রাখে। ওদিকে বাড়ির সধবা গৃহিনী একটি থালিতে চাল,ফুল ও দূর্বাসহ এর নিকটে তবে গৃহ অভ্যন্তরে রাখে।

চলবে………………..


আপনার মতামত লিখুন :

Leave a Reply

Your email address will not be published.

এই ক্যাটাগরির আরো সংবাদ

Registration Form

[user_registration_form id=”154″]

পুরাতন সংবাদ দেখুন

বিভাগের খবর দেখুন